ব্রাজিলের চিনির চুক্তি ভেঙে লন্ডনে ধরা খেল এস আলম, দিতে হবে ২৫ কোটির ক্ষতিপূরণ

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:২১:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
ব্রাজিল থেকে র-সুগার বা অপরিশোধিত চিনি আমদানির একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে একতরফাভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘটনায় এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন লন্ডনের একটি আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনাল। রায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৪ কোটি ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সুদ, আইনি ব্যয় এবং সালিশি কার্যক্রমের জন্য আরও প্রায় ৪৩ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫২ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর হোয়াটসঅ্যাপে আলোচনার মাধ্যমে ব্রাজিলের রাইজেন ট্রেডিং এসএ এবং এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন ভিএইচপি কাঁচা আখের চিনি কেনাবেচায় সমঝোতায় পৌঁছায়।
ঢাকাভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ডেইলি ওয়াদায় লন্ডনভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১১ মে লন্ডনের সুগার অ্যাসোসিয়েশন (এসএএল) ট্রাইব্যুনাল এই রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ হলো, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এস আলম চুক্তি বাস্তবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সেই সিদ্ধান্ত চুক্তির শর্ত কিংবা ইংরেজি আইনের অধীনে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
ডিএইচএলের রেকর্ড অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এস আলমের কার্যালয়ে পাঠানো অন্তত দুটি চালান গ্রহণ করা হয়নি। এরপরও ট্রাইব্যুনাল আরও কয়েক দফা নথি পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেন।
ডিএইচএলের রেকর্ড অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এস আলমের কার্যালয়ে পাঠানো অন্তত দুটি চালান গ্রহণ করা হয়নি। এরপরও ট্রাইব্যুনাল আরও কয়েক দফা নথি পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেন।
হোয়াটসঅ্যাপেই হয়েছিল চুক্তির ভিত্তি
নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর হোয়াটসঅ্যাপে আলোচনার মাধ্যমে ব্রাজিলের রাইজেন ট্রেডিং এসএ এবং এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন ভিএইচপি কাঁচা আখের চিনি কেনাবেচায় সমঝোতায় পৌঁছায়। প্রথম চালানের জন্য প্রতি টন ৫২৪ ডলার এবং দ্বিতীয় চালানের জন্য প্রতি টন ৫২৩ দশমিক ৫০ ডলার মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
পরদিন দুই পক্ষ পণ্যের পরিমাণ, সরবরাহের সময়সূচি, অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য লন্ডনের সুগার অ্যাসোসিয়েশনের সালিশি ব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করে আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক নিশ্চিতকরণপত্র বিনিময় করে।
পরে দীর্ঘ আকারের একটি লিখিত চুক্তির খসড়া তৈরি হলেও তাতে কোনো পক্ষই স্বাক্ষর করেনি। তবে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, আগেই বিনিময় হওয়া ব্যবসায়িক নিশ্চিতকরণপত্র এবং দুই পক্ষের পরবর্তী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল।
এলসির প্রস্তুতি, এরপর শর্ত পরিবর্তনের চেষ্টা
রায়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এস আলম দুই চালানের জন্য এলসি খোলার প্রস্তুতি হিসেবে প্রো-ফর্মা ইনভয়েস চেয়েছিল। এরপর প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির কয়েকটি ধারা পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে রাইজেন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দেয়, মূল চুক্তি ইতোমধ্যেই কার্যকর হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলে চুক্তি বাতিলের ঘোষণা
বাংলাদেশে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট এস আলম লিখিতভাবে রাইজেনকে জানায়, তারা ‘ফোর্স মেজর’ ধারা কার্যকর করছে এবং চুক্তি বাস্তবায়ন আর সম্ভব নয়।
এস আলমের দাবি ছিল, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিস্থিতি, সরকার পরিবর্তন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের আরোপিত আর্থিক বিধিনিষেধের কারণে তাদের পক্ষে এলসি খোলা বা অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকগুলো এস আলম গ্রুপকে আর্থিক সেবা দিতে পারছিল না এবং তাদের ব্যাংক হিসাব কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল বলেও দাবি করা হয়। এসব কারণ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির দায় থেকে নিজেদের অব্যাহতি ঘোষণা করে।
ট্রাইব্যুনাল কেন সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি
রাইজেন শুরু থেকেই এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে। তাদের যুক্তি ছিল, চুক্তিতে থাকা ‘ফোর্স মেজর’ ধারা কেবল বিক্রেতার জন্য প্রযোজ্য, যখন বিক্রেতা চিনি পাঠাতে ব্যর্থ হন। ক্রেতা এই ধারা ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের দায় এড়াতে পারেন না।
রাইজেন আরও জানায়, অর্থ পরিশোধের জন্য এলসি একমাত্র ব্যবস্থা ছিল না। চুক্তিতে শিপিং ডকুমেন্টের বিপরীতে সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফারের সুযোগও রাখা হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জটিলতা থাকলেও বিকল্প উপায়ে চুক্তি বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল।
ট্রাইব্যুনাল এই যুক্তির সঙ্গে একমত হন। রায়ে বলা হয়, এসএএলের রুল ১২৪ অনুযায়ী ‘ফোর্স মেজর’ সুরক্ষা কেবল বিক্রেতার জন্য প্রযোজ্য। একই সঙ্গে চুক্তির অর্থ পরিশোধের ধারা বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এলসির বাইরে ব্যাংক ট্রান্সফারেরও সুযোগ ছিল। ফলে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে অর্থায়ন সম্ভব না হলেও সেটি চুক্তি বাস্তবায়নের একমাত্র পথ ছিল না।
রায়ে আরও বলা হয়, এস আলমের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ চুক্তি বাস্তবায়নকে আইনগত বা বাস্তবিকভাবে অসম্ভব করে তুলেছিল, এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠানটির চিঠিপত্র ও অবস্থান থেকে স্পষ্ট হয়েছে, তারা আর চুক্তি পালন করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের মতে, সেটিই ছিল চুক্তি প্রত্যাখ্যান বা ‘রিপুডিয়েটরি ব্রিচ’।
ক্ষতির হিসাব যেভাবে নির্ধারণ করা হল
ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল এই বিষয়টি গ্রহণ করে যে, চুক্তি সম্পাদনের পর রাইজেন ফিউচারস মার্কেটে তার ঝুঁকি ‘হেজ’ করেছিল। পরে এস আলম চুক্তি বাস্তবায়ন করবে না জানালে সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হয়।
চুক্তি বাতিলের সময়কার বাজারমূল্য বিবেচনায় প্রতি মেট্রিক টনে ৩৬ ডলার ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়। প্রথম চালানের ৫৫ হাজার মেট্রিক টনের ভিত্তিতে মোট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার।
ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ট্রাইব্যুনাল রাইজেনকে সুদও প্রদান করে এবং এস আলমকে সালিশি ব্যয় ও আইনি খরচ পরিশোধের নির্দেশ দেয়। রায়ের প্রচ্ছদ পৃষ্ঠায় এসএএল-এর সালিশি ফি ও ব্যয় ৩২ হাজার ৪৩০ পাউন্ড স্টার্লিং উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রায় ৪৩ হাজার মার্কিন ডলারের (আনুমানিক ৫২ লাখ টাকা) সমপরিমাণ। এতে অবশ্য ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত নয়।
নোটিশ গ্রহণে অস্বীকৃতি, শুনানিতেও গরহাজির
সালিশি নথিতে আরও দেখা যায়, কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এস আলমকে একাধিকবার নোটিশ, দাবিপত্র ও বিভিন্ন আদেশ পাঠানো হয়। চুক্তিতে উল্লেখিত ঠিকানায় ই-মেইল এবং ডিএইচএল কুরিয়ারের মাধ্যমে এসব নথি পাঠানো হয়েছিল।
ডিএইচএলের রেকর্ড অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এস আলমের কার্যালয়ে পাঠানো অন্তত দুটি চালান গ্রহণ করা হয়নি। এরপরও ট্রাইব্যুনাল আরও কয়েক দফা নথি পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেন।
তবে একাধিকবার সময় বাড়িয়েও এস আলম কোনো লিখিত জবাব দাখিল করেনি এবং সালিশি কার্যক্রমেও অংশ নেয়নি। ফলে বাদীপক্ষের উপস্থাপিত লিখিত নথির ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল রায় দেন।
সংযুক্ত আরেকটি ডিএইচএল ট্র্যাকিং রেকর্ডে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মে মাসে লন্ডন থেকে বাংলাদেশে পাঠানো রায়ের কপিও শেষ পর্যন্ত বিতরণ করা যায়নি। ট্র্যাকিং রেকর্ডে চট্টগ্রামে একটি ডেলিভারি প্রচেষ্টার বিপরীতে ‘ডেলিভারি নট অ্যাকসেপ্টেড’ উল্লেখ রয়েছে। পরে চালানটি যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানো হয়।
রায় সম্পর্কে জানতে এস আলম গ্রুপের এক প্রতিনিধির কাছে মন্তব্য চাইলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডেইলি ওয়াদা।
বাংলাদেশের চিনি শিল্প প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। দেশে বছরে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ লাখ টন চিনি ব্যবহৃত হয়, যার কাঁচামাল প্রধানত ব্রাজিল থেকে আমদানি করে বেসরকারি পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এস আলম দেশের অন্যতম বৃহৎ পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রামে তাদের বছরে প্রায় ৬ লাখ টন সক্ষমতার একটি পরিশোধনাগার রয়েছে এবং দেশের পরিশোধিত চিনির বাজারের আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি আরও দুটি পরিশোধনাগার নির্মাণে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছিল।




















