লাইসেন্স ছাড়াই চলছে অনেক প্রতিষ্ঠান, জরুরি সেবা পৌঁছাতে লাগে দীর্ঘ সময়
৮০ কিলোমিটার মেরিন ড্রাইভে শত শত হোটেল-রিসোর্ট, নেই ফায়ার স্টেশন

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪৪:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
সমুদ্র আর পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই পর্যটকদের ভিড় জমে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে। প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে শত শত হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ। পর্যটন ব্যবসার বিস্তার ঘটলেও বাড়েনি জরুরি অগ্নিনির্বাপণসেবার সক্ষমতা। পুরো এলাকায় নেই ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্থায়ী স্টেশন। আগুন লাগলে নির্ভর করতে হয় উখিয়া ও কক্সবাজারের ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ওপর। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর আগেই অনেক ক্ষেত্রে আগুন ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু এবং ছয়জন আহত হওয়ার পর এই নিরাপত্তাঘাটতি নতুন করে সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, মেরিন ড্রাইভের অনেক হোটেল-রিসোর্ট প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে পর্যটন ব্যবসার দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দাবি, শুধু দুর্ঘটনার পর অভিযান চালানো নয়, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় দ্রুত ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন এবং প্রতিটি আবাসিক স্থাপনার অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
আগুন নেভাতে যেতে হয় ২২ কিলোমিটার দূর থেকে
দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী পাথুরে সৈকত, পাটুয়ারটেক ও টেকনাফ সৈকত—মেরিন ড্রাইভের এসব পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা। কিন্তু জরুরি অগ্নিনির্বাপণসেবা সহজলভ্য হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগলে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে কোটবাজার হয়ে ঘটনাস্থলে যেতে হয়। কোনো কোনো স্থানের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। ফলে সড়কের পরিস্থিতি ও যাতায়াতের ওপর নির্ভর করে জরুরি সেবা পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুবিন বলেন, টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হলেও ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগেছিল বলে তাঁর ধারণা। তাঁর মতে, এত দেরিতে পৌঁছানোর কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ইব্রাহীম আহমেদ নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ইনানীর পাটুয়ারটেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হলেও সেখানে ফায়ার সার্ভিসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। আগুন লাগলে উখিয়া স্টেশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। দূরত্ব বেশি হওয়ায় উদ্ধারকারী গাড়ি পৌঁছাতে সময় লাগে।
তিনি জানান, এলাকায় আগেও বাড়িঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই অনেক সময় ঘরবাড়ি পুড়ে যায়। তাঁর দাবি, এলাকায় স্টেশন স্থাপনের জন্য জায়গা রয়েছে; সরকার উদ্যোগ নিলে সেখানে স্টেশন করা সম্ভব।
স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন এলাকায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের দাবি জানানো হচ্ছে। উখিয়া সদর থেকে কোটবাজার হয়ে মেরিন ড্রাইভে আসতে হয় বলে যানজটসহ নানা কারণে দেরি হয়। এতে অগ্নিকাণ্ডে জানমাল ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার আশঙ্কা থাকে।
শামশুল আলম নামের আরেক বাসিন্দার মতে, ইনানীতে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করা হলে উখিয়া, ইনানী ও টেকনাফের মধ্যবর্তী পর্যটন এলাকাগুলোতে দ্রুত জরুরি সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেতে পারে।

সতর্কবার্তার পরও চালু ছিল টুপটুপ রিসোর্ট
পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। এর আগে প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং সতর্কবার্তার পরও রিসোর্ট চালু থাকার বিষয়টি এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে মেরিন ড্রাইভের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা রয়েছে কি না, তা জানতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নথি ও অনুমোদন যাচাই প্রয়োজন।
পর্যটক সিরাজুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের পাশাপাশি হোটেল কর্তৃপক্ষেরও। হোটেল চালুর আগে এবং পরিচালনার সময় নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করা জরুরি।
তাঁর মতে, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে এমন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করেই হোটেল পরিচালনা করা উচিত।
পর্যটক মোবারক হোসেন বলেন, মেরিন ড্রাইভের হোটেলগুলোর আশপাশে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন না থাকায় এলাকাটি ঝুঁকিপূর্ণ। কোন হোটেলের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে আর কোনটির নেই, সে বিষয়ে পর্যটকদের জানার সুযোগও সীমিত। নিয়মবহির্ভূতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলে দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা পেতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অভিযান জোরদারের আশ্বাস প্রশাসনের
হোটেল-রিসোর্টের বৈধতা ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ে অভিযান জোরদার করার কথা জানিয়েছেন উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার।
তিনি বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে হোটেল ও রিসোর্টে অভিযান পরিচালনা করা হয়। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে এসব অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
ইউএনও জানান, কিছুদিন আগেও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির কয়েকজন সদস্য এবং জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকটি হোটেল-রিসোর্টে অভিযান চালিয়েছেন। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনগত বৈধতা, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হবে।
তবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি সেসব অভিযানে কী ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে, কতটি প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হয়েছে এবং সতর্কতার পর সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে অভিযানের ফলাফল ও পরবর্তী পদক্ষেপের জবাবদিহি প্রয়োজন।
মেরিন ড্রাইভে ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা
মেরিন ড্রাইভ এলাকায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের পাশাপাশি স্থল ও ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, বর্তমানে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে হয়। মেরিন ড্রাইভে ফায়ার স্টেশন স্থাপন করা হলে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম আরও দ্রুত ও সহজ হবে।
তিনি বলেন, সেখানে একটি স্থল ও ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে অগ্নিনির্বাপণের পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সক্ষমতাও বাড়বে।
তবে পরিকল্পনাটি কবে বাস্তবায়িত হবে, স্টেশন স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণ ও অর্থায়নের অগ্রগতি কতটুকু—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি।
পর্যটন বাড়ছে, নিরাপত্তার ঘাটতি কতটা?
মেরিন ড্রাইভে পর্যটন অবকাঠামোর বিস্তার ঘটলেও জরুরি অগ্নিনির্বাপণসেবার সীমাবদ্ধতা এবং হোটেল-রিসোর্টের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ রয়ে গেছে। টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু এই ব্যবস্থার দুর্বলতা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শনাক্ত করার পর সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং নিয়ম না মানলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনার সময় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর মতো জনবল, সরঞ্জাম ও নিকটবর্তী ফায়ার স্টেশন আছে কি না, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
মেরিন ড্রাইভে স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন, হোটেল-রিসোর্টের লাইসেন্স যাচাই এবং নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরিদর্শন—এই তিনটি বিষয় কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। এখন এসব উদ্যোগ বাস্তবে কত দ্রুত এগোয়, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা।























