ঢাকা ০৬:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ১ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কৃষক লীগ নেতার নেতৃত্বে সিন্ডিকেট, ২৭৩ টাকা কেজিতে বিক্রি হলো ৩৭ গরু

আশ্রাফুল আলম, গোদাগাড়ী (রাজশাহী)
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৪৭:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪ ১৪২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে রাজাবাড়িহাট আঞ্চলিক দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামারে নিলামে সিন্ডিকেট চক্রের কাছে সর্বোচ্চ ২৭৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলো ৩৭টি গরু।

সোমবার (১০ জুন) রাজাবাড়িহাট দুগ্ধ ও গবাদি খামারের ৩৭টি গরু নিলামে সিন্ডিকেট করে খুব কম দামে কিনে নিয়েছেন রাজশাহী জেলা কৃষক লীগ নেতা ইমন মণ্ডলের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট দল। অভিযোগ রয়েছে, নিলাম সিন্ডিকেটে সহযোগিতা করেছে খামারের উপপরিচালক ইসমাইল হক। ইমন মণ্ডল ও স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির সাথে খামারের উপপরিচালকের সখ্যতা রয়েছে বলে ব্যাপক গুনজন রয়েছে এলাকায়।

সিন্ডিকেট চক্র ও কিছু অসাধু কর্মকর্তার এই যোগসাজসে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। তবে খামারের কর্মকর্তারা সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার করলেও দাবি করছেন, এখানে তাদের কেউ জড়িত নন।

নিলামে অংশ নিতে ৩৫৭ জন ব্যাংক ড্রাফট (বিডি) জমা দিলেও নিলামে ডাক ধরেছেন মাত্র পাঁচজন। অন্যরা কেউ নিলামে অংশ নেননি।

সরেজমিন দেখা গেছে, নিলামে বড় আকারের একটি ষাঁড়ের ওজন ছিলো প্রায় ১২ মন। খামারের কর্মচারী মহাসিন আলী ডাক ধরলেন। সরকারি ডাক এক লাখ ৩১ হাজার টাকা। ২০০ টাকা বাড়িয়ে ডাক ধরেন তাজমুল নামের নিলামে একজন অংশগ্রহণকারী। এরপর আরও ২০০ টাকা বাড়ান মেহেরাব নামের আরেকজন নিলামে অংশগ্রহনকারী। সবশেষ কালু আরও ২০০ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ টাকায় ষাঁড়টি কিনে নেন। যারা নিলামে ডাক ধরেছে তারা নিলাম সিন্ডিকেটের সদস্য। এক লাখ ৩১ হাজার ৬০০ টাকায় নিলামে বিক্রিকৃত ষাঁড়টি এখন কুরবানির হাটে দাম অন্তত চার লাখ টাকা। একইভাবে মাত্র ১ লাখ ২৫ থেকে ১ লাখ ৩১ হাজারের কিছু বেশি টাকার মধ্যে আরও তিনটি ষাঁড় পানির দরে বিক্রি করা হয়েছে।

নিলাম চলাকালে দেখা গেছে, খামারের কর্মচারী যে সরকারি দর ঘোষণা করছেন, তার চেয়ে ৬০০ টাকা বেশি দরে প্রতিটি গরু বিক্রি হচ্ছে। নিলামের শর্ত ছিল, প্রতিবার ডাক ধরার সময় সরকারি মূল্য অপেক্ষা ২০০ টাকা করে বেশি বলতে হবে। সে অনুযায়ী সিন্ডিকেটের সদস্যরা ২০০ টাকা করে বেশিই ডেকেছেন। তিনজনে ২০০ করে মোট ৬০০ টাকা বাড়িয়ে গরু কিনে নিচ্ছিলেন। প্রতিটি গরু তিনজনের ডাকা হলে আর অন্য কেউ ডাকছিলেন না। ঘোষণা দেওয়া সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ৬০০ টাকা বেশি পেয়েই গরু বিক্রি করে খামার কর্তৃপক্ষ।

