ঢাকা ০৯:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বেসরকারি জ্বালানি তেল আমদানিতে বিশেষ সুবিধার অভিযোগ ভিত্তিহীন: জ্বালানি বিভাগ শেখ হাসিনা চাইলেই কি দেশে ফিরতে পারবেন? বসুন্ধরায় অ্যামেচার মার্শাল আর্টের জমজমাট আসর ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সম্ভব নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব বাধা পেরিয়ে বাস্তবতার নিরিখে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী নীরবে এতিম শিশুদের পাশে সায়েম সোবহান আনভীর সেবার মানসিকতা ছাড়া চিকিৎসাব্যবস্থার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়: প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে সক্রিয় চক্র: প্রধানমন্ত্রী তনু হত্যা মামলায় সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর রহমানকে পুনরায় গ্রেপ্তার হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন

শেখ হাসিনা চাইলেই কি দেশে ফিরতে পারবেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৩৬:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ভারতের নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের পর আবারও আলোচনায় এসেছে তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি। তিনি আদৌ ফিরবেন কি না, ফিরলে কখন এবং কীভাবে ফিরবেন—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময় দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তবে এবারই প্রথম কোনো সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই তিনি দেশে ফিরতে চান।

অন্যদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বর্তমান সরকার ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দিল্লির কাছে এ বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে ভারত এখন পর্যন্ত তাঁকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেয়নি।

আইনে কি দেশে ফেরার বাধা আছে?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা চাইলে নিজে থেকে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। তবে দেশে ফেরার পর তাঁকে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি সই হয়। ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধনের পর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে নির্দিষ্ট শর্তে তাঁকে ফেরত পাঠাতে দুই দেশ পরস্পরকে সহযোগিতা করবে।

চুক্তিতে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন, শাস্তির মাত্রা এবং প্রত্যাখ্যানের কারণগুলোও নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণভাবে যে অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি কমপক্ষে এক বছর কারাদণ্ড, সেসব অভিযোগ প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।

তবে কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক প্রকৃতির হলে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। যদিও হত্যা, গুম, বোমা বিস্ফোরণ, সন্ত্রাসবাদসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বাইরে রাখা হয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম ও নির্যাতনসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ফলে এসব অভিযোগকে কেবল রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখিয়ে প্রত্যর্পণ ঠেকানো কতটা সম্ভব, সেটি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

২০১৬ সালের সংশোধনের পর প্রত্যর্পণের আবেদন করতে মামলার বিস্তারিত সাক্ষ্য-প্রমাণের পরিবর্তে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপিও পাঠানো যায়। ফলে কোনো মামলায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে তাঁকে ফেরত চাওয়ার সুযোগ পায়।

চুক্তিতে অস্থায়ী গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি পালিয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা থাকলে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তাঁকে সাময়িকভাবে গ্রেপ্তারের অনুরোধ করা যায়।

তবে ভারত যদি মনে করে, অভিযোগগুলো সরল বিশ্বাসে বা ন্যায়বিচারের স্বার্থে করা হয়নি, সে ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ক্ষেত্রে এই বিধানটিকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেক আইন বিশেষজ্ঞ।

দেশে ফিরলে কী হবে?

শেখ হাসিনা বর্তমানে বিভিন্ন মামলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় দণ্ডিত। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আরও মামলা রয়েছে। ফলে তিনি দেশে ফিরলে স্বাভাবিকভাবেই এসব মামলার আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, পলাতক আসামি হিসেবে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে কারাগারে যেতে হবে এবং এরপর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

অন্যদিকে আইনজীবীদের কেউ কেউ মনে করছেন, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্যমান গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে দেশে প্রবেশের পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

বিষয়টি কি আসলে আইনি, নাকি রাজনৈতিক?

বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নটি কেবল আইনি বিষয় নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে রাজনীতি ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক।

শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বললেও কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া জানাননি। ফলে তাঁর বক্তব্যকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং দলটির নেতাকর্মীদের ওপর নানা চাপের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সামিয়া জামানের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি পুরোপুরি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। কারণ তিনি বর্তমানে যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত।

তাঁর মতে, নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা না করে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলা রাজনৈতিকভাবে একটি বার্তা দেওয়ার কৌশলও হতে পারে।

ভারতের অবস্থানই বড় প্রশ্ন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো ভারতের অবস্থান কী হবে।

সাম্প্রতিক দিল্লির সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বলছে, ভারতের মাটিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দিল্লির ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যকে ভারত সরকার সমর্থন করে না।

তবে ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা কতটা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন এবং এ বিষয়ে দিল্লির অবস্থান কী হবে।

ফলে আইনগতভাবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ একেবারে বন্ধ নয়। কিন্তু তিনি বাস্তবে ফিরবেন কি না, ফিরলে কীভাবে ফিরবেন এবং ভারত তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক সমীকরণের ওপর।

