ঢাকা ১১:১৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শেষ শ্রদ্ধা থেকে ভয়াবহ পরিণতি: মৃত স্বজন ভক্ষণের করুণ গল্প

বাংলা টাইমস ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫০:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মানবসভ্যতা যতই আধুনিক হোক, পৃথিবীর কিছু প্রান্তে এখনও টিকে আছে আদিম ও বিস্ময়কর কিছু রীতি। নরখাদক প্রথা তারই এক ভয়ংকর উদাহরণ। তেমনই এক রীতি পালনের ফলে ধ্বংসের মুখে পড়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনির ফোর জনজাতি।

পাপুয়া নিউগিনির পূর্বাঞ্চলের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ফোর সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু বছর ধরে প্রচলিত ছিল ‘এন্ডোক্যানিবালিজম’—নিজেদের মৃত স্বজনদের ভক্ষণ করার রীতি। তাদের বিশ্বাস ছিল, মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে পোকামাকড়ের খাদ্য বানানোর চেয়ে প্রিয় মানুষের শরীরে মিশে যাওয়া অনেক বেশি সম্মানের। এই রীতিকে তারা শোক, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে দেখত।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় নারী-পুরুষ-শিশু—সকলেই এই ভোজে অংশ নিত। পুরুষরা মৃত স্বজনের মাংস ভক্ষণ করত, আর নারী ও শিশুরা খেত মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের অংশ। বিশেষ করে নারীরাই মস্তিষ্ক রান্নার দায়িত্ব নিতেন। ফার্নের পাতা ও বাঁশের নলের ভেতরে মস্তিষ্ক সেদ্ধ করে তা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। শিশুদের ক্ষেত্রেও মায়েদের হাত থেকেই এই খাবার পৌঁছে যেত।

ফোরদের বিশ্বাস ছিল, মৃত মানুষের আত্মার বিপজ্জনক শক্তি ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নারীদের শরীরের রয়েছে। নৃবিজ্ঞানী শার্লি লিন্ডেনবাউমের মতে, এই বিশ্বাস থেকেই নারীরা মৃতদেহ গ্রহণের প্রধান দায়িত্ব পালন করতেন।

কিন্তু এই ‘শ্রদ্ধার রীতি’ই একসময় হয়ে ওঠে ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফোর সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক অজানা রোগ—কুরু। স্থানীয় ভাষায় ‘কুরু’ অর্থ কাঁপুনি। আক্রান্ত ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে হাত-পায়ের নিয়ন্ত্রণ হারাতেন, হাঁটতে পারতেন না, কথা ও খাওয়ার ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যেত। অদ্ভুতভাবে অনেকের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত হাসির প্রবণতাও দেখা দিত।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল, এই রোগে প্রধানত আক্রান্ত হচ্ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও শিশুরা। একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, কিছু গ্রামে কার্যত কোনো যুবতী নারী অবশিষ্ট ছিল না। ১৯৫০-এর দশকে কুরু মহামারি ফোর জনজাতিকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দেয়।

প্রথমদিকে গবেষকেরা রোগটির কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। স্থানীয়রা একে আত্মার অভিশাপ বা জাদুবিদ্যার ফল বলে মনে করত। কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, এটি জিনগত কোনো সমস্যা। পরে আত্মীয়-ভক্ষণের প্রথা প্রকাশ্যে আসার পর বিজ্ঞানীরা রোগের প্রকৃত কারণের সন্ধান পান।

গবেষণায় জানা যায়, কুরুর জন্য দায়ী এক বিশেষ ধরনের সংক্রামক প্রোটিন—প্রিয়ন। এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার মতো নয়, বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রোটিনকে বিকৃত করে স্নায়ুতন্ত্র ধ্বংস করে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক খাওয়ার মাধ্যমেই এই প্রিয়ন শরীরে প্রবেশ করত এবং বছরের পর বছর সুপ্ত অবস্থায় থেকে ধীরে ধীরে মরণব্যাধিতে রূপ নিত।

প্রিয়ন এতটাই ভয়ংকর যে, অ্যান্টিবায়োটিক, রেডিয়েশন বা সাধারণ জীবাণুনাশকেও এটি ধ্বংস হয় না। এমনকি ফরমালিনের মতো শক্তিশালী রাসায়নিকেও প্রিয়নের বিষাক্ততা বেড়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ফোর সম্প্রদায়ের মধ্যে এই নরখাদক প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। এর পর ধীরে ধীরে কুরু রোগের প্রকোপ কমতে শুরু করে। তবে প্রিয়নের দীর্ঘ সুপ্তিকালের কারণে কয়েক দশক ধরেই বিচ্ছিন্নভাবে রোগের ঘটনা দেখা যায়।

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল আল্পার্স দীর্ঘদিন ধরে কুরু নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর মতে, কুরুতে আক্রান্ত শেষ রোগীর মৃত্যু হয় ২০০৯ সালে। ২০১২ সালে এই রোগের নজরদারি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয় এবং কুরু মহামারিকে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

এক সময় ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক বলে বিবেচিত এক প্রথাই যে কীভাবে একটি পুরো জনজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে—ফোরদের ইতিহাস তারই নির্মম সাক্ষ্য।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

