আবদুস সাদেকের প্রয়াণ: ক্রীড়াঙ্গনে এক নক্ষত্রের পতন
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:০৭:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২০ জুন ২০২৬ ৫৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি হকি খেলোয়াড় ও সংগঠক আবদুস সাদেক আর নেই। শুক্রবার (২০ জুন) সকাল ৮টার দিকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের হকির উন্নয়ন ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আবদুস সাদেক ছিলেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। খেলোয়াড় হিসেবে সাফল্যের পাশাপাশি সংগঠক হিসেবেও তিনি রেখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
তার মৃত্যুতে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। ক্রীড়াবিদ, সংগঠক ও অনুরাগীরা হারালেন একজন অভিভাবকতুল্য ব্যক্তিকে।
মরহুমের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ বাদ আসর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘আই’ ব্লকের বায়তুস সোবহান জামে মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর বনানী ওল্ড ডিওএইচএস মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হবে।
উল্লেখ্য, আবদুস সাদেক দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের বড় ভাই। এছাড়া ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব ও দেশের একমাত্র ক্রীড়াভিত্তিক স্যাটেলাইট চ্যানেল ‘টি স্পোর্টস’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইশতিয়াক সাদেক তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর পিতা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহানও ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন খ্যাতনামা সাঁতারু।
বহুমুখী ক্রীড়া প্রতিভা ও সোনালী ক্যারিয়ার
আবদুস সাদেক ছিলেন স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। কেবল হকি নয়, ফুটবল ও ক্রিকেটেও ছিল তাঁর সমান পারদর্শিতা। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী ক্রীড়াচক্রের ফুটবল ও হকি—উভয় দলেরই প্রথম অধিনায়ক হওয়ার অনন্য গৌরব রয়েছে তাঁর।
ক্রীড়াঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে তিনি ‘জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার’-এ ভূষিত হন।
স্বাধীনতার পূর্বে অবিভক্ত পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে ইউরোপ সফরে মাঠ কাঁপিয়েছেন আবদুস সাদেক। ১৯৬৯ সালের সেই সফরে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর বিপক্ষে চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি নজর কাড়েন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে জাতীয় হকি চ্যাম্পিয়নশিপে কুমিল্লা জেলা দলের অধিনায়কত্ব করেন তিনি।
১৯৭৭-৭৮ মৌসুমে বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার এশিয়ান গেমসে অংশ নেয়, তখনও হকি দলের অধিনায়ক ছিলেন আবদুস সাদেক।
সফল প্রশিক্ষক ও দূরদর্শী সংগঠক
খেলোয়াড়ি জীবনের পর আবদুস সাদেক আবাহনী ফুটবল দলের কোচের দায়িত্ব নেন এবং সেখানেও ইতিহাস গড়েন। ১৯৭৭ সালে তাঁর অধীনেই ঘরোয়া ফুটবল লিগে কোনো ম্যাচ না হেরে প্রথম দল হিসেবে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে আবাহনী।
পরবর্তীতে একজন দূরদর্শী ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে হকি ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের (১৯৮৩-১৯৮৫) দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁরই একক প্রচেষ্টা ও কূটনৈতিক দক্ষতায় ১৯৮৫ সালে জাপানের পরিবর্তে ঢাকাকে দ্বিতীয় এশিয়া কাপ হকির ভেন্যু হিসেবে নির্বাচিত করেছিল এশিয়ান হকি ফেডারেশন।
আবদুস সাদেকের প্রয়াণে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন, ক্লাব ও ক্রীড়াপ্রেমীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।



