অর্থাৎ, শেখ হাসিনা চাইলে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; কিন্তু দেশে ফিরে তাঁর রাজনৈতিক ও আইনি পরিণতি কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

শেখ হাসিনা চাইলেই কি দেশে ফিরতে পারবেন?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:৩৬:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

ভারতের নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনের পর আবারও আলোচনায় এসেছে তাঁর দেশে ফেরার বিষয়টি। তিনি আদৌ ফিরবেন কি না, ফিরলে কখন এবং কীভাবে ফিরবেন—এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গত দুই বছরে বিভিন্ন সময় দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তবে এবারই প্রথম কোনো সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই তিনি দেশে ফিরতে চান।

অন্যদিকে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বর্তমান সরকার ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও দিল্লির কাছে এ বিষয়ে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে ভারত এখন পর্যন্ত তাঁকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেয়নি।

আইনে কি দেশে ফেরার বাধা আছে?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা চাইলে নিজে থেকে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। তবে দেশে ফেরার পর তাঁকে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে প্রত্যর্পণ চুক্তি সই হয়। ২০১৬ সালে চুক্তিটি সংশোধনের পর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এক দেশে অপরাধ করে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে নির্দিষ্ট শর্তে তাঁকে ফেরত পাঠাতে দুই দেশ পরস্পরকে সহযোগিতা করবে।

চুক্তিতে প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন, শাস্তির মাত্রা এবং প্রত্যাখ্যানের কারণগুলোও নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণভাবে যে অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি কমপক্ষে এক বছর কারাদণ্ড, সেসব অভিযোগ প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।

তবে কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক প্রকৃতির হলে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যানের সুযোগ রয়েছে। যদিও হত্যা, গুম, বোমা বিস্ফোরণ, সন্ত্রাসবাদসহ বেশ কিছু গুরুতর অপরাধকে চুক্তিতে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনার বাইরে রাখা হয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম ও নির্যাতনসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ফলে এসব অভিযোগকে কেবল রাজনৈতিক মামলা হিসেবে দেখিয়ে প্রত্যর্পণ ঠেকানো কতটা সম্ভব, সেটি নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

২০১৬ সালের সংশোধনের পর প্রত্যর্পণের আবেদন করতে মামলার বিস্তারিত সাক্ষ্য-প্রমাণের পরিবর্তে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কপিও পাঠানো যায়। ফলে কোনো মামলায় আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে তাঁকে ফেরত চাওয়ার সুযোগ পায়।

চুক্তিতে অস্থায়ী গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও রয়েছে। কোনো ব্যক্তি পালিয়ে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা থাকলে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তাঁকে সাময়িকভাবে গ্রেপ্তারের অনুরোধ করা যায়।

তবে ভারত যদি মনে করে, অভিযোগগুলো সরল বিশ্বাসে বা ন্যায়বিচারের স্বার্থে করা হয়নি, সে ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণের আবেদন প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ক্ষেত্রে এই বিধানটিকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেক আইন বিশেষজ্ঞ।

দেশে ফিরলে কী হবে?

শেখ হাসিনা বর্তমানে বিভিন্ন মামলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় দণ্ডিত। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আরও মামলা রয়েছে। ফলে তিনি দেশে ফিরলে স্বাভাবিকভাবেই এসব মামলার আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, পলাতক আসামি হিসেবে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে কারাগারে যেতে হবে এবং এরপর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

অন্যদিকে আইনজীবীদের কেউ কেউ মনে করছেন, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্যমান গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে দেশে প্রবেশের পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

বিষয়টি কি আসলে আইনি, নাকি রাজনৈতিক?

বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নটি কেবল আইনি বিষয় নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে রাজনীতি ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক।

শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বললেও কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া জানাননি। ফলে তাঁর বক্তব্যকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং দলটির নেতাকর্মীদের ওপর নানা চাপের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সামিয়া জামানের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি পুরোপুরি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। কারণ তিনি বর্তমানে যে দেশে অবস্থান করছেন, সেই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত।

তাঁর মতে, নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা না করে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলা রাজনৈতিকভাবে একটি বার্তা দেওয়ার কৌশলও হতে পারে।

ভারতের অবস্থানই বড় প্রশ্ন

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো ভারতের অবস্থান কী হবে।

সাম্প্রতিক দিল্লির সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বলছে, ভারতের মাটিতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দিল্লির ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যকে ভারত সরকার সমর্থন করে না।

তবে ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনা কতটা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন এবং এ বিষয়ে দিল্লির অবস্থান কী হবে।

ফলে আইনগতভাবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ একেবারে বন্ধ নয়। কিন্তু তিনি বাস্তবে ফিরবেন কি না, ফিরলে কীভাবে ফিরবেন এবং ভারত তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক সমীকরণের ওপর।

অর্থাৎ, শেখ হাসিনা চাইলে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; কিন্তু দেশে ফিরে তাঁর রাজনৈতিক ও আইনি পরিণতি কী হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।