পুলক দা’র অভিমান

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৫১:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
কিছু মানুষ শুধু সহকর্মী নন, তাঁরা হয়ে ওঠেন আমাদের পেশাজীবনের একেকটি অধ্যায়। তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কটা কেবল অফিসের টেবিল, খবরের কাগজ কিংবা পেশাগত যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আড্ডায়, গল্পে, হাসিতে, কখনো মতের অমিলে—তাঁরা ধীরে ধীরে আপন হয়ে ওঠেন। সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি—আমাদের কাছে সেই ‘পুলক দা’—তেমনই একজন মানুষ।
কিন্তু তাঁর চলে যাওয়ার খবরটি যেন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
বরিশালে দৈনিক সমকালের ব্যুরো কার্যালয় থেকে ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সন্ধ্যায় উদ্ধার হয়েছে পুলক দার মরদেহ। একসময় যে অফিসে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর পেশাগত সম্পর্ক ছিল, সেই কর্মস্থলই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের শেষ ঠিকানা। এই ঘটনাটি শুধু একজন সাংবাদিকের মৃত্যু নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক মানুষের দীর্ঘদিনের শারীরিক যন্ত্রণা, পেশাগত অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব এবং গভীর অভিমানের গল্প।
চলে যাওয়ার আগে তিনি রেখে গেছেন কয়েকটি চিঠি। স্ত্রী, একমাত্র কন্যা, ছোট ভাই, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং তাঁর সাবেক সহকর্মীর উদ্দেশে লেখা সেই চিঠিগুলো পড়লে বোঝা যায়—শেষ মুহূর্তেও তাঁর ভাবনার বড় অংশজুড়ে ছিলেন অন্যরা।
স্ত্রী ও মেয়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। মেয়েকে পড়াশোনা ও গান শেখা চালিয়ে যেতে বলেছেন। ছোট ভাইকে পরিবারের পাশে থাকার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। সহকর্মীকে বিব্রত করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এমনকি প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা অর্থটুকু যেন পরিবারের হাতে পৌঁছায়, সেই কথাটিও ভুলে যাননি।
একজন মানুষ যখন নিজের শেষ সময়েও স্ত্রী, সন্তান, ভাই ও সহকর্মীদের কথা ভাবেন, তখন তাঁর ভেতরের অসহায়ত্বের গভীরতাটা হয়তো কিছুটা অনুমান করা যায়। কিন্তু পুরোটা বোঝা যায় না।
কারণ মানুষের ভেতরের কষ্টের কোনো দৃশ্যমান চেহারা নেই।
পুলক দা তাঁর চিঠিতে শারীরিক অসুস্থতার কথা বলেছেন। সুস্থ হওয়ার জন্য চিকিৎসা নিয়েছেন, দূরদেশেও গিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অসুস্থতা শুধু শরীরকে দুর্বল করে না; অনেক সময় মানুষের সামাজিক জীবন, কর্মজীবন এবং আত্মবিশ্বাসকেও ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। যে মানুষটি একসময় নিয়মিত খবরের পেছনে ছুটেছেন, মানুষের কথা বলেছেন, সমাজের নানা সংকট তুলে ধরেছেন—একসময় হয়তো তাকেই নিজের কষ্টের কথা বলার মতো মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
আরেকটি বাস্তবতাও আমাদের ভাবতে হবে।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে চাকরি হারিয়েছিলেন পুলক দা। এরপরও তাঁর পুরোনো কর্মস্থলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। মাঝে মাঝে অফিসে এসে বসতেন, পত্রিকা পড়তেন। একটি চাবিও তাঁর কাছে ছিল। হয়তো সেই অফিসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু চাকরির ছিল না; সেখানে মিশে ছিল তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়, স্মৃতি, সহকর্মী, পরিচিত মুখ এবং নিজের একটি পরিচয়।
চাকরি চলে গেলে শুধু মাসের বেতনটাই হারায় না একজন মানুষ। অনেক সময় হারিয়ে যায় নিজের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতিটাও।
সাংবাদিকতার জগতে আমরা প্রতিদিন অন্যের গল্প লিখি। কারও কান্না, কারও সংগ্রাম, কারও বঞ্চনা, কারও সাফল্য—সবকিছুর খবর করি। কিন্তু যে সাংবাদিকটি এসব খবর সংগ্রহ করেন, তাঁর নিজের জীবন কেমন যাচ্ছে, তিনি কেমন আছেন, তাঁর শরীর কেমন, তাঁর মন কেমন—এই প্রশ্নটি আমরা কতবার করি?