খামার কর্তৃপক্ষ এ দিন ৪টি ষাঁড়, ২১টি এঁড়ে, ১০টি গাভি ও ১৬টি বকনা মিলে মোট ৫১টি গরু নিলামের জন্য তোলে। এর মধ্যে ৩৭টি গরু সিন্ডিকেটের লোকজন খুব কম দরে কিনে নেয়।

প্রথম দফায় খামার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কম দামে নিলামে গরু কিনে দুপুরের পর একই স্থানে নিলামের মাধ্যমেই গরু বিক্রি করে এই সিন্ডিকেট চক্র। দ্বিতীয় দফার এ নিলামে সাধারণ মানুষ অংশ নিতে পারেন। সিন্ডিকেটের কাছ থেকে বেশি দামে তাদের গরু কিনতে হয়।

এদিকে প্রথম দফার নিলামের মাধ্যমে খামার ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের দুই কর্মকর্তা দুটি এঁড়ে কিনে নেন। বাকি ১২টি বকনা কেউ কেনেনি।

নিলাম চলাকালে দেখা গেছে, কর্মকর্তাদের কাছে থাকা শিডিউলের খাতায় প্রতিটি গরুর ওজন এবং দর লেখা আছে। তবে যে দর লেখা আছে, তার চেয়ে এক থেকে দুই হাজার টাকা করে বেশি ধরে সরকারি দর হাঁকা হচ্ছে।

শিডিউলের মূল্য অপেক্ষা বেশি দর হাঁকার বিষয়ে জানতে চাইলে খামারের উপপরিচালক ইসমাইল হক বলেন, জীবন্ত গরুর মূল্য ধরা হয়েছে প্রতিকেজি ২৭৫ টাকা। গরুর ওজন নেওয়া হয়েছে দুই মাস আগে। নিলামের প্রক্রিয়া শেষ করতে করতেই প্রায় দুই মাস চলে গেছে। তাই শিডিউল অপেক্ষা এক-দুই হাজার টাকা বেশি দর ধরা হচ্ছে। এই টাকা সরকারি কোষাগারেই জমা হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. জুলফিকার মো. আখতার হোসেন বলেন, খামার থেকে যখনই গরু নিলামে তোলা হয় তখনই সিন্ডিকেট করে এলাকার কিছু লোক গরু কিনে নেন। পরে তারা সেই গরু খামারেই বিক্রি করেন।

তিনি বলেন, ৩৫৭ জন বিডি জমা দিয়েছেন নিলামে অংশ নিতে। কিন্তু পাঁচজনের বাইরে কেউ ডাকলেন না। এমন নয় যে, কেউ কাউকে ডাকতে বাধা দিয়েছেন। বাধা যেন দিতে না পারে তার জন্য পুলিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও কেউ ডাকেননি।
এই নিলামের সিন্ডিকেটে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমন মণ্ডল। কথা বলার জন্য তাকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি নিলামস্থলে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা না বলে সরে পড়েন।

সিন্ডিকেট হয়েছে স্বীকার করে রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরিচালক ও নিলামে মূল্য নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ডা. মো. আব্দুল হাই সরকার বলেন, সিন্ডিকেট হয়েছে। তবে এখানে আমাদের কোনও কর্মকর্তা জড়িত নেই। আমরা সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নিলামের জন্য একটা মূল্য নির্ধারণ করি। সেটি ঢাকা থেকে অনুমোদিতও হয়েছে। আর এই নিলাম নিয়ে প্রতিবছরই সমালোচনা হয়। কেউ বলেন দাম কম হয়েছে। কেউ বলেন দাম বেশি হয়েছে। আর একটি বিষয় হলো বাইরের গরুর দামের সঙ্গে এখানকার গরুর তুলনা হবে না। কারণ এগুলো এভারজে হয়ে গেছে। আর কিছু আছে যেগুলো মাংস উপযোগী না।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

