ঢাকা ১২:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৬৬৬ কোটি টাকার রায়, ইউনূসের বিরুদ্ধে কি খুলল নতুন আইনি পথ? ১০ বছরে কুমিল্লা অঞ্চলে বন্ধ ১২ ট্রেন, রেল যোগাযোগে নীরব সংকট অসুস্থতা ও চিকিৎসার খরচের চাপ, শেষ চিঠিতে অসহায় পুলক চলতি বছরেই ৪১ লাখ পরিবার পাবে ফ্যামিলি কার্ড: প্রধানমন্ত্রী আলোচনাতেই সংঘাতের সমাধান, পুতিনকে মোদীর বার্তা চাকরির ফাঁদ থেকে হ্যাকিং—খুলশীর আটতলায় ৬৩ বিদেশির ‘সাইবার ঘাঁটি’ প্রেমের বিয়ে অস্বীকার, নবজাতক ফেলে পালানোর চেষ্টা আহত সেনা কর্মকর্তাকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী বর্ষার পানিতে গোসল করতে নেমে নিথর তিন শিশু, মুহূর্তেই থেমে গেল তিন পরিবারের হাসি হামের উপসর্গে আরও ৩ মৃত্যু, একদিনে আক্রান্ত ও উপসর্গ ১,১১১ জনের

অসুস্থতা ও চিকিৎসার খরচের চাপ, শেষ চিঠিতে অসহায় পুলক

বরিশাল ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৩:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বরিশালের সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির দিনগুলো কেমন কাটছিল, তা হয়তো খুব কাছের মানুষ ছাড়া কেউ জানতেন না। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, চিকিৎসার ব্যয় আর শারীরিক যন্ত্রণা—সব মিলিয়ে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবন। একসময় সেই অসহায়ত্বই তাঁকে ভয়াবহ এক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বরিশালে দৈনিক সমকালের ব্যুরো অফিস থেকে উদ্ধার করা হয় সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫১ বছর।

পুলিশ জানিয়েছে, পুলকের পকেট থেকে পাঁচটি চিরকুট পাওয়া গেছে। সেসব চিঠিতে উঠে এসেছে তাঁর মানসিক ও আর্থিক সংকটের কথা। চিকিৎসার ব্যয় চালিয়ে যাওয়া এবং অসুস্থতার যন্ত্রণা সহ্য করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে চিঠিগুলো থেকে জানা গেছে।

সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী জানান, চিরকুটগুলোর একটি পুলক তাঁর স্ত্রীকে লিখেছেন। অন্য চিঠিগুলোর মধ্যে ছিল বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, সুমন চৌধুরী ও নিজের ভাইকে লেখা চিঠি। আরেকটি চিঠি কার উদ্দেশে লেখা, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি সুমন।

সুমনকে লেখা চিঠিতে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন পুলক। তবে পেশাগত সম্পর্কের সেই অধ্যায় পুলকের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এক অদ্ভুত টানে জড়িয়ে ছিল।

প্রায় তিন বছর আগে সমকাল ছেড়েছিলেন পুলক। এরপরও সংবাদপত্রটির বরিশাল অফিসে তাঁর যাতায়াত বন্ধ হয়নি। অফিসে এসে পত্রিকা পড়তেন, সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। একসময় যে অফিসের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটিই যেন তাঁর পরিচিত আশ্রয় হয়ে ছিল।

ব্যুরো প্রধান থাকার সময় তাঁর কাছে থাকা অফিসের চাবিও পরে আর ফেরত নেওয়া হয়নি। তাঁর জুনিয়র সহকর্মী এবং পরবর্তীতে ব্যুরো প্রধান হওয়া সুমন চৌধুরীর কাছেই ছিল সেই বিশ্বাসের সম্পর্ক।

শুক্রবার সেই চাবি দিয়েই অফিসে ঢুকেছিলেন পুলক। এরপর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করেন। সন্ধ্যার দিকে অফিসে গিয়ে সুমন দরজা বন্ধ দেখতে পান। দীর্ঘ সময় নক করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে দরজা খুলে পুলকের মরদেহ উদ্ধার করে।

এরই মধ্যে বিকেলে পুলকের স্ত্রী প্রেসক্লাবের অফিস স্টাফ মানিকসহ কয়েকজন সাংবাদিককে ফোন করে তাঁর অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন। স্বজনদের উৎকণ্ঠা তখনও ছিল—কোথায় আছেন পুলক, কেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না? কিন্তু কেউ তাঁর খোঁজ দিতে পারেননি।

আরেকটি চিরকুটে বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনের কাছে একটি বিশেষ অনুরোধ করে গেছেন পুলক।

পুলকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সহকর্মী ও সাংবাদিকদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। যাঁরা বছরের পর বছর তাঁর সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, অফিসে বসে গল্প করেছেন, পেশাগত নানা কঠিন সময় পার করেছেন—তাঁদের কাছে পুলকের এভাবে চলে যাওয়া ছিল গভীর বেদনার।

পুলক চ্যাটার্জির সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ১৯৯৯ সালে। দৈনিক যুগান্তর প্রকাশের সময় বরিশাল ব্যুরো অফিসে জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর পর দৈনিক সমকাল প্রকাশিত হলে বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে সেখানে যোগ দেন। দীর্ঘ ১৮ বছরের বেশি সময় সমকালে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি তাঁকে সমকাল ছাড়তে হয়।

