ঢাকা ১২:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৬৬৬ কোটি টাকার রায়, ইউনূসের বিরুদ্ধে কি খুলল নতুন আইনি পথ? ১০ বছরে কুমিল্লা অঞ্চলে বন্ধ ১২ ট্রেন, রেল যোগাযোগে নীরব সংকট অসুস্থতা ও চিকিৎসার খরচের চাপ, শেষ চিঠিতে অসহায় পুলক চলতি বছরেই ৪১ লাখ পরিবার পাবে ফ্যামিলি কার্ড: প্রধানমন্ত্রী আলোচনাতেই সংঘাতের সমাধান, পুতিনকে মোদীর বার্তা চাকরির ফাঁদ থেকে হ্যাকিং—খুলশীর আটতলায় ৬৩ বিদেশির ‘সাইবার ঘাঁটি’ প্রেমের বিয়ে অস্বীকার, নবজাতক ফেলে পালানোর চেষ্টা আহত সেনা কর্মকর্তাকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী বর্ষার পানিতে গোসল করতে নেমে নিথর তিন শিশু, মুহূর্তেই থেমে গেল তিন পরিবারের হাসি হামের উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু, একদিনে আক্রান্ত ও উপসর্গ ১,১১১ জনের

১০ বছরে কুমিল্লা অঞ্চলে বন্ধ ১২ ট্রেন, রেল যোগাযোগে নীরব সংকট

কুমিল্লা প্রতিনিধি
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৪:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

একসময় কুমিল্লা অঞ্চলের স্টেশনগুলোতে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকত মানুষের দীর্ঘ সারি। স্বল্প আয়ের যাত্রীদের বড় ভরসা ছিল লোকাল ও কমিউটার ট্রেন। কম খরচে কর্মস্থলে যাওয়া-আসা থেকে শুরু করে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় চলাচল—সব ক্ষেত্রেই রেল ছিল তাদের সহজ ও নির্ভরযোগ্য বাহন। চলন্ত লোকাল ট্রেনে জায়গা না পেয়ে গাদাগাদি করে কিংবা দাঁড়িয়ে যাতায়াতের দৃশ্যও ছিল নিত্যদিনের।

কিন্তু সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণ দেখিয়ে একের পর এক ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুমিল্লা ও লাকসাম অঞ্চলের রেল যোগাযোগে তৈরি হয়েছে নীরব সংকট। গত ১০ বছরে এ অঞ্চলে প্রায় ১২টি ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে কুমিল্লা-চাঁদপুর, কুমিল্লা-নোয়াখালী, কুমিল্লা-চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুট রয়েছে।

ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষ। একসময় যেসব যাত্রী অল্প ভাড়ায় লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করতেন, এখন তাঁদের অনেককেই নির্ভর করতে হচ্ছে বাস, সিএনজি অটোরিকশাসহ ব্যয়বহুল সড়ক পরিবহনের ওপর। এতে বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়, ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তা।

বন্ধের তালিকা দীর্ঘ

স্থানীয় যাত্রী ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রেনের তালিকায় রয়েছে চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের চার জোড়া ডেমু ট্রেন, চাঁদপুর-ভৈরব লোকাল ১৬১/১৬২, নোয়াখালী-কুমিল্লা রুটের চার জোড়া ডেমু ট্রেন, নোয়াখালী-ঢাকা রুটের নোয়াখালী এক্সপ্রেস ১১/১২, সমতট এক্সপ্রেস ৪৫/৪৬, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটের নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ৩৭/৩৮, চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের জালালাবাদ এক্সপ্রেস ১৩/১৪ এবং চট্টগ্রাম-কুমিল্লা রুটের দুই জোড়া ডেমু ট্রেন।

বিশেষ করে কুমিল্লা-চাঁদপুর ও কুমিল্লা-নোয়াখালী রুটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বল্প দূরত্বের পথে রেলসেবার চাহিদা এখনও রয়েছে। রেলওয়ের প্রকাশিত নথিতেও এসব রুটের কমিউটার ট্রেনের সেবা ও সময়সূচির গুরুত্বের প্রতিফলন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নিয়মিত ট্রেন না থাকায় যাত্রীদের বাধ্য হয়ে সড়কপথে যেতে হচ্ছে।

ইঞ্জিন-কোচ সংকট কতদিন?

