বছরে বাল্যবিয়ের শিকার ১ কোটি ২০ লাখের বেশি কন্যাশিশু

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৫৭:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুদের জন্য বড় উদ্বেগের নাম বাল্যবিয়ে। প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। ফলে বছরে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অল্প বয়সে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার পাশাপাশি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে লাখ লাখ কিশোরী।
আজ রোববার (১১ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। কন্যাশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিয়ে বন্ধ, নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সমান সুযোগ সৃষ্টির বৈশ্বিক অঙ্গীকার নিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করি’। কন্যাশিশু, অধিকারকর্মী, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতামতের ভিত্তিতে প্রতিপাদ্যটি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উন্নয়নশীল বিশ্বে বাল্যবিয়ের ব্যাপকতা
জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বে বাল্যবিয়ের বড় অংশ ঘটে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চলের আফ্রিকান দেশগুলোতে। সেখানে প্রায় ৩১ শতাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে অপ্রাপ্ত বয়সে হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অল্প বয়সে বিয়ের কারণে অনেক মেয়ের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। কমে যায় নিজের পছন্দ অনুযায়ী জীবন গড়ার সুযোগ। একই সঙ্গে বাড়ে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক কিশোরী বিষণ্নতা, মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মক্ষতি—এমন তথ্যও তুলে ধরেছে জাতিসংঘ।
২৫ বছরে প্রতিরোধ করা গেছে ৬ কোটি ৮০ লাখ বাল্যবিয়ে
বাল্যবিয়ের ভয়াবহতা থাকলেও এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করে জাতিসংঘ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে শিক্ষার প্রসার, আইন প্রণয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার উদ্যোগের মাধ্যমে আনুমানিক ৬ কোটি ৮০ লাখ বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
বাল্যবিয়ে বন্ধে মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি কুসংস্কার ও ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
কন্যাশিশুদের নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ তৈরি এবং নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মতামত জানানোর অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করছে জাতিসংঘ। এসব উদ্যোগ কার্যকর হলে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের পাশাপাশি মেয়েদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানো সম্ভব।
জলবায়ু সংকটেও বাড়ছে মেয়েদের ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ‘বিশ্বের কন্যাশিশুদের অবস্থা’ শীর্ষক গবেষণায় পাঁচ হাজার কিশোরী ও তরুণীর মতামত নেওয়া হয়। গবেষণায় পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে মেয়েদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে, তা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের সঙ্গে যৌন নিপীড়ন, বাল্যবিয়ে ও অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে। দুর্যোগের কারণে পরিবার ও সমাজের আর্থিক চাপ বাড়লে অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হয় এবং তারা বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলা ও সুরক্ষাব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলনে নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আরও গুরুত্ব পায়। ওই সম্মেলনের বেইজিং ঘোষণা নারী ও মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তে ১১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস হিসেবে পালনের অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১২ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
জাতিসংঘের মতে, কন্যাশিশুরা নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা ও সমান সুযোগ পেলে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তাদের সম্ভাবনা বিকশিত হলে দেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক উন্নয়নেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
বাল্যবিয়ে বন্ধ করা তাই শুধু একটি সামাজিক সমস্যা মোকাবিলা নয়; এটি কন্যাশিশুদের অধিকার, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করারও প্রশ্ন। আইন প্রয়োগ, শিক্ষায় বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—সমন্বিত উদ্যোগেই এ ক্ষেত্রে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব।
























