ঢাকা ১১:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঢাকাসহ ২৫ জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ, রয়েছে বৃষ্টির সম্ভাবনাও ঘরছাড়া শিশুর পা কেটে নিয়ে নামানো হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে, সাত মাস পর বাবার কোলে ফিরল হরিজন পরিবার থেকে উঠে এসে  শিক্ষার বিভাগীয় প্রধান সুমা বাঁসফোর ওবায়দুল কাদের, নাছিম, আরাফাত ও নিখিলের কী কী সম্পত্তি, মূল্য কত বিএনপির মনোনয়ন ফরম নিলেন ফখরুলের ভাইসহ ৩ জন চিরকুটে পাওনা টাকার কথা লিখে গিয়েছিলেন পুলক, মৃত্যুর পর মিলল ১০ লাখ ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঝালকাঠিতে জামায়াতের লিফলেট বিতরণ ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ, ৮ অক্টোবর থেকে দেশজুড়ে কঠোর অভিযান বিয়ের দাবিতে কলেজছাত্রীর অনশন, সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মেঘনায় মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ গেল কৃষকের

ঘরছাড়া শিশুর পা কেটে নিয়ে নামানো হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে, সাত মাস পর বাবার কোলে ফিরল

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫০:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চুল কাটার কথা বলে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল ১২ বছরের রায়হান। সেলুনে না গিয়ে চলে যায় কক্সবাজারে। এরপর কী ঘটেছিল তার সঙ্গে? সাত মাস পর এক পা হারিয়ে বাবার সামনে দাঁড়ানোর পর উঠে এসেছে ভয়াবহ এক অভিযোগ—ভিক্ষাবৃত্তিতে নামাতে তাকে ব্যবহার করেছে একটি চক্র। ট্রেনযাত্রার সময় দুর্ঘটনায় পা কেটে যাওয়ার কথা বলে শিশুটিকে দিয়ে ভিক্ষা করানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন, দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত অঙ্গহানি?

চুল কাটার জন্য বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের রায়হান। উদ্দেশ্য ছিল সেলুনে যাওয়া। কিন্তু সেলুনে না গিয়ে সে চলে যায় কক্সবাজারে। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় কথিত এক দালাল চক্রের সদস্যদের।

এরপর ট্রেনে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রায়হান। সকালে ঘুম ভাঙার পর তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যটি চোখে পড়ে—ডান পা হাঁটু পর্যন্ত নেই।

শিশুটিকে তখন বলা হয়, ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছিল সে। প্রাণ বাঁচাতে অস্ত্রোপচার করে পা কেটে ফেলতে হয়েছে।

রায়হান সেই কথা বিশ্বাস করেছিল।

কিন্তু এরপর যা ঘটেছে, সেটিই এখন পুরো ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পা হারানো শিশুটিকে হাসপাতালে রেখে পরিবারের কাছে পাঠানোর বদলে তাকে নামানো হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। আয় করা টাকা জমিয়ে রাখার জন্য কিনে দেওয়া হয় মাটির ব্যাংক। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এভাবেই প্রায় সাত মাস ধরে ভিক্ষা করে রায়হান।

শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতিতে একটি মাহফিলে ভিক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ বাবার চোখে পড়ে সে। আর সেখানেই সাত মাসের নিখোঁজ জীবনের অবসান ঘটে।

সেলুনে যাওয়ার টাকা, তারপর নিখোঁজ

রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন পেশায় অটোরিকশাচালক। বাড়ি লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাতগড় নোয়াপাড়ায়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রায়হানকে একটি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু পড়াশোনায় নিয়মিত ছিল না সে। পরিবারের মধ্যেও নানা কারণে অবহেলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে তার স্বজনরা।

প্রায় সাত মাস আগে চুল কাটার জন্য ছেলেকে টাকা দেন নাজিম উদ্দিন। সেই টাকা নিয়েই বাড়ি থেকে বের হয় রায়হান।

কিন্তু আর বাড়ি ফেরেনি।

পরিবার তখন জানত না, কয়েক মাস পর তাদের সন্তানকে তারা দেখতে পাবেন—তাও একটি পা হারানো অবস্থায়।

কক্সবাজার থেকে কমলাপুর—মাঝখানে কী ঘটেছিল?