কৃষক লীগ নেতার নেতৃত্বে সিন্ডিকেট, ২৭৩ টাকা কেজিতে বিক্রি হলো ৩৭ গরু

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৪৭:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে রাজাবাড়িহাট আঞ্চলিক দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামারে নিলামে সিন্ডিকেট চক্রের কাছে সর্বোচ্চ ২৭৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলো ৩৭টি গরু।

সোমবার (১০ জুন) রাজাবাড়িহাট দুগ্ধ ও গবাদি খামারের ৩৭টি গরু নিলামে সিন্ডিকেট করে খুব কম দামে কিনে নিয়েছেন রাজশাহী জেলা কৃষক লীগ নেতা ইমন মণ্ডলের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট দল। অভিযোগ রয়েছে, নিলাম সিন্ডিকেটে সহযোগিতা করেছে খামারের উপপরিচালক ইসমাইল হক। ইমন মণ্ডল ও স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির সাথে খামারের উপপরিচালকের সখ্যতা রয়েছে বলে ব্যাপক গুনজন রয়েছে এলাকায়।

সিন্ডিকেট চক্র ও কিছু অসাধু কর্মকর্তার এই যোগসাজসে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার। তবে খামারের কর্মকর্তারা সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার করলেও দাবি করছেন, এখানে তাদের কেউ জড়িত নন।

নিলামে অংশ নিতে ৩৫৭ জন ব্যাংক ড্রাফট (বিডি) জমা দিলেও নিলামে ডাক ধরেছেন মাত্র পাঁচজন। অন্যরা কেউ নিলামে অংশ নেননি।

সরেজমিন দেখা গেছে, নিলামে বড় আকারের একটি ষাঁড়ের ওজন ছিলো প্রায় ১২ মন। খামারের কর্মচারী মহাসিন আলী ডাক ধরলেন। সরকারি ডাক এক লাখ ৩১ হাজার টাকা। ২০০ টাকা বাড়িয়ে ডাক ধরেন তাজমুল নামের নিলামে একজন অংশগ্রহণকারী। এরপর আরও ২০০ টাকা বাড়ান মেহেরাব নামের আরেকজন নিলামে অংশগ্রহনকারী। সবশেষ কালু আরও ২০০ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ টাকায় ষাঁড়টি কিনে নেন। যারা নিলামে ডাক ধরেছে তারা নিলাম সিন্ডিকেটের সদস্য। এক লাখ ৩১ হাজার ৬০০ টাকায় নিলামে বিক্রিকৃত ষাঁড়টি এখন কুরবানির হাটে দাম অন্তত চার লাখ টাকা। একইভাবে মাত্র ১ লাখ ২৫ থেকে ১ লাখ ৩১ হাজারের কিছু বেশি টাকার মধ্যে আরও তিনটি ষাঁড় পানির দরে বিক্রি করা হয়েছে।

নিলাম চলাকালে দেখা গেছে, খামারের কর্মচারী যে সরকারি দর ঘোষণা করছেন, তার চেয়ে ৬০০ টাকা বেশি দরে প্রতিটি গরু বিক্রি হচ্ছে। নিলামের শর্ত ছিল, প্রতিবার ডাক ধরার সময় সরকারি মূল্য অপেক্ষা ২০০ টাকা করে বেশি বলতে হবে। সে অনুযায়ী সিন্ডিকেটের সদস্যরা ২০০ টাকা করে বেশিই ডেকেছেন। তিনজনে ২০০ করে মোট ৬০০ টাকা বাড়িয়ে গরু কিনে নিচ্ছিলেন। প্রতিটি গরু তিনজনের ডাকা হলে আর অন্য কেউ ডাকছিলেন না। ঘোষণা দেওয়া সরকারি দরের চেয়ে মাত্র ৬০০ টাকা বেশি পেয়েই গরু বিক্রি করে খামার কর্তৃপক্ষ।

