ঢাকা ১২:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘ফ্যামিলি কার্ড’: কারা পাবেন, কারা পাবেন না

দেবব্রত দত্ত
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫০:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৮৪ বার পড়া হয়েছে

ছবি : এআই দ্বারা নির্মিত

বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে দেশের কয়েকটি এলাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা

প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫০ লাখ স্বল্পআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এতে এক অর্থবছরে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১২ হাজার ৭২ কোটি টাকা (ক্যাশ-আউট চার্জসহ)।

তবে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্বৈততা এড়ানো গেলে প্রায় ৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব করছে সরকার। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৬ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা।

কারা পাবেন অগ্রাধিকার?

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফ্যামিলি কার্ড পেতে জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক হবে এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদের সুপারিশ প্রয়োজন হবে। অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন—গ্রামীণ দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবার, কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুর, উপার্জনে অক্ষম সদস্যবিশিষ্ট পরিবার, নারীপ্রধান, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা স্বামী পরিত্যক্তা পরিবার, ১৫–১৮ বছর বয়সী অবিবাহিত মেয়ের পরিবার। প্রত্যাগত অভিবাসী, বিশেষ করে নারী অভিবাসীর পরিবার, প্রতিবন্ধী বা অটিজম আক্রান্ত সদস্য থাকা পরিবার।

যেসব পরিবারের ঘরের দেয়াল মাটি, পাটকাঠি বা বাঁশের তৈরি এবং যাদের বসতভিটা ছাড়া কৃষিযোগ্য জমি নেই, তারাও অগ্রাধিকার পাবেন।

একই পরিবারের একাধিক সদস্য তালিকাভুক্ত হতে পারবেন না। পাশাপাশি যেসব পরিবার আগে থেকেই নির্দিষ্ট ভাতা পাচ্ছেন এবং সমন্বয়ের আওতায় আসবেন না, তারা এই কার্ডের সুবিধা পাবেন না।

বিদ্যমান কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়

বর্তমানে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর আওতায় প্রায় ৬৫ লাখ পরিবার ভর্তুকিমূল্যে পণ্য পাচ্ছে। এছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভালনারেবল ওম্যান ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির উপকারভোগীদের তথ্যও নতুন ব্যবস্থায় একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি হিসাবে, ভালনারেবল ওম্যান কর্মসূচির ১০ লাখ ৪০ হাজার উপকারভোগী যুক্ত হলে প্রায় ২ হাজার ২২৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

বয়স্ক, বিধবা ও মা-শিশু সহায়তা কর্মসূচির পল্লী অঞ্চলের ২৫ লাখ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করলে প্রায় ২ হাজার ১২১ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১৪ লাখ ৬ হাজার পরিবার যুক্ত হলে আরও প্রায় ১ হাজার ২০৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

সব মিলিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা ব্যয় কমানো সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর বিতরণ ব্যবস্থা

অর্থবিভাগের সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) ব্যবহার করে পাইলটিং করার প্রস্তাব রয়েছে। ‘সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’-এ ইতোমধ্যে ৪ কোটির বেশি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষিত আছে, যা দিয়ে এনআইডি, মোবাইল বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দ্বৈততা যাচাই করা যাবে।

জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, টিআইএন, সরকারি কর্মচারী ও পেনশনার ডাটাবেজসহ বিভিন্ন ডাটাবেজের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। বিকাশ, রকেট ও নগদসহ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি জিটুপি (গভর্নমেন্ট টু পাবলিক) পদ্ধতিতে অর্থ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

৮ উপজেলায় পাইলটিং

প্রাথমিক প্রস্তাবে ৮টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প চালুর কথা বলা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সাত দিনের মধ্যে প্রাথমিক যাচাই, ৭–১০ দিনের মধ্যে নীতিমালা অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ, এরপর চার দিনের মধ্যে পে-রোল প্রস্তুত করে ভাতা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান এনআইডি-সংযুক্ত ডাটাবেজ ব্যবহার করা গেলে ঈদের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে কার্ড বিতরণ সম্ভব।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে বিশাল ব্যয় ও উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

‘ফ্যামিলি কার্ড’: কারা পাবেন, কারা পাবেন না

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৫০:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে দেশের কয়েকটি এলাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা

প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫০ লাখ স্বল্পআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা করে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এতে এক অর্থবছরে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১২ হাজার ৭২ কোটি টাকা (ক্যাশ-আউট চার্জসহ)।

তবে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্বৈততা এড়ানো গেলে প্রায় ৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব করছে সরকার। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৬ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা।

কারা পাবেন অগ্রাধিকার?