রায়হানের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজারে যায়। সেখানে কথিত দালাল চক্রের সদস্যদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

তারপর তাকে ট্রেনের ছাদে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানিয়েছে শিশুটি।

কমলাপুরে এসে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে রায়হান। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার ডান পা নেই।

একজন ১২ বছরের শিশু—অপরিচিত শহর, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, আর হঠাৎ একটি পা হারানো। সেই মুহূর্তে কী ঘটেছিল, কে তাকে হাসপাতালে নিয়েছিল, কোথায় চিকিৎসা হয়েছিল, চিকিৎসার খরচ কে দিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

আর এই জায়গাটিই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের ক্ষেত্র।

‘ট্রেন থেকে পড়ে পা কেটে গেছে’—শিশুকে কি গল্প শোনানো হয়েছিল?

রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা তাকে জানায়, ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে সে গুরুতর আহত হয়েছিল। পরে চিকিৎসার জন্য তার পা কেটে ফেলতে হয়েছে।

কিন্তু এই দাবির সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

কারণ, যদি সত্যিই চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে রায়হান গুরুতর আহত হয়ে থাকে, তাহলে তাকে কোথায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল? কোন হাসপাতালে? কোন চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেছেন? চিকিৎসার নথি কোথায়? তার অভিভাবককে কেন জানানো হয়নি?

আর যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না মেলে, তাহলে সামনে আসে আরও ভয়াবহ সম্ভাবনা—রায়হানের পা কি দুর্ঘটনায় কাটা পড়েছিল, নাকি তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অঙ্গহানি করা হয়েছিল?

বর্তমানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তদন্তের জন্য এটিই হওয়া উচিত অন্যতম প্রধান বিষয়।

পা হারানোর পরই ভিক্ষাবৃত্তি

রায়হানের অভিযোগ অনুযায়ী, পা হারানোর পর তাকে ভিক্ষা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়।

শুধু ভিক্ষায় নামিয়েই থেমে থাকেনি চক্রটি। ভিক্ষা করে পাওয়া টাকা জমিয়ে রাখার জন্য তাকে একটি মাটির ব্যাংকও কিনে দেওয়া হয়।

এরপর সাত মাস ধরে কমলাপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করেছে সে।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—একটি ১২ বছরের শিশু সাত মাস ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করল, অথচ তার পরিবারের কাছে কোনো খবর গেল না কেন?

কেউ কি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছিল? তার আয় কে নিত? কোথায় থাকত সে? কার সঙ্গে থাকত? প্রতিদিন কত টাকা ভিক্ষা করত? সেই টাকা কার হাতে তুলে দিত?

এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা গেলে কথিত চক্রটির কাঠামো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

চুনতির মাহফিলে বদলে গেল সবকিছু

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতিতে ১৯ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক মাহফিল চলছিল। শনিবার রাতে সেখানে ভিক্ষা করতে নিয়ে আসা হয় রায়হানকে।

ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ বাবার চোখে পড়ে এক পা হারানো একটি শিশুকে।

কাছে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন—এ তো তারই ছেলে।

নাজিম উদ্দিন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নেন।

সাত মাস ধরে যে সন্তান নিখোঁজ ছিল, তাকে ফিরে পেলেন তিনি। তবে যে সন্তান বাড়ি থেকে বের হয়েছিল দুই পায়ে হেঁটে, সে ফিরল একটি পা হারিয়ে।

নাজিমের ভাষ্য, রায়হানের ডান পা হাঁটু পর্যন্ত কাটা।

এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত যে প্রশ্নগুলো

রায়হানের ঘটনা শুধু একটি নিখোঁজ শিশুর পরিবারের কাছে ফিরে আসার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্ভাব্য সংঘবদ্ধ ভিক্ষাবৃত্তি, শিশুকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং অঙ্গহানির গুরুতর অভিযোগ।

তদন্ত হলে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—

প্রথমত, কক্সবাজারে কারা রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল?

দ্বিতীয়ত, তাকে কে ট্রেনে ঢাকায় নিয়ে এসেছিল এবং সেই যাত্রার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রমাণ পাওয়া যায় কি না?

তৃতীয়ত, কমলাপুরে পা হারানোর পর তাকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল?

