ফেলে দেওয়া হাঁসের পালকেই কোটি টাকার সম্ভাবনা, রপ্তানি চার দেশে

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০১:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় হাঁসের মাংস সংগ্রহের পর ফেলে দেওয়া হতো পালক। সেই পরিত্যক্ত পালকই এখন হয়ে উঠেছে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাময় পণ্য। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুরে একটি কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হাঁসের পালক রপ্তানি হচ্ছে চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে। বিদেশে এসব পালক দিয়ে তৈরি হচ্ছে জ্যাকেট, কম্বল, চাদর, বালিশ, জাহাজের সোফা ও ব্যাডমিন্টনের ফেদারের ককসহ নানা পণ্য।
শুধু রপ্তানি নয়, হাঁসের পালক ঘিরে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। কাজ করছেন দরিদ্র ও অসহায় নারীসহ বেকার যুবকেরা। তবে দেশে পালক থেকে তৈরি পণ্য উৎপাদন শুরু করতে প্রয়োজন আরও বড় বিনিয়োগ ও সরকারি সহযোগিতা।
চীনে অভিজ্ঞতা, দেশে কারখানা
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন শেরপুরের তরুণ উদ্যোক্তা আলতাব হোসেন। ২০১৪ সালে ছোট পরিসরে হাঁসের পালক নিয়ে কাজ শুরু করলেও প্রথম দিকে সফলতা পাননি। পরে ২০১৫ সালে চীনে গিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সেখানে পালক প্রক্রিয়াজাতকরণে একটি প্রতিষ্ঠানে এক বছর কাজ করে অর্জন করেন বাস্তব অভিজ্ঞতা।
২০২২ সালে চীন থেকে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তিলকপুর বাজারে কয়েকজনের সহযোগিতায় প্রায় ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলেন ‘সারাবাংলা ডাউন প্রোডাক্ট’ নামের পালক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা।
কারখানাটিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ টন হাঁসের পালক সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে পালকগুলো রোদে শুকানো হয়। পরে বাছাই ও যন্ত্রের সাহায্যে কয়েকটি ধাপে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানির উপযোগী করা হয়।
কারখানায় প্রক্রিয়াজাত পালক চীন, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হচ্ছে। এসব পালক দিয়ে বিদেশে তৈরি হচ্ছে শীতের পোশাক, জ্যাকেট, কম্বল, চাদর, বালিশ, জাহাজের সোফা ও ব্যাডমিন্টনের ফেদারের ককসহ বিভিন্ন পণ্য।
পালক ঘিরে বদলেছে নারীদের জীবন
হাঁসের পালক প্রক্রিয়াজাতকরণের এই উদ্যোগে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন স্থানীয় অনেক নারী। তাঁদের কাছে কারখানার কাজ কেবল আয়ের উৎস নয়, সংসার চালানো ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোরও অবলম্বন।
নারী শ্রমিক মীম খাতুন বলেন, ‘পালকগুলো নিয়ে আসার পর রোদে দিই। এরপর বস্তায় করে কারখানায় পাঠাই। এখান থেকে যে টাকা পাই, তা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি আমার ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাই।’
সামেনা বেগমের জীবনেও এই কাজ এনেছে স্বস্তি। স্বামী মারা যাওয়ার পর আট সদস্যের পরিবার চালাতে তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এখন কারখানায় কাজ করে পরিবারকে সহায়তা করছেন তিনি।
সামেনা বেগম বলেন, ‘আমার পরিবারে আটজন সদস্য। আমার স্বামী মারা গেছেন আট বছর আগে। স্বামী মারা যাওয়ার পর পরিবার চালাতে অনেক কষ্ট হতো। পরে এই কারখানা হওয়ার পর এখানে কাজ পাই। প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পাই। ওভারটাইম করলে আরও বেশি হয়। এখন আমার পরিবার ভালো চলে।’
১৬ শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বাড়ছে উৎপাদনের সম্ভাবনা
কারখানার ব্যবস্থাপক সোহেল রানা জানান, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা পালক প্রথমে রোদে শুকানো হয়। পরে সেগুলো বস্তায় করে কারখানায় এনে যন্ত্রের সাহায্যে কয়েক ধাপে প্রক্রিয়াজাত করা হয়।
তিনি বলেন, ছোট পালক দিয়ে জ্যাকেট, কম্বল, জাহাজের সোফা, চাদর, বালিশসহ শীতের বিভিন্ন পোশাক তৈরির উপকরণ প্রস্তুত করা হয়। আর পাখার পালক দিয়ে তৈরি হয় ব্যাডমিন্টনের ফেদারের কক। এসব পালক বিদেশে পাঠানো হয়।
সোহেল রানা আরও বলেন, তাঁদের কারখানায় বর্তমানে ১৬ জন শ্রমিক কাজ করছেন।
দেশে পণ্য তৈরি করতে চান উদ্যোক্তা
উদ্যোক্তা আলতাব হোসেনের লক্ষ্য কেবল কাঁচামাল হিসেবে হাঁসের পালক রপ্তানি করা নয়; বরং দেশে পালক থেকে তৈরি পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানি আয় বাড়ানো।
তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালে ছোট পরিসরে হাঁসের পালক নিয়ে কাজ করি। কিন্তু বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে না পেরে লাভবান হতে পারিনি। এরপর স্কলারশিপ নিয়ে চীনে গিয়ে পড়াশোনা শেষ করে পালক নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে এক বছর কাজ করি। ছোট থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল ব্যবসা করব। এরপর চীন থেকে মেশিন নিয়ে এসে ২০২২ সালে জয়পুরহাটের তিলকপুরে কারখানা শুরু করি। এক বছর পর থেকে সফলতা পাচ্ছি।’
আলতাব হোসেন জানান, কারখানা স্থাপনে তাঁর প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। দেশে পালক থেকে জ্যাকেট, কম্বল, বালিশসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এই পালক থেকে দেশেই এসব পণ্য তৈরি করতে পারি, তাহলে বিদেশে রপ্তানি করে আরও টাকা আয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর পূর্ণাঙ্গ সেটআপ করতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা প্রয়োজন। সরকার যদি আমাদের সহযোগিতা করে বা স্বল্প সুদে ঋণ দেয়, তাহলে এমন উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।’
সহযোগিতার আশ্বাস প্রাণিসম্পদ বিভাগের
জয়পুরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরও হাঁসের পালক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির এই উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছে। দপ্তরটির ট্রেনিং অফিসার কল্পনা রানী রায় জানান, তাঁরা কারখানাটি পরিদর্শন করেছেন এবং উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন কারিগরি পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘একসময় যে পালক ফেলে দেওয়া হতো, সেই পালক সারা দেশ থেকে সংগ্রহ করে এখানে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাছাই করে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। ফেলে দেওয়া পালক অনেক সম্ভাবনাময় একটা পণ্য হয়ে উঠেছে।’
কল্পনা রানী রায় আরও জানান, কারখানাটিকে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে বলা হয়েছে। শর্তগুলো পূরণ করা হলে সরকারি স্বীকৃতি বা পদকের জন্য নাম পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তাঁর মতে, কারখানাটিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে হাঁসের পালক থেকে বিভিন্ন পণ্য দেশেই উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও তৈরি হবে।
ফেলে দেওয়া হাঁসের পালককে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা কাজে লাগাতে পারলে অব্যবহৃত উপকরণও দেশের রপ্তানি আয়ের নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে প্রয়োজন উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থায়ন এবং দেশে মূল্য সংযোজনের সুযোগ তৈরি করা।





















