চাকরির ফাঁদ থেকে হ্যাকিং—খুলশীর আটতলায় ৬৩ বিদেশির ‘সাইবার ঘাঁটি’

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৩৯:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রাম নগরের খুলশীর একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট। বাইরে থেকে সাধারণ আবাসিক ভবন মনে হলেও দেড় মাস ধরে সেখানে চলছিল ভিন্ন ধরনের কার্যক্রম। সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ তথ্যপ্রযুক্তির নানা সরঞ্জাম দিয়ে ভবনটিকে কার্যত একটি ‘সাইবার ঘাঁটিতে’ পরিণত করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি, সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছিল অনলাইন প্রতারণার নেটওয়ার্ক।
বৃহস্পতিবার রাতে ওই ভবনে অভিযান চালিয়ে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে নগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশী থানা-পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, মুঠোফোনসহ ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের পাঁচজন, নেপালের একজন ও ভিয়েতনামের একজন নাগরিক রয়েছেন।

শুক্রবার বিকেলে নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনসের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মদ এসব তথ্য জানান।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে এই নেটওয়ার্ক জড়িত থাকতে পারে। কখনো নিজেদের ওয়েবসাইট তৈরি করে, আবার কখনো নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা করা হতো বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে চক্রটি ঠিক কত টাকা হাতিয়েছে, কারা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এবং এর পেছনে থাকা মূল হোতারা কারা—এসব এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারীরা।
দেড় মাসে গড়ে ওঠে ‘সাইবার ঘাঁটি’
পুলিশের ভাষ্য, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারকদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হওয়ায় সেখানে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর দেশীয় একটি চক্রের সহায়তায় বাংলাদেশে আসে বিদেশি নাগরিকদের একটি দল।
দেড় মাস আগে দুবাইপ্রবাসী এক ব্যক্তির মালিকানাধীন ভবনটি ভাড়া নেওয়া হয়। এরপর ভবনটির ১৪টি ইউনিটে বসানো হয় সার্ভার, কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ নানা ধরনের ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম।
অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অন্য কোনো বৈধ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এমনকি তাঁদের কাছে পাসপোর্ট ও ভিসাও পাওয়া যায়নি।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পুলিশকে জানিয়েছেন, তাঁদের পাসপোর্ট ও ভিসা দেশীয় একটি চক্রের সদস্যদের কাছে রয়েছে। এখন সেই চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
১৭০ ডিভাইসে কী চলছিল?
অভিযানে উদ্ধার হওয়া ১৭০টি ডিভাইস এখন পুলিশের তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত। এসব ডিভাইসের মধ্যে ল্যাপটপ ও মুঠোফোন রয়েছে। পুলিশের ধারণা, ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হলে অনলাইন প্রতারণার ধরন, ভুক্তভোগীদের তথ্য এবং চক্রটির যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য হ্যাক করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে।
তবে এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের কোনোটিই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফরেনসিক পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদের পরই চক্রটির প্রকৃত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কারা এনেছে, কীভাবে এলেন?
৬৩ বিদেশির কাছে পাসপোর্ট ও ভিসা না পাওয়ার বিষয়টি তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁরা কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, কোন ধরনের ভিসায় এসেছেন এবং কারা তাঁদের থাকা ও কাজের ব্যবস্থা করেছে—এসব জানতে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের ধারণা, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা চক্রটির মাঠপর্যায়ের সদস্য। এর পেছনে থাকা মূল হোতারা দেশেই রয়েছে কি না, থাকলে তারা কারা—তা বের করার চেষ্টা চলছে।
কক্সবাজারের ঘটনার সঙ্গে মিল
খুলশীর অভিযানের কয়েক দিন আগেই কক্সবাজারে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে ছয় বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে চীনের পাঁচজন ও তাইওয়ানের একজন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছিল।
পুলিশ জানিয়েছিল, চীন ও তাইওয়ানের কয়েক শ নাগরিক কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের দুটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কক্সবাজার ও খুলশীর দুই ঘটনায় কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মদ।
এদিকে ৬৩ বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেছে পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম জানিয়েছেন, শুক্রবার তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অনলাইন প্রতারণার পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য পেতে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
এখন পুলিশের সামনে বড় প্রশ্ন—আটতলার ওই ভবনে আসলে কতদিন ধরে কী ধরনের সাইবার কার্যক্রম চলছিল, কার নির্দেশনায় চলছিল এবং এর সঙ্গে দেশের আর কতজন যুক্ত। উদ্ধার হওয়া ১৭০টি ডিভাইসের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদেই মিলতে পারে এসব প্রশ্নের উত্তর।





