২০২৪ সালে কুমিল্লা অঞ্চলের রেল সংকট নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ট্রেন ও জনবল সংকটের কথা বলা হয়েছিল। তখন নতুন ইঞ্জিন আসার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও যদি গুরুত্বপূর্ণ রুটে ট্রেন ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে।

একটি ট্রেনের ইঞ্জিন বা কোচ নষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মেরামত কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়াও রেল কর্তৃপক্ষের নিয়মিত ব্যবস্থাপনার অংশ। কিন্তু কোনো রুটে দিনের পর দিন ট্রেন বন্ধ থাকলে সেটিকে শুধু যান্ত্রিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়। তখন সামনে আসে রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, জনবল ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং বিকল্প পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলোও।

লাকসাম জংশনের সিনিয়র স্টেশন মাস্টার ওমর ফারুক ভূঁইয়া বলেন, গত ১০ বছরে কুমিল্লা ও লাকসাম অঞ্চলে প্রায় ১২টি ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর প্রধান কারণ ইঞ্জিন ও কোচ প্রস্তুত না থাকা।

তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় রেলযাত্রী বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সক্ষমতা বাড়েনি। অতীতে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ থাকলেও ট্রেন চলেছে। এখন তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিমুক্ত রেলপথ তৈরি হলেও ট্রেন নেই। ফলে রেলপথের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার না করেই তা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়

লোকাল ট্রেন বন্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা গিয়ে পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। একজন দিনমজুর বা শ্রমিকের জন্য প্রতিদিনের যাতায়াতে কয়েক টাকা বাড়তি খরচও মাস শেষে বড় অঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। ট্রেনে যে পথ কম খরচে পাড়ি দেওয়া যেত, সেটিই এখন সড়কপথে যেতে গিয়ে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।

দিনমজুর আবদুল কাদের বলেন, আগে ট্রেনে কম খরচে যাতায়াত করতে পারতেন। এখন সড়কপথে বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে যানজট, অতিরিক্ত ভিড় ও যাত্রার অনিশ্চয়তা।

কুমিল্লা, লাকসাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামসহ আশপাশের এলাকার বহু কর্মজীবী মানুষ প্রতিদিন এক জেলা থেকে অন্য জেলা কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরমুখী হন। তাঁদের বড় একটি অংশের কাছে দ্রুত ও সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগ কোনো বিলাসিতা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন।

রেল বন্ধ, চাপ বাড়ছে সড়কে

একটি ট্রেন বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু রেলযাত্রীদের ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কয়েকশ কিংবা কয়েক হাজার যাত্রীকে একই সময়ে বিকল্প পরিবহনের দিকে ঠেলে দেওয়ায় বাড়ে সড়কপথের ওপর চাপও।

দৈনিক কুমিল্লার কাগজের সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয় বলেন, রেলের একটি ট্রেন বন্ধের প্রভাব পুরো পরিবহন ব্যবস্থায় পড়ে। কুমিল্লা ও লাকসামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রে রেল ও সড়কের সমন্বিত ব্যবহার জরুরি। রেলের সক্ষমতা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সড়কের ওপর চাপ বাড়ে। এতে যানজট, যাত্রার সময় ও মানুষের পরিবহন ব্যয়—সবই বাড়তে পারে।

