২৯ বছর পর সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডন গ্রেপ্তার, খুলবে কি মৃত্যুরহস্য?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:২৮:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে রহস্যের শুরু, প্রায় তিন দশক পরও তার পুরোপুরি অবসান হয়নি। দীর্ঘ আইনি লড়াই, একাধিক তদন্ত এবং আত্মহত্যা ও হত্যার পাল্টাপাল্টি দাবির পর এবার সেই মামলায় প্রথমবারের মতো একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন।
রোববার ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি ও খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাঁকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা ডনকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, মামলার এজাহারে ডনের বিরুদ্ধে অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। মামলার তদন্তের স্বার্থে তাঁকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
আদালতে হত্যার পরিকল্পনার যে অভিযোগ
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী সালমান শাহর ছোট ভাইকে অপহরণের চেষ্টার ঘটনায় ১৯৯৭ সালে দায়ের হওয়া একটি মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওই মামলার আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদের স্বীকারোক্তিতে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছিল। আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, সামিরা হকের সঙ্গে ডনের সম্পর্কের বিষয়কে কেন্দ্র করে ডন, ফারুক ও রেজভি ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। প্রথমে তাঁকে অচেতন করা হয় এবং পরে আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবে দেখাতে ঝুলিয়ে রাখা হয় বলে আদালতে দাবি করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আশঙ্কা, ডনকে জামিনে ছেড়ে দেওয়া হলে তিনি আবার দেশ ছেড়ে পালাতে পারেন।
তবে আদালতে উপস্থাপিত এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায়।
যে মৃত্যু আজও আলোচিত
সালমান শাহর পারিবারিক নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের জকিগঞ্জে জন্ম তাঁর। বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় তারকায় পরিণত হন তিনি।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সালমানের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রথমে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই দাবি করা হয়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশ ও পরবর্তী তদন্ত সংস্থাগুলোর একাধিক প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বা অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হলেও মা নীলা চৌধুরী সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছেলেকে হত্যার অভিযোগে আইনি লড়াই চালিয়ে যান।
একের পর এক তদন্তেও কাটেনি রহস্য
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে সালমান শাহর বাবা আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। পরে ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। ২০১৪ সালে দেওয়া বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনেও সালমান শাহর মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এরপর ২০১৬ সালে আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনেও বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
তবে এই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি নীলা চৌধুরী। ২০২১ সালের অক্টোবরে তিনি আদালতে নারাজি আবেদন করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, সঠিকভাবে তদন্ত না করে প্রভাবিত হয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলা
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর গত বছর ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মামলাটি তদন্তের জন্য রমনা থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরদিন, ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
মৃত্যুর আগের রাতেও ছিল নানা প্রশ্ন
সালমান শাহর মৃত্যুর আগের দিন ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় তিনি ‘প্রেমপিয়াসী’ সিনেমার ডাবিং করতে এফডিসিতে গিয়েছিলেন। সেখানে ছবির নায়িকা শাবনূরও উপস্থিত ছিলেন।
পরে সালমান তাঁর বাবা কমরউদ্দিনকে ফোন করে স্ত্রী সামিরাকে নিয়ে এফডিসিতে আসতে বলেন। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সাক্ষাৎকার ও লেখায় বলা হয়েছে, সামিরা সেখানে সালমান ও শাবনূরকে ডাবিং রুমে খুনসুটি করতে দেখেছিলেন।
ঘটনাটি নিয়ে সামিরা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সময়ে দাবি করা হয়েছে। পরে সালমান, সামিরা ও পরিচালক বাদল খন্দকার একই গাড়িতে ওঠেন। এফডিসির প্রধান ফটকের সামনে সালমান ও বাদল খন্দকার গাড়ি থেকে নেমে যান।
রাত ১১টার দিকে বাদল খন্দকার সালমানকে নিউ ইস্কাটন রোডের বাসায় পৌঁছে দিয়ে চলে যান। পরদিন সকালে তাঁর বাসায় গিয়ে তিনি সালমানের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন।
সকালেই বদলে যায় সবকিছু
৬ সেপ্টেম্বর সকালে সালমানের বাবা ছেলের বাসায় গিয়েছিলেন। তবে ছেলের সঙ্গে দেখা না করেই ফিরে আসেন। পরে বেলা ১১টার দিকে নীলা চৌধুরীর কাছে ফোন যায়। তাঁকে দ্রুত ছেলের বাসায় যেতে বলা হয়।
সালমানকে পরে ইস্কাটনের বাসা থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের পর তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু পরিবারের দাবি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এবার নজর সিআইডির তদন্তে
প্রায় ২৯ বছর ধরে আলোচিত সালমান শাহর মৃত্যু এখন নতুন করে হত্যা মামলার তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। সেই মামলার অন্যতম আসামি ডন গ্রেপ্তার হওয়ায় তদন্তে নতুন গতি আসার প্রত্যাশা করছেন বাদীপক্ষ ও সালমান শাহর ভক্তরা।
মামলার বাদী ও সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম ডন গ্রেপ্তারে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁর প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে সত্য বেরিয়ে আসবে এবং প্রকৃত দায়ীদের বিচার হবে।
মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে। আগামী ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
দীর্ঘদিনের ‘আত্মহত্যা না হত্যা’ বিতর্কের মধ্যে এবার নতুন তদন্তে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, ডনের জিজ্ঞাসাবাদে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মেলে কি না এবং সালমান শাহর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য শেষ পর্যন্ত উদঘাটিত হয় কি না—সেদিকেই এখন নজর।
