কর্মজীবনের ব্যস্ততা শেষ হলেও সংবাদপত্রের সেই অফিস, সহকর্মী আর পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিন্ন হয়নি। শেষ দিনেও সেই অফিসেই ছিলেন তিনি।

কিন্তু দীর্ঘ অসুস্থতা, চিকিৎসার ব্যয় আর জীবনের নানা চাপ কতটা ভারী হয়ে উঠেছিল, তাঁর রেখে যাওয়া চিরকুটগুলো যেন তারই নীরব সাক্ষ্য হয়ে রইল।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

অসুস্থতা ও চিকিৎসার খরচের চাপ, শেষ চিঠিতে অসহায় পুলক

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৩:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বরিশালের সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির দিনগুলো কেমন কাটছিল, তা হয়তো খুব কাছের মানুষ ছাড়া কেউ জানতেন না। দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, চিকিৎসার ব্যয় আর শারীরিক যন্ত্রণা—সব মিলিয়ে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবন। একসময় সেই অসহায়ত্বই তাঁকে ভয়াবহ এক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বরিশালে দৈনিক সমকালের ব্যুরো অফিস থেকে উদ্ধার করা হয় সাবেক ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির মরদেহ। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫১ বছর।

পুলিশ জানিয়েছে, পুলকের পকেট থেকে পাঁচটি চিরকুট পাওয়া গেছে। সেসব চিঠিতে উঠে এসেছে তাঁর মানসিক ও আর্থিক সংকটের কথা। চিকিৎসার ব্যয় চালিয়ে যাওয়া এবং অসুস্থতার যন্ত্রণা সহ্য করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে চিঠিগুলো থেকে জানা গেছে।

সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান সুমন চৌধুরী জানান, চিরকুটগুলোর একটি পুলক তাঁর স্ত্রীকে লিখেছেন। অন্য চিঠিগুলোর মধ্যে ছিল বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেন, সুমন চৌধুরী ও নিজের ভাইকে লেখা চিঠি। আরেকটি চিঠি কার উদ্দেশে লেখা, তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি সুমন।

সুমনকে লেখা চিঠিতে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন পুলক। তবে পেশাগত সম্পর্কের সেই অধ্যায় পুলকের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এক অদ্ভুত টানে জড়িয়ে ছিল।

প্রায় তিন বছর আগে সমকাল ছেড়েছিলেন পুলক। এরপরও সংবাদপত্রটির বরিশাল অফিসে তাঁর যাতায়াত বন্ধ হয়নি। অফিসে এসে পত্রিকা পড়তেন, সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। একসময় যে অফিসের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটিই যেন তাঁর পরিচিত আশ্রয় হয়ে ছিল।

ব্যুরো প্রধান থাকার সময় তাঁর কাছে থাকা অফিসের চাবিও পরে আর ফেরত নেওয়া হয়নি। তাঁর জুনিয়র সহকর্মী এবং পরবর্তীতে ব্যুরো প্রধান হওয়া সুমন চৌধুরীর কাছেই ছিল সেই বিশ্বাসের সম্পর্ক।

শুক্রবার সেই চাবি দিয়েই অফিসে ঢুকেছিলেন পুলক। এরপর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করেন। সন্ধ্যার দিকে অফিসে গিয়ে সুমন দরজা বন্ধ দেখতে পান। দীর্ঘ সময় নক করেও কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে দরজা খুলে পুলকের মরদেহ উদ্ধার করে।

এরই মধ্যে বিকেলে পুলকের স্ত্রী প্রেসক্লাবের অফিস স্টাফ মানিকসহ কয়েকজন সাংবাদিককে ফোন করে তাঁর অবস্থান জানতে চেয়েছিলেন। স্বজনদের উৎকণ্ঠা তখনও ছিল—কোথায় আছেন পুলক, কেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না? কিন্তু কেউ তাঁর খোঁজ দিতে পারেননি।

আরেকটি চিরকুটে বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনের কাছে একটি বিশেষ অনুরোধ করে গেছেন পুলক।

পুলকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সহকর্মী ও সাংবাদিকদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। যাঁরা বছরের পর বছর তাঁর সঙ্গে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, অফিসে বসে গল্প করেছেন, পেশাগত নানা কঠিন সময় পার করেছেন—তাঁদের কাছে পুলকের এভাবে চলে যাওয়া ছিল গভীর বেদনার।

পুলক চ্যাটার্জির সাংবাদিকতা জীবনের শুরু ১৯৯৯ সালে। দৈনিক যুগান্তর প্রকাশের সময় বরিশাল ব্যুরো অফিসে জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে যোগ দেন তিনি। প্রায় পাঁচ বছর পর দৈনিক সমকাল প্রকাশিত হলে বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে সেখানে যোগ দেন। দীর্ঘ ১৮ বছরের বেশি সময় সমকালে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি তাঁকে সমকাল ছাড়তে হয়।

কর্মজীবনের ব্যস্ততা শেষ হলেও সংবাদপত্রের সেই অফিস, সহকর্মী আর পরিচিত পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিন্ন হয়নি। শেষ দিনেও সেই অফিসেই ছিলেন তিনি।

কিন্তু দীর্ঘ অসুস্থতা, চিকিৎসার ব্যয় আর জীবনের নানা চাপ কতটা ভারী হয়ে উঠেছিল, তাঁর রেখে যাওয়া চিরকুটগুলো যেন তারই নীরব সাক্ষ্য হয়ে রইল।