শেষ শ্রদ্ধা থেকে ভয়াবহ পরিণতি: মৃত স্বজন ভক্ষণের করুণ গল্প

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৫০:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

মানবসভ্যতা যতই আধুনিক হোক, পৃথিবীর কিছু প্রান্তে এখনও টিকে আছে আদিম ও বিস্ময়কর কিছু রীতি। নরখাদক প্রথা তারই এক ভয়ংকর উদাহরণ। তেমনই এক রীতি পালনের ফলে ধ্বংসের মুখে পড়েছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনির ফোর জনজাতি।

পাপুয়া নিউগিনির পূর্বাঞ্চলের উচ্চভূমিতে বসবাসকারী ফোর সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু বছর ধরে প্রচলিত ছিল ‘এন্ডোক্যানিবালিজম’—নিজেদের মৃত স্বজনদের ভক্ষণ করার রীতি। তাদের বিশ্বাস ছিল, মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে পোকামাকড়ের খাদ্য বানানোর চেয়ে প্রিয় মানুষের শরীরে মিশে যাওয়া অনেক বেশি সম্মানের। এই রীতিকে তারা শোক, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে দেখত।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় নারী-পুরুষ-শিশু—সকলেই এই ভোজে অংশ নিত। পুরুষরা মৃত স্বজনের মাংস ভক্ষণ করত, আর নারী ও শিশুরা খেত মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের অংশ। বিশেষ করে নারীরাই মস্তিষ্ক রান্নার দায়িত্ব নিতেন। ফার্নের পাতা ও বাঁশের নলের ভেতরে মস্তিষ্ক সেদ্ধ করে তা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। শিশুদের ক্ষেত্রেও মায়েদের হাত থেকেই এই খাবার পৌঁছে যেত।

ফোরদের বিশ্বাস ছিল, মৃত মানুষের আত্মার বিপজ্জনক শক্তি ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা নারীদের শরীরের রয়েছে। নৃবিজ্ঞানী শার্লি লিন্ডেনবাউমের মতে, এই বিশ্বাস থেকেই নারীরা মৃতদেহ গ্রহণের প্রধান দায়িত্ব পালন করতেন।

কিন্তু এই ‘শ্রদ্ধার রীতি’ই একসময় হয়ে ওঠে ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদ। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ফোর সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এক অজানা রোগ—কুরু। স্থানীয় ভাষায় ‘কুরু’ অর্থ কাঁপুনি। আক্রান্ত ব্যক্তিরা ধীরে ধীরে হাত-পায়ের নিয়ন্ত্রণ হারাতেন, হাঁটতে পারতেন না, কথা ও খাওয়ার ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যেত। অদ্ভুতভাবে অনেকের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত হাসির প্রবণতাও দেখা দিত।

সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল, এই রোগে প্রধানত আক্রান্ত হচ্ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও শিশুরা। একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, কিছু গ্রামে কার্যত কোনো যুবতী নারী অবশিষ্ট ছিল না। ১৯৫০-এর দশকে কুরু মহামারি ফোর জনজাতিকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দেয়।

প্রথমদিকে গবেষকেরা রোগটির কারণ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। স্থানীয়রা একে আত্মার অভিশাপ বা জাদুবিদ্যার ফল বলে মনে করত। কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, এটি জিনগত কোনো সমস্যা। পরে আত্মীয়-ভক্ষণের প্রথা প্রকাশ্যে আসার পর বিজ্ঞানীরা রোগের প্রকৃত কারণের সন্ধান পান।

গবেষণায় জানা যায়, কুরুর জন্য দায়ী এক বিশেষ ধরনের সংক্রামক প্রোটিন—প্রিয়ন। এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার মতো নয়, বরং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রোটিনকে বিকৃত করে স্নায়ুতন্ত্র ধ্বংস করে দেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক খাওয়ার মাধ্যমেই এই প্রিয়ন শরীরে প্রবেশ করত এবং বছরের পর বছর সুপ্ত অবস্থায় থেকে ধীরে ধীরে মরণব্যাধিতে রূপ নিত।

প্রিয়ন এতটাই ভয়ংকর যে, অ্যান্টিবায়োটিক, রেডিয়েশন বা সাধারণ জীবাণুনাশকেও এটি ধ্বংস হয় না। এমনকি ফরমালিনের মতো শক্তিশালী রাসায়নিকেও প্রিয়নের বিষাক্ততা বেড়ে যেতে পারে।

১৯৫০ সালে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ফোর সম্প্রদায়ের মধ্যে এই নরখাদক প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়। এর পর ধীরে ধীরে কুরু রোগের প্রকোপ কমতে শুরু করে। তবে প্রিয়নের দীর্ঘ সুপ্তিকালের কারণে কয়েক দশক ধরেই বিচ্ছিন্নভাবে রোগের ঘটনা দেখা যায়।

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাইকেল আল্পার্স দীর্ঘদিন ধরে কুরু নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর মতে, কুরুতে আক্রান্ত শেষ রোগীর মৃত্যু হয় ২০০৯ সালে। ২০১২ সালে এই রোগের নজরদারি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয় এবং কুরু মহামারিকে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

এক সময় ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক বলে বিবেচিত এক প্রথাই যে কীভাবে একটি পুরো জনজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে—ফোরদের ইতিহাস তারই নির্মম সাক্ষ্য।