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফ্যামিলি কার্ড পেতে জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক হবে এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদের সুপারিশ প্রয়োজন হবে। অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন—গ্রামীণ দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবার, কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুর, উপার্জনে অক্ষম সদস্যবিশিষ্ট পরিবার, নারীপ্রধান, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা স্বামী পরিত্যক্তা পরিবার, ১৫–১৮ বছর বয়সী অবিবাহিত মেয়ের পরিবার। প্রত্যাগত অভিবাসী, বিশেষ করে নারী অভিবাসীর পরিবার, প্রতিবন্ধী বা অটিজম আক্রান্ত সদস্য থাকা পরিবার।

যেসব পরিবারের ঘরের দেয়াল মাটি, পাটকাঠি বা বাঁশের তৈরি এবং যাদের বসতভিটা ছাড়া কৃষিযোগ্য জমি নেই, তারাও অগ্রাধিকার পাবেন।

একই পরিবারের একাধিক সদস্য তালিকাভুক্ত হতে পারবেন না। পাশাপাশি যেসব পরিবার আগে থেকেই নির্দিষ্ট ভাতা পাচ্ছেন এবং সমন্বয়ের আওতায় আসবেন না, তারা এই কার্ডের সুবিধা পাবেন না।

বিদ্যমান কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়

বর্তমানে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর আওতায় প্রায় ৬৫ লাখ পরিবার ভর্তুকিমূল্যে পণ্য পাচ্ছে। এছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভালনারেবল ওম্যান ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির উপকারভোগীদের তথ্যও নতুন ব্যবস্থায় একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি হিসাবে, ভালনারেবল ওম্যান কর্মসূচির ১০ লাখ ৪০ হাজার উপকারভোগী যুক্ত হলে প্রায় ২ হাজার ২২৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

বয়স্ক, বিধবা ও মা-শিশু সহায়তা কর্মসূচির পল্লী অঞ্চলের ২৫ লাখ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করলে প্রায় ২ হাজার ১২১ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১৪ লাখ ৬ হাজার পরিবার যুক্ত হলে আরও প্রায় ১ হাজার ২০৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

সব মিলিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা ব্যয় কমানো সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর বিতরণ ব্যবস্থা

অর্থবিভাগের সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) ব্যবহার করে পাইলটিং করার প্রস্তাব রয়েছে। ‘সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’-এ ইতোমধ্যে ৪ কোটির বেশি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষিত আছে, যা দিয়ে এনআইডি, মোবাইল বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দ্বৈততা যাচাই করা যাবে।

জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, টিআইএন, সরকারি কর্মচারী ও পেনশনার ডাটাবেজসহ বিভিন্ন ডাটাবেজের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। বিকাশ, রকেট ও নগদসহ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি জিটুপি (গভর্নমেন্ট টু পাবলিক) পদ্ধতিতে অর্থ পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

৮ উপজেলায় পাইলটিং

প্রাথমিক প্রস্তাবে ৮টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প চালুর কথা বলা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সাত দিনের মধ্যে প্রাথমিক যাচাই, ৭–১০ দিনের মধ্যে নীতিমালা অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দ, এরপর চার দিনের মধ্যে পে-রোল প্রস্তুত করে ভাতা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান এনআইডি-সংযুক্ত ডাটাবেজ ব্যবহার করা গেলে ঈদের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে কার্ড বিতরণ সম্ভব।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে বিশাল ব্যয় ও উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।