চতুর্থত, অস্ত্রোপচারের কোনো মেডিকেল রেকর্ড আছে কি না?

পঞ্চমত, রায়হানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না করে শিশুটিকে কীভাবে সাত মাস ভিক্ষাবৃত্তিতে রাখা হলো?

ষষ্ঠত, ভিক্ষার টাকা কে সংগ্রহ করত?

সপ্তমত, চুনতির মাহফিলে তাকে কারা নিয়ে এসেছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো বলে দেবে—রায়হান নিছক দুর্ঘটনার শিকার, নাকি আরও বড় কোনো চক্রের শিকার।

থানায় এখনো অভিযোগের অপেক্ষা

লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন। পরিবার আইনি সহায়তা চাইলে আইনগতভাবে সহায়তা করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে এত গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু পরিবারের অভিযোগের অপেক্ষায় থাকাই যথেষ্ট কি না, সেটিও প্রশ্ন।

কারণ এখানে একজন শিশু সাত মাস নিখোঁজ ছিল। সে এখন এক পা হারানো অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরেছে এবং নিজেই একটি চক্রের কথা বলছে।

তার বক্তব্যের পাশাপাশি চিকিৎসা নথি, যাতায়াতের তথ্য, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শী এবং শিশুটিকে যারা নিয়ন্ত্রণ করত তাদের শনাক্ত করা—সবই জরুরি।

শেষ পর্যন্ত রায়হানের পা কাটা পড়ার সত্যিটা কী?

রায়হান এখন পরিবারের কাছে। কিন্তু তার পা হারানোর রহস্য এখনো রয়ে গেছে।

চক্রের সদস্যরা যে গল্প বলেছে—‘ট্রেন থেকে পড়ে পা কেটে গেছে’—তা কি সত্য? নাকি ভিক্ষাবৃত্তিতে বেশি টাকা আয়ের জন্য শিশুটিকে অঙ্গহানি করা হয়েছিল?

এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—একটি ১২ বছরের শিশু সাত মাস পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর এক পা হারিয়ে ফিরে এসেছে।

এই ঘটনার সত্য উদ্‌ঘাটনে শুধু রায়হানের পরিবারের নয়, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থারও দায়িত্ব রয়েছে।

কারণ রায়হান যদি সত্যিই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের শিকার হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু তার পা হারানোর নয়—আর কত শিশু একইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, আর তাদের মধ্যে কতজনের শরীর ও অসহায়ত্বকে ভিক্ষার পুঁজি বানানো হচ্ছে?

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ঘরছাড়া শিশুর পা কেটে নিয়ে নামানো হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে, সাত মাস পর বাবার কোলে ফিরল

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫০:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চুল কাটার কথা বলে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল ১২ বছরের রায়হান। সেলুনে না গিয়ে চলে যায় কক্সবাজারে। এরপর কী ঘটেছিল তার সঙ্গে? সাত মাস পর এক পা হারিয়ে বাবার সামনে দাঁড়ানোর পর উঠে এসেছে ভয়াবহ এক অভিযোগ—ভিক্ষাবৃত্তিতে নামাতে তাকে ব্যবহার করেছে একটি চক্র। ট্রেনযাত্রার সময় দুর্ঘটনায় পা কেটে যাওয়ার কথা বলে শিশুটিকে দিয়ে ভিক্ষা করানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন, দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত অঙ্গহানি?

চুল কাটার জন্য বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল ১২ বছরের রায়হান। উদ্দেশ্য ছিল সেলুনে যাওয়া। কিন্তু সেলুনে না গিয়ে সে চলে যায় কক্সবাজারে। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় কথিত এক দালাল চক্রের সদস্যদের।

এরপর ট্রেনে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল রায়হান। সকালে ঘুম ভাঙার পর তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যটি চোখে পড়ে—ডান পা হাঁটু পর্যন্ত নেই।

শিশুটিকে তখন বলা হয়, ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছিল সে। প্রাণ বাঁচাতে অস্ত্রোপচার করে পা কেটে ফেলতে হয়েছে।

