মোদির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফের রং বদলাবেন জিনপিং?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৩৬:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
একসময় স্লোগান উঠত—‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’। বন্ধুত্বের সেই সুরের আড়ালেই ১৯৬২ সালে সীমান্তে শুরু হয়েছিল রক্তক্ষয়ী সংঘাত। জওহরলাল নেহরুর ‘পঞ্চশীল’ নীতিকে উপেক্ষা করে ভারতীয় চৌকিতে হামলা চালিয়েছিল চীনা বাহিনী। ভেঙে গিয়েছিল দুই দেশের বন্ধুত্বের সেই বহুল আলোচিত ‘সুতো’।
ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আবারও একই প্রশ্ন সামনে—ইতিহাস কি ফের ফিরে আসছে? নাকি বদলে গেছে ভারত-চীন সম্পর্কের সমীকরণ?
শনিবার ব্রিকস সম্মেলনের মঞ্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের করমর্দন তাই কেবল সৌজন্য বিনিময় নয়, বরং কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই হাত মেলানো কি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত, নাকি সাময়িক কৌশল?
ভারত-চীন সম্পর্কের ইতিহাস অবশ্য খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পরও বারবার উত্তপ্ত হয়েছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি)। ১৯৬৭ সালে সিকিমের নাথু লা ও চো লা-তে ফের সংঘর্ষে জড়ায় দুই দেশের সেনা। তবে সে সময় ভারতীয় বাহিনীর প্রতিরোধে পিছু হটতে বাধ্য হয় চীনা সেনারা।
এরপর সময় গড়িয়েছে, বদলেছে কূটনৈতিক ভাষা। কিন্তু সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ডোকলাম থেকে গালওয়ান—বারবার উত্তপ্ত সীমান্ত
২০১৭ সালে ডোকলামকে কেন্দ্র করে ভারত ও চীনের মধ্যে তৈরি হয় যুদ্ধের আবহ। টানা ৭৩ দিন দুই দেশের সেনা মুখোমুখি অবস্থান করেছিল। সীমান্তে উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনাও চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।
দুই বছর পর, ২০১৯ সালে তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে মোদি-জিনপিং বৈঠকে নতুন করে বন্ধুত্বের বার্তা দেখা যায়। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, সীমান্ত শান্তি ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয় দুই নেতার মধ্যে।
কিন্তু সেই উষ্ণতা বেশিদিন টেকেনি।

২০২০ সালে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই দেশের সেনা। লোহার রড ও কাঁটাতার জড়ানো অস্ত্র নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে সংঘর্ষ। নিহত হন ২০ জন ভারতীয় সেনা। ১৯৭৫ সালের পর সেটিই ছিল এলএসি-তে প্রথম প্রাণঘাতী সংঘর্ষ।
ফলে প্রশ্নটা থেকেই যায়—রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠক কিংবা করমর্দন কি সত্যিই সম্পর্কের বরফ গলাতে পারে?
এবার কি বদলেছে ভারতের অবস্থান?
অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে ভারত-চীনের টানাপোড়েন চলছে। অরুণাচলকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে বেজিং। বিপরীতে নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট—অরুণাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এই অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হবে না।
তবে এবারের পরিস্থিতি ১৯৬২ সালের মতো নয়। কৌশলগত দিক থেকে ভারত অনেক বেশি প্রস্তুত। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, নেহরুর সময়ের তুলনায় বর্তমান ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান অনেক শক্তিশালী।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একাধিকবার চীন সফর করা ডোভাল বেজিংয়ের কৌশল ও অবস্থান বুঝতে দিল্লিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকদের অনেকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন সমীকরণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির কারণে একাধিক দেশ নতুন করে নিজেদের কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে। এই বাস্তবতায় ভারত ও চীন—দুই দেশই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করার ঝুঁকি নিতে চাইবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ড. ইমনকল্যাণ লাহিড়ীর মতে, হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালীসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে মার্কিন প্রভাবের কারণে বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিকসের মঞ্চে ভারত-চীন বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকলে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প শক্তির জায়গা তৈরি হতে পারে।
‘স্ট্রিং অব পার্লস’ নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ
তবে বন্ধুত্বের সম্ভাবনার পাশাপাশি ভারতের উদ্বেগও কম নয়।
বছরের পর বছর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দর ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে চীন। পাকিস্তান থেকে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা—গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলোতে বেজিংয়ের উপস্থিতি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ। চীনের এই বিস্তৃত কৌশল ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ নামে পরিচিত।
ভারতের আশঙ্কা, এসব অবকাঠামো ভবিষ্যতে সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে চীন।
পালটা কৌশলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে নয়াদিল্লি। ভিয়েতনাম ও ফিলিপিন্সের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে। ফিলিপিন্সকে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার পাশাপাশি ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুংয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন মোদি।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ একই সঙ্গে সহযোগিতা ও চাপ তৈরির কৌশল।
তাহলে মোদি-জিনপিংয়ের করমর্দনের অর্থ কী?
সব মিলিয়ে ব্রিকসের মঞ্চে মোদি-জিনপিংয়ের হাত মেলানোকে শুধু সৌজন্যের ছবি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। সীমান্তে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, অরুণাচল নিয়ে বিরোধ, গালওয়ানের ক্ষত এবং ভারত মহাসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির মধ্যেই দুই নেতা ফের মুখোমুখি হয়েছেন।
তবে ইতিহাসের শিক্ষা দিল্লি নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি। বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো আর কৌশলগত আস্থা তৈরি—দুটি এক বিষয় নয়।
তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও থেকেই যাচ্ছে—মোদির সঙ্গে হাত মিলিয়ে কি সত্যিই বদলাচ্ছেন জিনপিং, নাকি কূটনীতির মঞ্চে ফের নতুন কোনো চালের অপেক্ষায় ‘ড্রাগন’?






















