বাবার দাফন শেষে রাতে চাকরি, সকালে পরীক্ষার হলে—হার না মানা ইসমাইলের গল্প

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:২৬:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে
বাবাকে হারানোর শোক তখনও চোখে-মুখে স্পষ্ট। কবরের মাটি তখনও শুকায়নি। অথচ জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে থেমে থাকার সুযোগ দেয়নি। বিকেলে বাবার জানাজা ও দাফন শেষে রাতে আবারও দায়িত্বে ফিরতে হয়েছে তাকে। কারণ তার কাঁধে এখন শুধু নিজের স্বপ্ন নয়, পুরো পরিবারের দায়িত্ব।
বাগেরহাটের তরুণ শিক্ষার্থী ইসমাইল ইকনের এই সংগ্রামের গল্প এখন অনেকের চোখে অশ্রু আর মনে সাহসের জন্ম দিয়েছে। বাবার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে রাতে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন এবং পরদিন সকালে পরীক্ষার হলে বসেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোর রাতে বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ এলাকার ভাড়া বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ইসমাইলের বাবা ইসরাফিল দাড়িয়া (৪৫)। দ্রুত তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে সকাল ৬টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্বজনদের আহাজারির মধ্যেই বাবার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে। সেখানেই সম্পন্ন হয় দাফন। কিন্তু শোকের ভার নিয়ে বসে থাকার সুযোগ ছিল না ইসমাইলের। রাতে ফিরে এসে বাগেরহাট শহরের রেল রোড এলাকার কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে শুরু করেন তার নির্ধারিত দায়িত্ব।
সারারাত দায়িত্ব পালন শেষে বুধবার সকালে সরকারি পিসি কলেজের পরীক্ষার হলে বসেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইসমাইল। চোখে ছিল বাবাকে হারানোর কষ্ট, কিন্তু মনে ছিল লড়াই করে যাওয়ার অদম্য প্রত্যয়।
চার সদস্যের পরিবারে বাবার আয়ই ছিল একমাত্র ভরসা। ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালাতেন ইসরাফিল দাড়িয়া। অভাবের মধ্যেও ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। এসএসসিতে জিপিএ-৪.১১ পাওয়া ইসমাইল খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী।
ইসমাইল বলেন, “অনেক দিন ধরেই সংসারে অভাব ছিল। তাই পড়াশোনার খরচ চালাতে এটিএম বুথে চাকরি নিয়েছিলাম। বাবা চলে যাওয়ায় এখন মনে হচ্ছে অথৈ সাগরে পড়ে গেছি। মা ও মানসিক সমস্যায় থাকা ভাইয়ের দায়িত্ব এখন আমার ওপর। চাকরি ও পড়াশোনা একসঙ্গে চালিয়ে যেতে চাই।”
ইসমাইলের কর্মস্থল কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. সিরাজুল ইসলাম ফকির জানান, চলতি বছরের মে মাস থেকে ইসমাইল এটিএম বুথে কাজ করছেন। এর আগে পড়াশোনার খরচ চালাতে টিউশনিও করতেন তিনি।
খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ খন্দকার আসিফ উদ্দিন রাখী বলেন, আর্থিক অসচ্ছলতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কলেজ থেকে সবসময় ইসমাইলকে সহযোগিতা করা হয়েছে। তার উচ্চশিক্ষার পথেও সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বাবার মৃত্যু একজন সন্তানের জীবনকে ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু ইসমাইল দেখিয়েছেন, দায়িত্ব আর স্বপ্নের কাছে হার মানে না প্রতিকূলতা। তার লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়—অসংখ্য সংগ্রামী তরুণের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প।




