রায়হান সেই কথা বিশ্বাস করেছিল।

কিন্তু এরপর যা ঘটেছে, সেটিই এখন পুরো ঘটনাকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পা হারানো শিশুটিকে হাসপাতালে রেখে পরিবারের কাছে পাঠানোর বদলে তাকে নামানো হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। আয় করা টাকা জমিয়ে রাখার জন্য কিনে দেওয়া হয় মাটির ব্যাংক। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এভাবেই প্রায় সাত মাস ধরে ভিক্ষা করে রায়হান।

শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতিতে একটি মাহফিলে ভিক্ষা করতে গিয়ে হঠাৎ বাবার চোখে পড়ে সে। আর সেখানেই সাত মাসের নিখোঁজ জীবনের অবসান ঘটে।

সেলুনে যাওয়ার টাকা, তারপর নিখোঁজ

রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন পেশায় অটোরিকশাচালক। বাড়ি লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাতগড় নোয়াপাড়ায়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রায়হানকে একটি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু পড়াশোনায় নিয়মিত ছিল না সে। পরিবারের মধ্যেও নানা কারণে অবহেলার শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে তার স্বজনরা।

প্রায় সাত মাস আগে চুল কাটার জন্য ছেলেকে টাকা দেন নাজিম উদ্দিন। সেই টাকা নিয়েই বাড়ি থেকে বের হয় রায়হান।

কিন্তু আর বাড়ি ফেরেনি।

পরিবার তখন জানত না, কয়েক মাস পর তাদের সন্তানকে তারা দেখতে পাবেন—তাও একটি পা হারানো অবস্থায়।

কক্সবাজার থেকে কমলাপুর—মাঝখানে কী ঘটেছিল?

রায়হানের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে বের হয়ে সে কক্সবাজারে যায়। সেখানে কথিত দালাল চক্রের সদস্যদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

তারপর তাকে ট্রেনের ছাদে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানিয়েছে শিশুটি।

কমলাপুরে এসে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে রায়হান। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার ডান পা নেই।

একজন ১২ বছরের শিশু—অপরিচিত শহর, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, আর হঠাৎ একটি পা হারানো। সেই মুহূর্তে কী ঘটেছিল, কে তাকে হাসপাতালে নিয়েছিল, কোথায় চিকিৎসা হয়েছিল, চিকিৎসার খরচ কে দিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

আর এই জায়গাটিই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের ক্ষেত্র।

‘ট্রেন থেকে পড়ে পা কেটে গেছে’—শিশুকে কি গল্প শোনানো হয়েছিল?

রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রের সদস্যরা তাকে জানায়, ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে সে গুরুতর আহত হয়েছিল। পরে চিকিৎসার জন্য তার পা কেটে ফেলতে হয়েছে।

কিন্তু এই দাবির সত্যতা যাচাই করা জরুরি।

কারণ, যদি সত্যিই চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে রায়হান গুরুতর আহত হয়ে থাকে, তাহলে তাকে কোথায় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল? কোন হাসপাতালে? কোন চিকিৎসক অস্ত্রোপচার করেছেন? চিকিৎসার নথি কোথায়? তার অভিভাবককে কেন জানানো হয়নি?

আর যদি এসব প্রশ্নের উত্তর না মেলে, তাহলে সামনে আসে আরও ভয়াবহ সম্ভাবনা—রায়হানের পা কি দুর্ঘটনায় কাটা পড়েছিল, নাকি তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে অঙ্গহানি করা হয়েছিল?

বর্তমানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তদন্তের জন্য এটিই হওয়া উচিত অন্যতম প্রধান বিষয়।

পা হারানোর পরই ভিক্ষাবৃত্তি

রায়হানের অভিযোগ অনুযায়ী, পা হারানোর পর তাকে ভিক্ষা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়।

শুধু ভিক্ষায় নামিয়েই থেমে থাকেনি চক্রটি। ভিক্ষা করে পাওয়া টাকা জমিয়ে রাখার জন্য তাকে একটি মাটির ব্যাংকও কিনে দেওয়া হয়।

এরপর সাত মাস ধরে কমলাপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করেছে সে।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ—একটি ১২ বছরের শিশু সাত মাস ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করল, অথচ তার পরিবারের কাছে কোনো খবর গেল না কেন?

কেউ কি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছিল? তার আয় কে নিত? কোথায় থাকত সে? কার সঙ্গে থাকত? প্রতিদিন কত টাকা ভিক্ষা করত? সেই টাকা কার হাতে তুলে দিত?

এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা গেলে কথিত চক্রটির কাঠামো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

চুনতির মাহফিলে বদলে গেল সবকিছু

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতিতে ১৯ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক মাহফিল চলছিল। শনিবার রাতে সেখানে ভিক্ষা করতে নিয়ে আসা হয় রায়হানকে।

ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ বাবার চোখে পড়ে এক পা হারানো একটি শিশুকে।

কাছে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন—এ তো তারই ছেলে।

নাজিম উদ্দিন ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নেন।

সাত মাস ধরে যে সন্তান নিখোঁজ ছিল, তাকে ফিরে পেলেন তিনি। তবে যে সন্তান বাড়ি থেকে বের হয়েছিল দুই পায়ে হেঁটে, সে ফিরল একটি পা হারিয়ে।

নাজিমের ভাষ্য, রায়হানের ডান পা হাঁটু পর্যন্ত কাটা।

এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত যে প্রশ্নগুলো

রায়হানের ঘটনা শুধু একটি নিখোঁজ শিশুর পরিবারের কাছে ফিরে আসার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্ভাব্য সংঘবদ্ধ ভিক্ষাবৃত্তি, শিশুকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং অঙ্গহানির গুরুতর অভিযোগ।

তদন্ত হলে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—

প্রথমত, কক্সবাজারে কারা রায়হানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল?

দ্বিতীয়ত, তাকে কে ট্রেনে ঢাকায় নিয়ে এসেছিল এবং সেই যাত্রার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা প্রমাণ পাওয়া যায় কি না?

তৃতীয়ত, কমলাপুরে পা হারানোর পর তাকে কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল?

চতুর্থত, অস্ত্রোপচারের কোনো মেডিকেল রেকর্ড আছে কি না?

পঞ্চমত, রায়হানের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ না করে শিশুটিকে কীভাবে সাত মাস ভিক্ষাবৃত্তিতে রাখা হলো?

ষষ্ঠত, ভিক্ষার টাকা কে সংগ্রহ করত?

সপ্তমত, চুনতির মাহফিলে তাকে কারা নিয়ে এসেছিল?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই হয়তো বলে দেবে—রায়হান নিছক দুর্ঘটনার শিকার, নাকি আরও বড় কোনো চক্রের শিকার।

থানায় এখনো অভিযোগের অপেক্ষা

লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন। পরিবার আইনি সহায়তা চাইলে আইনগতভাবে সহায়তা করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে এত গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু পরিবারের অভিযোগের অপেক্ষায় থাকাই যথেষ্ট কি না, সেটিও প্রশ্ন।

কারণ এখানে একজন শিশু সাত মাস নিখোঁজ ছিল। সে এখন এক পা হারানো অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরেছে এবং নিজেই একটি চক্রের কথা বলছে।

তার বক্তব্যের পাশাপাশি চিকিৎসা নথি, যাতায়াতের তথ্য, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শী এবং শিশুটিকে যারা নিয়ন্ত্রণ করত তাদের শনাক্ত করা—সবই জরুরি।

শেষ পর্যন্ত রায়হানের পা কাটা পড়ার সত্যিটা কী?

রায়হান এখন পরিবারের কাছে। কিন্তু তার পা হারানোর রহস্য এখনো রয়ে গেছে।

চক্রের সদস্যরা যে গল্প বলেছে—‘ট্রেন থেকে পড়ে পা কেটে গেছে’—তা কি সত্য? নাকি ভিক্ষাবৃত্তিতে বেশি টাকা আয়ের জন্য শিশুটিকে অঙ্গহানি করা হয়েছিল?

এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—একটি ১২ বছরের শিশু সাত মাস পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর এক পা হারিয়ে ফিরে এসেছে।

এই ঘটনার সত্য উদ্‌ঘাটনে শুধু রায়হানের পরিবারের নয়, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থারও দায়িত্ব রয়েছে।

কারণ রায়হান যদি সত্যিই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের শিকার হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু তার পা হারানোর নয়—আর কত শিশু একইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে, আর তাদের মধ্যে কতজনের শরীর ও অসহায়ত্বকে ভিক্ষার পুঁজি বানানো হচ্ছে?