খামার কর্তৃপক্ষ এ দিন ৪টি ষাঁড়, ২১টি এঁড়ে, ১০টি গাভি ও ১৬টি বকনা মিলে মোট ৫১টি গরু নিলামের জন্য তোলে। এর মধ্যে ৩৭টি গরু সিন্ডিকেটের লোকজন খুব কম দরে কিনে নেয়।

প্রথম দফায় খামার কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কম দামে নিলামে গরু কিনে দুপুরের পর একই স্থানে নিলামের মাধ্যমেই গরু বিক্রি করে এই সিন্ডিকেট চক্র। দ্বিতীয় দফার এ নিলামে সাধারণ মানুষ অংশ নিতে পারেন। সিন্ডিকেটের কাছ থেকে বেশি দামে তাদের গরু কিনতে হয়।

এদিকে প্রথম দফার নিলামের মাধ্যমে খামার ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের দুই কর্মকর্তা দুটি এঁড়ে কিনে নেন। বাকি ১২টি বকনা কেউ কেনেনি।

নিলাম চলাকালে দেখা গেছে, কর্মকর্তাদের কাছে থাকা শিডিউলের খাতায় প্রতিটি গরুর ওজন এবং দর লেখা আছে। তবে যে দর লেখা আছে, তার চেয়ে এক থেকে দুই হাজার টাকা করে বেশি ধরে সরকারি দর হাঁকা হচ্ছে।

শিডিউলের মূল্য অপেক্ষা বেশি দর হাঁকার বিষয়ে জানতে চাইলে খামারের উপপরিচালক ইসমাইল হক বলেন, জীবন্ত গরুর মূল্য ধরা হয়েছে প্রতিকেজি ২৭৫ টাকা। গরুর ওজন নেওয়া হয়েছে দুই মাস আগে। নিলামের প্রক্রিয়া শেষ করতে করতেই প্রায় দুই মাস চলে গেছে। তাই শিডিউল অপেক্ষা এক-দুই হাজার টাকা বেশি দর ধরা হচ্ছে। এই টাকা সরকারি কোষাগারেই জমা হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. জুলফিকার মো. আখতার হোসেন বলেন, খামার থেকে যখনই গরু নিলামে তোলা হয় তখনই সিন্ডিকেট করে এলাকার কিছু লোক গরু কিনে নেন। পরে তারা সেই গরু খামারেই বিক্রি করেন।

তিনি বলেন, ৩৫৭ জন বিডি জমা দিয়েছেন নিলামে অংশ নিতে। কিন্তু পাঁচজনের বাইরে কেউ ডাকলেন না। এমন নয় যে, কেউ কাউকে ডাকতে বাধা দিয়েছেন। বাধা যেন দিতে না পারে তার জন্য পুলিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও কেউ ডাকেননি।
এই নিলামের সিন্ডিকেটে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইমন মণ্ডল। কথা বলার জন্য তাকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি নিলামস্থলে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা না বলে সরে পড়েন।

সিন্ডিকেট হয়েছে স্বীকার করে রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরিচালক ও নিলামে মূল্য নির্ধারণ কমিটির সভাপতি ডা. মো. আব্দুল হাই সরকার বলেন, সিন্ডিকেট হয়েছে। তবে এখানে আমাদের কোনও কর্মকর্তা জড়িত নেই। আমরা সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নিলামের জন্য একটা মূল্য নির্ধারণ করি। সেটি ঢাকা থেকে অনুমোদিতও হয়েছে। আর এই নিলাম নিয়ে প্রতিবছরই সমালোচনা হয়। কেউ বলেন দাম কম হয়েছে। কেউ বলেন দাম বেশি হয়েছে। আর একটি বিষয় হলো বাইরের গরুর দামের সঙ্গে এখানকার গরুর তুলনা হবে না। কারণ এগুলো এভারজে হয়ে গেছে। আর কিছু আছে যেগুলো মাংস উপযোগী না।