৬৬৬ কোটি টাকার রায়, ইউনূসের বিরুদ্ধে কি খুলল নতুন আইনি পথ?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৫:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর পরিশোধ করতে হবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণকে। প্রতিষ্ঠানটির দায়ের করা রিটের রুল খারিজ করে বৃহস্পতিবার এনবিআরের দাবির পক্ষে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চের এ রায়ের ফলে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের আইনি পথ আরও স্পষ্ট হলো। তবে এই রায় অধ্যাপক ইউনূসের বিরুদ্ধে নতুন কোনো ফৌজদারি মামলা বা ‘সব অপকর্মের বিচার’ শুরুর সিদ্ধান্ত নয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদ জানিয়েছেন, এখন ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেসের মাধ্যমে ডিমান্ড নোটিশ জারি করে ওই অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। সাধারণত এ ধরনের নোটিশে অর্থ পরিশোধের জন্য ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করা হবে।
যে বিরোধের জেরে ৬৬৬ কোটি টাকা
এনবিআর ও গ্রামীণ কল্যাণের এই বিরোধের সূত্রপাত প্রায় এক দশক আগে। ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে পরবর্তী পাঁচ অর্থবছরের আয়কর বাবদ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করে এনবিআর।
এর বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট করে গ্রামীণ কল্যাণ।
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে হওয়া একটি আর্থিক চুক্তি। ২০০৪ সালে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গ্রামীণ কল্যাণ তার তহবিল থেকে গ্রামীণ টেলিকমকে প্রায় ৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা ঋণ দেয়।
পরবর্তী সময়ে ওই অর্থের বিপরীতে পাওয়া লভ্যাংশ গ্রামীণ কল্যাণের তহবিলে জমা হয়। এনবিআরের দাবি, এই অর্থ প্রতিষ্ঠানটির আয়করযোগ্য আয়। সেই ভিত্তিতেই কর দাবি করা হয়।
তবে গ্রামীণ কল্যাণের অবস্থান ছিল ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবীর দাবি, গ্রামীণফোন থেকে লভ্যাংশ দেওয়ার সময় উৎসেই ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখা হয়েছিল। ফলে একই অর্থের ওপর আবার অতিরিক্ত কর আরোপ করা নিয়ে প্রশ্ন তোলে প্রতিষ্ঠানটি।
এক মামলার রায়ে বদলেছে আইনি পরিস্থিতি
মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে হাইকোর্টে চলেছে। ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর এক পর্যায়ে হাইকোর্ট এনবিআরের কর কমিশনারের আদেশ বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন।
এরপর এনবিআর আপিল করলে বিষয়টি পুনরায় শুনানির জন্য আসে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গ্রামীণ কল্যাণের দুটি রিট খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।
এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলার গতিপথও বদলে যায়। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর গ্রামীণ কল্যাণের রিট খারিজ করে দেওয়া আগের রায় প্রত্যাহার করে নেয় হাইকোর্ট।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আগের রায় দেওয়া দ্বৈত বেঞ্চের একজন বিচারক একই মামলায় এর আগে সরকারপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পরে মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হলে নতুন বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। সেই শুনানির পর এবার এনবিআরের ৬৬৬ কোটি টাকার দাবির পক্ষে রায় এলো।
তাহলে ইউনূসের বিরুদ্ধে ‘নতুন পথ’ কোথায়?
এই রায়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ কল্যাণের ওপর। প্রতিষ্ঠানটিকে ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর দিতে হবে—হাইকোর্টের বর্তমান রায়ের মূল বিষয় এটিই।
তবে এর মাধ্যমে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে তার ‘সব অপকর্মের বিচার’ শুরু হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। এটি মূলত একটি করসংক্রান্ত দেওয়ানি আইনি বিরোধ। একইভাবে এই রায় থেকেই তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও বলা যাচ্ছে না।
তবে রায়ের ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা কর বিরোধে রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ কল্যাণ আপিল বিভাগে গেলে সেখানে রায়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।
গ্রামীণ কল্যাণের কার্যক্রম
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত সাতটি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গ্রামীণ কল্যাণ। ১৯৯৬ সালের ৬ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।
বর্তমানে সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় দেড়শ স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ও বৃত্তির ব্যবস্থাও করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
অধ্যাপক ইউনূস একসময় গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর তিনি আর প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত নেই বলে জানিয়েছেন গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী।
এখন মূল প্রশ্ন—৬৬৬ কোটি টাকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে গ্রামীণ কল্যাণ কতটা সফল হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিপুল অঙ্কের এই কর রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা পড়ে কি না।





