কুমিল্লা অঞ্চলে একের পর এক ট্রেন বন্ধ হওয়ার ঘটনা তাই শুধু কয়েকটি রুটে ট্রেন না চলার বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে সাশ্রয়ী গণপরিবহন সংকুচিত হওয়া, নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় বাড়া এবং সড়কনির্ভরতা বাড়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রেলপথ ও অবকাঠামো থাকলেও যদি পর্যাপ্ত ইঞ্জিন-কোচের অভাবে ট্রেন না চলে, তাহলে সেই অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে কুমিল্লা অঞ্চলের রেল যোগাযোগকে সচল ও নির্ভরযোগ্য করতে হলে শুধু নতুন ট্রেনের ঘোষণা নয়, প্রয়োজন ইঞ্জিন-কোচের স্থায়ী সক্ষমতা, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ রুট পুনরায় চালুর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

১০ বছরে কুমিল্লা অঞ্চলে বন্ধ ১২ ট্রেন, রেল যোগাযোগে নীরব সংকট

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৪:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় কুমিল্লা অঞ্চলের স্টেশনগুলোতে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকত মানুষের দীর্ঘ সারি। স্বল্প আয়ের যাত্রীদের বড় ভরসা ছিল লোকাল ও কমিউটার ট্রেন। কম খরচে কর্মস্থলে যাওয়া-আসা থেকে শুরু করে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় চলাচল—সব ক্ষেত্রেই রেল ছিল তাদের সহজ ও নির্ভরযোগ্য বাহন। চলন্ত লোকাল ট্রেনে জায়গা না পেয়ে গাদাগাদি করে কিংবা দাঁড়িয়ে যাতায়াতের দৃশ্যও ছিল নিত্যদিনের।

কিন্তু সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণ দেখিয়ে একের পর এক ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কুমিল্লা ও লাকসাম অঞ্চলের রেল যোগাযোগে তৈরি হয়েছে নীরব সংকট। গত ১০ বছরে এ অঞ্চলে প্রায় ১২টি ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে কুমিল্লা-চাঁদপুর, কুমিল্লা-নোয়াখালী, কুমিল্লা-চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুট রয়েছে।

ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষ। একসময় যেসব যাত্রী অল্প ভাড়ায় লোকাল ট্রেনে প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াত করতেন, এখন তাঁদের অনেককেই নির্ভর করতে হচ্ছে বাস, সিএনজি অটোরিকশাসহ ব্যয়বহুল সড়ক পরিবহনের ওপর। এতে বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়, ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তা।

বন্ধের তালিকা দীর্ঘ

স্থানীয় যাত্রী ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রেনের তালিকায় রয়েছে চাঁদপুর-কুমিল্লা রুটের চার জোড়া ডেমু ট্রেন, চাঁদপুর-ভৈরব লোকাল ১৬১/১৬২, নোয়াখালী-কুমিল্লা রুটের চার জোড়া ডেমু ট্রেন, নোয়াখালী-ঢাকা রুটের নোয়াখালী এক্সপ্রেস ১১/১২, সমতট এক্সপ্রেস ৪৫/৪৬, চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটের নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ৩৭/৩৮, চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের জালালাবাদ এক্সপ্রেস ১৩/১৪ এবং চট্টগ্রাম-কুমিল্লা রুটের দুই জোড়া ডেমু ট্রেন।

বিশেষ করে কুমিল্লা-চাঁদপুর ও কুমিল্লা-নোয়াখালী রুটের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বল্প দূরত্বের পথে রেলসেবার চাহিদা এখনও রয়েছে। রেলওয়ের প্রকাশিত নথিতেও এসব রুটের কমিউটার ট্রেনের সেবা ও সময়সূচির গুরুত্বের প্রতিফলন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নিয়মিত ট্রেন না থাকায় যাত্রীদের বাধ্য হয়ে সড়কপথে যেতে হচ্ছে।

ইঞ্জিন-কোচ সংকট কতদিন?

