বন্দর অচলের নেপথ্য রাজনীতি ও অর্থনীতি, আন্দোলন না কি পরিকল্পিত নাশকতা?

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:২৪:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি–রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশের প্রবেশদ্বার। সেই বন্দর ছয় দিন কার্যত অচল থাকা মানেই জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া শ্রমিক আন্দোলন শেষ পর্যন্ত যে রূপ নেয়, তা কেবল শ্রমিক অসন্তোষে সীমাবদ্ধ ছিল না—বরং এর মধ্যে পরিকল্পিত নাশকতা ও স্বার্থান্বেষী তৎপরতার ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে।
নেতৃত্বের প্রশ্নে সন্দেহ
বন্দর কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, আন্দোলনের ‘ফ্রন্টলাইন’ শ্রমিকদের পেছনে ছিলেন ১৫ জন নির্দিষ্ট কর্মচারী, যারা বদলির আদেশ অমান্য করে এবং দূরবর্তী বন্দর থেকে আন্দোলনে উসকানি দিয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাধারণ শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ক্ষেত্রে এমন সমন্বিত ও দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা সাধারণত দেখা যায় না। এখানে নেতৃত্ব ছিল সংগঠিত, নির্দেশনাভিত্তিক এবং রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত।
রাজনৈতিক রং ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
এই ১৫ জনই বিএনপিপন্থী শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত—এ তথ্য প্রশাসনের অবস্থানকে আরও কঠোর করেছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ই কি একমাত্র কারণ, নাকি বন্দর ব্যবস্থাপনার ভেতরের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও অনাস্থাও এখানে ভূমিকা রেখেছে?
অন্যদিকে, আন্দোলনের আড়ালে এনসিটি থেকে বিতাড়িত একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ জড়িত কি না, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় আসা এই সংকটকে কেবল শ্রমিক বনাম সরকার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে।
৮ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি: কার দায়?
ছয় দিনে প্রায় ৬৬ কোটি ডলার মূল্যের বাণিজ্য আটকে যাওয়া কোনো ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ নয়, এটি সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি। রপ্তানিকারকের চালান আটকে যাওয়া, জাহাজ জেটি ছাড়তে না পারা এবং কনটেইনার জট—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বৈশ্বিক সরবরাহ-শৃঙ্খল নিয়ে বিদেশি অংশীদারদের আস্থায় ধাক্কা লেগেছে। এই ক্ষতির দায় যদি কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর বর্তায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের জন্য শুধু অধিকার নয়, দায়ও বটে।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদ তদন্তের উদ্যোগ একটি শক্ত বার্তা দেয়—রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে জিম্মি করার ঘটনা আর ‘আন্দোলন’ নামে মেনে নেবে না। একই সঙ্গে এটি প্রশাসনের জন্যও পরীক্ষা: তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ, তথ্যভিত্তিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়, তার ওপরই এই পদক্ষেপের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে।
দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সরকারের আশ্বাস বাস্তবায়ন না হলে নতুন করে অচলাবস্থার হুমকি রয়েছে। তবে এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন—প্রশাসন প্রস্তুত, গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব সামনে।
চট্টগ্রাম বন্দর ইস্যু এখন আর কেবল শ্রমিক আন্দোলনের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষণ।



