পুলক দার চলে যাওয়া সেই প্রশ্নটাই আমাদের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
তাঁর চিঠিগুলোকে শুধু ‘শেষ চিঠি’ হিসেবে দেখলে হয়তো ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক দিকটি আমরা হারিয়ে ফেলব। এগুলো একজন অসুস্থ, বিপর্যস্ত মানুষের আর্তি হিসেবেও পড়া দরকার। একজন স্বামী তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ভাবছেন, একজন বাবা মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছেন, একজন ভাই ছোট ভাইকে পরিবারের দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছেন, একজন সহকর্মী আরেক সহকর্মীর কাছে ক্ষমা চাইছেন—এই প্রতিটি বাক্যের ভেতরে একজন মানুষের গভীর টানাপোড়েন লুকিয়ে আছে।
পুলক দা’র অভিমান তাই শুধু কারও ওপর অভিমান নয়।
এটি হয়তো জীবন, শরীর, পেশা, অসহায়ত্ব এবং সময়ের ওপর জমে থাকা এক দীর্ঘ অভিমান।
আমাদের সমাজে শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু দীর্ঘ অসুস্থতার সঙ্গে একজন মানুষ মানসিকভাবে কীভাবে লড়ছেন, সে প্রশ্নটি এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। চাকরি হারানো মানুষটির পাশে দাঁড়ানো, প্রবীণ বা অসুস্থ সহকর্মীর খোঁজ নেওয়া, একাকী হয়ে পড়া মানুষটির সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা—এসবকে আমরা প্রায়ই ‘বড় কোনো কাজ’ মনে করি না।
অথচ কখনো কখনো একটি ফোনই একজন মানুষের মনে করিয়ে দিতে পারে—
‘তুমি একা নও।’
পুলক দা আর আমাদের ফোন ধরবেন না। তাঁর সঙ্গে আর কোনো আড্ডা হবে না। কোনো খবর নিয়ে তর্ক হবে না। হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় তাঁর কথা মনে পড়বে, আর মনে হবে—আরেকটু আগে যদি কথা বলতাম! আরেকবার যদি জিজ্ঞেস করতাম, ‘দাদা, কেমন আছেন?’
এই ‘যদি’গুলোই হয়তো সবচেয়ে বড় কষ্ট।
তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত হবে, ময়নাতদন্ত হবে, প্রয়োজন হলে আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। সেসব অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তদন্তের পাশাপাশি আমাদের নিজেদের কাছেও একটি প্রশ্ন রাখা দরকার—আমরা কি আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর নীরব কষ্ট দেখতে শিখেছি?
পুলক দা’র জন্য এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তাঁর পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো। তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র কন্যার পাশে দাঁড়ানো। তাঁর অসমাপ্ত দায়িত্বগুলোকে মানবিকভাবে দেখা। আর তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা।
কারণ একজন সাংবাদিকের জীবনের মূল্য শুধু তাঁর লেখা সংবাদে নয়; তিনি যেসব মানুষের জীবনে ছুঁয়ে গেছেন, তাঁদের স্মৃতিতেও তাঁর অস্তিত্ব থেকে যায়।
পুলক দা, আপনার অভিমান আমরা হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি বুঝতে পারব না। আপনার কষ্টের গভীরতাও হয়তো জানতে পারব না। শুধু এটুকু বলতে পারি—আপনার চলে যাওয়ার খবর আমাদের জন্য নিছক একটি সংবাদ নয়। এটি একটি গভীর শূন্যতা, একটি অনুতাপ এবং আমাদের সমাজের প্রতি একটি কঠিন প্রশ্ন।
আপনি অন্যের কথা লিখেছেন সারাজীবন। শেষ পর্যন্ত আপনার নিজের গল্পটাই আমাদের লিখতে হলো—অশ্রুসিক্ত চোখে।
ভালো থাকুন, পুলক দা। আপনার স্মৃতির কাছে আমাদের এইটুকুই প্রার্থনা—মানুষ যেন মানুষের কষ্টকে একটু আগে চিনতে শেখে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট






















