সতর্কবার্তার পরও চালু ছিল রিসোর্ট ‘টুপটুপ’, চার মাস আগেই ঝুঁকি শনাক্ত

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে পর্যটকদের আবাসনের জন্য চালু থাকা ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। আগুনের ঝুঁকি শনাক্ত করে চার মাস আগেই স্থাপনাটির কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কিন্তু সেই সতর্কবার্তার পরও রিসোর্টটিতে পর্যটকদের থাকা বন্ধ হয়নি। শেষ পর্যন্ত শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেছে ১০ জনের।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ নারী ও পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে। ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি চারজনের মরদেহ মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই প্রাণহানির পর সামনে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—অগ্নিঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পরও রিসোর্টটি কীভাবে চালু ছিল? সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়ার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? আর পর্যটকদের থাকার উপযোগী হিসেবে স্থাপনাটি পরিচালিত হওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও তদারকির ভূমিকা কী ছিল?
চার মাস আগেই ঝুঁকি শনাক্ত
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। গত ১১ জুন পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে কর্তৃপক্ষকে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ, অগ্নিকাণ্ডের আগেই স্থাপনাটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছিল। কিন্তু সতর্কবার্তা দেওয়ার পর ঝুঁকি দূর করতে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, কিংবা ফায়ার সার্ভিস পরবর্তী সময়ে কোনো অনুসরণমূলক পরিদর্শন করেছিল কি না—এসব তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও পর্যটকদের আবাসন কার্যক্রম চালু থাকার বিষয়টি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে শুধু সতর্কতামূলক নোটিশের তথ্য থেকে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ বা কোনো সরকারি সংস্থার দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। এ জন্য নোটিশের পরবর্তী কার্যক্রম, অনুমোদনের নথি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তব অবস্থা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাঁশ-কাঠের তিনতলা ভবনে দ্রুত ছড়ায় আগুন
শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি তিনতলা স্থাপনাটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করে। স্থানীয় লোকজনও উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।
একপর্যায়ে ভবনের ভেতর থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল। আগুন লাগার সময় ছয়টি কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন।
আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে আগুনের প্রকৃত উৎস এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত, ডিএনএ পরীক্ষায় বাকি চারজন
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ছয়জন হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।
বাকি চারজনের মরদেহ আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আকতার জানিয়েছেন, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা হবে।
পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি নিহত ব্যক্তিরা কীভাবে আগুনের মধ্যে আটকা পড়েছিলেন, কক্ষগুলো থেকে বের হওয়ার পথ কতটা ব্যবহারযোগ্য ছিল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দগ্ধ ও আহত ছয়জন
অগ্নিকাণ্ডে আরও ছয়জন দগ্ধ ও আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১) ও তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯)। অন্য আহত ব্যক্তিরা হলেন মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেলের তথ্য অনুযায়ী, দগ্ধ পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পড়ে গিয়ে আহত অপর একজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান এ তথ্য জানিয়েছেন।
তদন্তে আগুনের সূত্রপাত, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং আগের সতর্কবার্তার পরও স্থাপনাটির কার্যক্রম চালু থাকার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
তবে তদন্তের কার্যকারিতা নির্ভর করবে শুধু আগুনের কারণ নির্ধারণের ওপর নয়; আগুনের আগে নিরাপত্তাব্যবস্থার কী ঘাটতি ছিল, ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালনে কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না—সেসব বিষয়ও স্পষ্ট করা জরুরি।
পর্যটন এলাকার নিরাপত্তায় নজরদারি কতটা কার্যকর?
ইনানীর এই অগ্নিকাণ্ড পর্যটন এলাকার হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য আবাসিক স্থাপনার অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের আবাসন গড়ে উঠলেও সেগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন, জরুরি নির্গমনপথ, আগুন নেভানোর সরঞ্জাম এবং নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—এ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বিশেষ করে কোনো স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর সেই ঝুঁকি দূর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার এবং কীভাবে তা তদারক করা হয়, সে বিষয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টের ক্ষেত্রে চার মাস আগে সতর্কবার্তা দেওয়ার তথ্য থাকায় তদন্তে নোটিশ-পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার কথা। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে শুধু এই অগ্নিকাণ্ডের কারণই নয়, পর্যটন এলাকার আবাসনগুলোর নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতি থাকলে সেটিও শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
দশজনের প্রাণহানির এই ঘটনা তাই কেবল একটি রিসোর্টে আগুন লাগার ঘটনা নয়; অগ্নিঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পরও পর্যটকদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও এখন জরুরি।





















