ঢাকা ১১:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রস্তুতি শেষ, আস্থার পরীক্ষা বাকি

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১১:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা—‘সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন’—রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক বার্তা বহন করছে। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের বক্তব্য কেবল প্রশাসনিক প্রস্তুতির দাবি নয়; এটি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণে আছে—এমন আস্থার বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টাও বটে। তবে এই ঘোষণার ভেতরে বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ—সবই সমান্তরালভাবে উপস্থিত।

একদিকে ব্যালট পেপার ছাপানো ও পাঠানো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ মোতায়েন, বিপুলসংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্ব বণ্টন—এসবই নির্বাচন পরিচালনায় কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরিচায়ক। বিশেষ করে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য এবং ৮ লাখের কাছাকাছি নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি স্পষ্টতই একটি ‘নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক নির্বাচন’ মডেলের ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, ব্যালট পেপার পুনর্মুদ্রণ ও শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার কারণে বিলম্ব—ইসির প্রস্তুতির দাবিতে কিছুটা হলেও ফাঁক তৈরি করছে। যদিও কমিশন বলছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব ব্যালট পৌঁছানো সম্ভব হবে, তবুও এই বিলম্ব বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সন্দেহ ও অভিযোগকে উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে এমন এক নির্বাচনে, যেখানে ফল ঘোষণা বিলম্ব নিয়েই বিতর্ক চলছে, সেখানে যেকোনো প্রশাসনিক দেরি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে।

ভোটার উপস্থিতি নিয়ে কমিশনারের ৫৫ শতাংশের আশাবাদী অনুমানও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এবার বিএনপিসহ বড় দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ভোটের প্রতিযোগিতা বাড়ালেও, ভোটারদের আস্থা কতটা ফিরেছে—তা নির্ভর করবে মূলত ভোটের দিন পরিবেশ ও ফল ঘোষণার স্বচ্ছতার ওপর।

পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও দুই হাজারের বেশি প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি, যা নির্বাচনকে একতরফা নয়—এমন বার্তা দেয়। তবে একাধিক আসনে কম প্রার্থী থাকা, কোথাও মাত্র দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বী—এসব বিষয় প্রতিযোগিতার সমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

পর্যবেক্ষক সংখ্যা ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি কমিশনের আরেকটি কৌশলগত দিক। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা স্পষ্ট। তবে পর্যবেক্ষকদের কার্যকর ভূমিকা নির্ভর করবে তারা কতটা অবাধে কাজ করতে পারবেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণ কতটা প্রতিফলিত হবে নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায়।

সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের ‘সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন’ ঘোষণা একটি আত্মবিশ্বাসী প্রশাসনিক অবস্থান নির্দেশ করে। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের সত্যতা যাচাই হবে ভোটের দিন—ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি, নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ, সময়মতো ফল ঘোষণা এবং পরাজিত পক্ষের প্রতিক্রিয়ায়। নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি শুধু একটি ভোট আয়োজন নয়, বরং আস্থা পুনর্গঠনের একটি বড় পরীক্ষা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

প্রস্তুতি শেষ, আস্থার পরীক্ষা বাকি

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:১১:৫৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা—‘সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন’—রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এক বার্তা বহন করছে। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের বক্তব্য কেবল প্রশাসনিক প্রস্তুতির দাবি নয়; এটি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও নিয়ন্ত্রণে আছে—এমন আস্থার বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টাও বটে। তবে এই ঘোষণার ভেতরে বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ—সবই সমান্তরালভাবে উপস্থিত।

একদিকে ব্যালট পেপার ছাপানো ও পাঠানো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ মোতায়েন, বিপুলসংখ্যক ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্ব বণ্টন—এসবই নির্বাচন পরিচালনায় কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পরিচায়ক। বিশেষ করে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য এবং ৮ লাখের কাছাকাছি নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি স্পষ্টতই একটি ‘নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক নির্বাচন’ মডেলের ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, ব্যালট পেপার পুনর্মুদ্রণ ও শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার কারণে বিলম্ব—ইসির প্রস্তুতির দাবিতে কিছুটা হলেও ফাঁক তৈরি করছে। যদিও কমিশন বলছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব ব্যালট পৌঁছানো সম্ভব হবে, তবুও এই বিলম্ব বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সন্দেহ ও অভিযোগকে উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে এমন এক নির্বাচনে, যেখানে ফল ঘোষণা বিলম্ব নিয়েই বিতর্ক চলছে, সেখানে যেকোনো প্রশাসনিক দেরি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করে।

ভোটার উপস্থিতি নিয়ে কমিশনারের ৫৫ শতাংশের আশাবাদী অনুমানও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এবার বিএনপিসহ বড় দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ভোটের প্রতিযোগিতা বাড়ালেও, ভোটারদের আস্থা কতটা ফিরেছে—তা নির্ভর করবে মূলত ভোটের দিন পরিবেশ ও ফল ঘোষণার স্বচ্ছতার ওপর।

পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও দুই হাজারের বেশি প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি, যা নির্বাচনকে একতরফা নয়—এমন বার্তা দেয়। তবে একাধিক আসনে কম প্রার্থী থাকা, কোথাও মাত্র দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বী—এসব বিষয় প্রতিযোগিতার সমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

পর্যবেক্ষক সংখ্যা ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি কমিশনের আরেকটি কৌশলগত দিক। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা স্পষ্ট। তবে পর্যবেক্ষকদের কার্যকর ভূমিকা নির্ভর করবে তারা কতটা অবাধে কাজ করতে পারবেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণ কতটা প্রতিফলিত হবে নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায়।

সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের ‘সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন’ ঘোষণা একটি আত্মবিশ্বাসী প্রশাসনিক অবস্থান নির্দেশ করে। কিন্তু এই আত্মবিশ্বাসের সত্যতা যাচাই হবে ভোটের দিন—ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি, নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ, সময়মতো ফল ঘোষণা এবং পরাজিত পক্ষের প্রতিক্রিয়ায়। নির্বাচন কমিশনের জন্য এটি শুধু একটি ভোট আয়োজন নয়, বরং আস্থা পুনর্গঠনের একটি বড় পরীক্ষা।