অপ্রতিম হত্যা: তুহিন আনাস ফাহিমই সন্দেহভাজন ঘাতক?
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৫৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছেলে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে তিন তরুণকে সন্দেহের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেসেঞ্জারে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের কথোপকথনের তথ্য পাওয়া গেছে। তুহিনের অনুরোধেই অপ্রতিম সানন্দা এলাকায় গিয়েছিল বলে জানা গেছে। পরে তুহিনের দেখানো স্থান থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করা হয়।
তবে কী কারণে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন।
মেসেঞ্জারে কথোপকথন, সিসিটিভিতে গতিবিধি
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর অপ্রতিমকে কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মূল ফটকের সামনে দেখা যায়। পরে মেসেঞ্জারে তুহিনের সঙ্গে কথোপকথনের পর সে সানন্দা এলাকায় যাওয়ার জন্য সম্মত হয়। তুহিন অপ্রতিমকে এক ঘণ্টার জন্য সানন্দায় আসতে অনুরোধ করেছিল বলে জানা গেছে।
সিসিটিভি ফুটেজে তুহিনকে অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দিয়ে সানন্দা এলাকার দিকে হাঁটতে দেখা যায়। অন্য একটি ফুটেজে তাদের ঘটনাস্থলের দিকে যেতে দেখা যায়। পরে আনাস ও ফাহিমকেও অন্য একটি পথ দিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে যেতে দেখা যায় বলে সূত্রের দাবি।
এরপরই অপ্রতিম হত্যার ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। তবে ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
অপ্রতিমের বাসায় গিয়েছিল সন্দেহভাজনরা
সূত্র জানায়, ঘটনার পর তুহিন, আনাস ও ফাহিম স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছিল। শনিবার সকাল ৮টার দিকে তারা তিনজনই অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে কান্নারত তার মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমকে সান্ত্বনা দেয় বলে জানা গেছে।
পরে তুহিন সানন্দায় নিজের বাসায় ফিরে যায়। আনাস ঢাকার গাবতলী এলাকায় চলে যায় বলে সূত্রের দাবি।
শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষার্থীরা সানন্দায় তুহিনের বাসা থেকে তাকে আটক করেন। পরে তার মোবাইল ফোনে অপ্রতিমের সঙ্গে কথোপকথন এবং তাকে ডেকে নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।
আনাসের অবস্থান জানতে চাইলে তুহিন তাকে ফেনীর মহিপালে নিজের বাড়িতে আছে বলে জানিয়েছিল বলে সূত্র জানায়। পরে মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢাকার গাবতলী থেকে আনাসকে গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া ফাহিমকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তুহিনের দেখানো স্থান থেকে আইফোন উদ্ধার
তুহিনকে ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেখানো স্থান থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মোটরসাইকেল কেনা এবং টাকা সংগ্রহকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটতে পারে। আবার আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলেও পরিবারের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ধারণা করছেন। এসব ধারণার সত্যতা এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
সূত্র জানায়, তুহিন ও ফাহিম উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে অপ্রতিম ছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। কিশোর গ্যাং বা অন্য কোনো কারণে তাদের মধ্যে পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে উঠেছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিখোঁজের পর জঙ্গলে মিলল মরদেহ
শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতিম। সন্ধ্যা পর্যন্ত বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। পরে তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
রাতভর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও লালমাই পাহাড়ের আশপাশে খোঁজ চালিয়েও অপ্রতিমের সন্ধান পাওয়া যায়নি। শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয়রা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দুই থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পান।
খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে গিয়ে অপ্রতিমের মরদেহ শনাক্ত করেন। সেখানে একটি শেয়াল ঘোরাফেরা করছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে শেয়ালটি সরিয়ে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল ইসলাম বলেন, শুক্রবার বিকেলের পর অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি পরিবার পুলিশকে জানায়। পরে তার বাবা সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর থেকে পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন স্থানে তাকে খুঁজছিল। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সালমানপুর এলাকায় একটি মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
শোক ও ক্ষোভে উত্তাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি অপ্রতিমের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানান।
ঘটনাস্থলে মরদেহ দেখতে পাওয়া স্থানীয় যুবক আবদুল কাদের জিলানী বলেন, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তারা প্রথমে অপ্রতিমকে দেখে ঘুমিয়ে আছে বলে মনে করেছিলেন। পরে কাছে গিয়ে তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। এরপর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জানতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ রয়েছে।
বাংলা বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, দুপুর ১২টার দিকে তারা মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে অপ্রতিমের মরদেহের পাশে একটি শেয়াল ঘোরাফেরা করছিল। পরে তারা শেয়ালটি সরিয়ে দেন এবং পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
‘আমি কোন দেশে বাস করি?’
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু জানতে চাই, আমার ছেলের কী অন্যায় ছিল? আমি কোন দেশে বাস করি, এটা কোন দেশ? একটা ছেলে ঘর থেকে বের হলো, তাকে মেরে ফেলতে হবে? এখন আমি কীভাবে বাঁচব? আমার তো একটাই ছেলে। বাকি জীবন আমি কীভাবে কাটাব?’
শনিবার অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানান সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় অপ্রতিমের মা বলেন, ‘আমার একটি মাত্র ছেলে। তাকে কেন এভাবে হত্যা করা হলো?’
অপ্রতিমের পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও তাদের বাসায় যান।
সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এ এলাকার সংসদ সদস্য হিসেবে লজ্জিত ও দুঃখিত। একটি মাসুম শিশুকে রক্ষা করতে পারলাম না। আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। ৯০ দিনের মধ্যে এ ঘটনার বিচার শেষ করতে হবে।’
১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আশ্বাস
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে একজনকে সন্দেহজনক হিসেবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘১০ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। যেহেতু এটি একটি স্পর্শকাতর ঘটনা, তাই আমরা এখনই সবকিছু প্রকাশ করতে চাইছি না। প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার করে গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।’
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ঘটনার পুরো বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।