২০২৪ সালে কুমিল্লা অঞ্চলের রেল সংকট নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ট্রেন ও জনবল সংকটের কথা বলা হয়েছিল। তখন নতুন ইঞ্জিন আসার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও যদি গুরুত্বপূর্ণ রুটে ট্রেন ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে রেলওয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে।

একটি ট্রেনের ইঞ্জিন বা কোচ নষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মেরামত কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়াও রেল কর্তৃপক্ষের নিয়মিত ব্যবস্থাপনার অংশ। কিন্তু কোনো রুটে দিনের পর দিন ট্রেন বন্ধ থাকলে সেটিকে শুধু যান্ত্রিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়। তখন সামনে আসে রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, জনবল ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং বিকল্প পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলোও।

লাকসাম জংশনের সিনিয়র স্টেশন মাস্টার ওমর ফারুক ভূঁইয়া বলেন, গত ১০ বছরে কুমিল্লা ও লাকসাম অঞ্চলে প্রায় ১২টি ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এর প্রধান কারণ ইঞ্জিন ও কোচ প্রস্তুত না থাকা।

তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় রেলযাত্রী বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে সক্ষমতা বাড়েনি। অতীতে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ থাকলেও ট্রেন চলেছে। এখন তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিমুক্ত রেলপথ তৈরি হলেও ট্রেন নেই। ফলে রেলপথের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার না করেই তা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়

লোকাল ট্রেন বন্ধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা গিয়ে পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। একজন দিনমজুর বা শ্রমিকের জন্য প্রতিদিনের যাতায়াতে কয়েক টাকা বাড়তি খরচও মাস শেষে বড় অঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়। ট্রেনে যে পথ কম খরচে পাড়ি দেওয়া যেত, সেটিই এখন সড়কপথে যেতে গিয়ে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।

দিনমজুর আবদুল কাদের বলেন, আগে ট্রেনে কম খরচে যাতায়াত করতে পারতেন। এখন সড়কপথে বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে যানজট, অতিরিক্ত ভিড় ও যাত্রার অনিশ্চয়তা।

কুমিল্লা, লাকসাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামসহ আশপাশের এলাকার বহু কর্মজীবী মানুষ প্রতিদিন এক জেলা থেকে অন্য জেলা কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরমুখী হন। তাঁদের বড় একটি অংশের কাছে দ্রুত ও সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগ কোনো বিলাসিতা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন।

রেল বন্ধ, চাপ বাড়ছে সড়কে

একটি ট্রেন বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু রেলযাত্রীদের ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কয়েকশ কিংবা কয়েক হাজার যাত্রীকে একই সময়ে বিকল্প পরিবহনের দিকে ঠেলে দেওয়ায় বাড়ে সড়কপথের ওপর চাপও।

দৈনিক কুমিল্লার কাগজের সম্পাদক আবুল কাশেম হৃদয় বলেন, রেলের একটি ট্রেন বন্ধের প্রভাব পুরো পরিবহন ব্যবস্থায় পড়ে। কুমিল্লা ও লাকসামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্রে রেল ও সড়কের সমন্বিত ব্যবহার জরুরি। রেলের সক্ষমতা কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই সড়কের ওপর চাপ বাড়ে। এতে যানজট, যাত্রার সময় ও মানুষের পরিবহন ব্যয়—সবই বাড়তে পারে।

কুমিল্লা অঞ্চলে একের পর এক ট্রেন বন্ধ হওয়ার ঘটনা তাই শুধু কয়েকটি রুটে ট্রেন না চলার বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে সাশ্রয়ী গণপরিবহন সংকুচিত হওয়া, নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয় বাড়া এবং সড়কনির্ভরতা বাড়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রেলপথ ও অবকাঠামো থাকলেও যদি পর্যাপ্ত ইঞ্জিন-কোচের অভাবে ট্রেন না চলে, তাহলে সেই অবকাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। দীর্ঘমেয়াদে কুমিল্লা অঞ্চলের রেল যোগাযোগকে সচল ও নির্ভরযোগ্য করতে হলে শুধু নতুন ট্রেনের ঘোষণা নয়, প্রয়োজন ইঞ্জিন-কোচের স্থায়ী সক্ষমতা, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ রুট পুনরায় চালুর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা।