ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যা জানালেন মির্জা ফখরুল
নির্বাচনের পর জামায়াতের সঙ্গে কোনো জোটে যাবে না বিএনপি

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৩০:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন দলের অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের ওপরই ভরসা করছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর — যিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা।
শেখ হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এই প্রেক্ষাপটে দ্য উইক-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো জোটে যাবে না বিএনপি। একই সঙ্গে তিনি তুলে ধরেন দলের সংস্কার পরিকল্পনা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে ভাবনা। সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো—
দ্য উইক: আর মাত্র কয়েক দিন পরই নির্বাচন। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক ভোট হবে — এ ব্যাপারে আপনি কতটা আশাবাদী?
মির্জা ফখরুল: বাংলাদেশের মানুষ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়। প্রায় ১৫ বছর ধরে জনগণ কার্যত ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। এমনকি ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী একটি পুরো প্রজন্ম আছে, যারা কখনো সত্যিকার অর্থে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা পায়নি। তাই মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমার বিশ্বাস, ভোটার উপস্থিতি ভালো হবে।
নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে – এমন বড় ধরনের কোনো সহিংসতা বা অস্থিরতার আশঙ্কা আমি দেখছি না। নির্বাচন কমিশন দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছে এবং সরকারও নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে। আমাদের উপমহাদেশে নির্বাচনের সময় কিছু সমস্যা থাকেই, তবে সেগুলো এতটা গুরুতর নয় যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে, সবকিছুই ভোটের জন্য প্রস্তুত।
দ্য উইক: জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনে নির্বাচন-পূর্ব বা নির্বাচন-পরবর্তী জোট নিয়ে নানা আলোচনা চলছে…
মির্জা ফখরুল: গত ১৫ বছরে আমরা যখন একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, তখন বাম ও ডান — সব দিকের সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়ে তুলেছিলাম। মোটামুটি ২০ থেকে ২৪টি রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে সেই আন্দোলনে ছিল।
আমাদের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচিতে আমরা স্পষ্টভাবে বলেছি — সরকার গঠন করতে পারলে, যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে ছিল, তাদের নিয়েই একটি ঐকমত্যভিত্তিক সরকার গঠন করা হবে। সেই অবস্থান এখনো বহাল আছে। যারা সেই আন্দোলনের অংশ ছিল না, তারা এই সরকারে থাকবে না।
দ্য উইক: তাহলে কি জামায়াতে ইসলামীও এর বাইরে থাকবে?
মির্জা ফখরুল: হ্যাঁ। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আমাদের কোনো সমঝোতা নেই এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন কোনো জাতীয় সরকারে জামায়াতকে আমি দেখছি না।
দ্য উইক: শিক্ষার্থীদের গড়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বিএনপি কেন জোটে যায়নি?
মির্জা ফখরুল: আমরা চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এনসিপি অনেক বেশি আসন দাবি করেছিল, যা বাস্তবসম্মত ছিল না। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের প্রার্থীরা ওই আসনগুলোতে জিততে পারবেন। কিন্তু নতুন প্রতীক নিয়ে এনসিপির প্রার্থীরা কতটা সফল হবেন, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। বাংলাদেশে নির্বাচনে প্রতীকের গুরুত্ব অনেক।
দ্য উইক: আওয়ামী লীগ নেই – এদিক থেকে তো এই নির্বাচন আলাদা…
মির্জা ফখরুল: এটা এভাবে নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন — এমন কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, শেখ হাসিনা নিজেই তাঁর দলকে নির্বাচনে অংশ না নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং মানুষ ভোট দিতে প্রস্তুত। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। আদর্শভাবে তাদের নতুন নেতৃত্ব ও নতুন ভাবমূর্তি নিয়ে ফিরে আসা উচিত ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা দলে বিকল্প নেতৃত্বের সুযোগ দেন না বলেই তা সম্ভব হয়নি।
দ্য উইক: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বেশ আলোচনায় এসেছে…
মির্জা ফখরুল: ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তারেক রহমানের ফিরে আসা সত্যিকারের উদ্দীপনা তৈরি করেছে। তাঁর প্রথম ভাষণেই তিনি মানবসম্পদ ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে কেন্দ্র করে একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেছেন। নারী ক্ষমতায়ন, কৃষকের কল্যাণ ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন। কৃষক কার্ড চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে কৃষক ন্যায্য দামে উপকরণ পায় এবং উৎপাদনের সঠিক মূল্য নিশ্চিত হয়। আগামী ১৮ মাসে অন্তত এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করেছেন এবং সেটি বাস্তবায়নের কৌশলও তুলে ধরেছেন।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তাঁর আরেকটি মূল অঙ্গীকার। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা হবে। সংবিধান সংস্কারে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুবারে সীমিত করার এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
শিক্ষা সংস্কারে প্রয়োজনভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা ও মেধাভিত্তিক উচ্চশিক্ষার কথা বলেছেন। স্বাস্থ্যখাতেও একটি কার্যকর ও সবার জন্য সহজলভ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার রয়েছে।
দ্য উইক: রাজনৈতিক আলোচনায় ভারতের বিরুদ্ধে মনোভাব বাড়ছে। কোন বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার?
মির্জা ফখরুল: প্রথমত, পানি বণ্টন সমস্যার আন্তরিক সমাধান দরকার — শুধু আলোচনা নয়। দ্বিতীয়ত, সীমান্তে হত্যা বন্ধ হতে হবে – কোনো সভ্য সমাজে এটি গ্রহণযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো ন্যায্যভাবে দেখতে হবে।
সাম্প্রতিক ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি দুঃখজনক ও অপ্রয়োজনীয় ছিল। এতে দুই দেশেই প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় সার্বভৌমত্ব, আত্মসম্মান ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
বেগম খালেদা জিয়ার শোকের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সফর একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
দ্য উইক: সামনে এগোতে গিয়ে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে শেখ হাসিনার প্রভাব কতটা থাকবে?
মির্জা ফখরুল: তিনি একটি বিষয়, কিন্তু সেটা একেবারে পাশ কাটানোই যাবে না – এমন বিষয়ও এটি নয়। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে দিয়ে এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এই সংকট তিনিই তৈরি করেছেন। দীর্ঘমেয়াদে তিনি রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন না। ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক শেখ হাসিনাকে পাশ কাটিয়েই এগোতে পারে এবং এগোনো উচিত।
দ্য উইক: ১৯৭১ সালের প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকলেও কি বাংলাদেশ পাকিস্তানের প্রতি নরম অবস্থান নিচ্ছে?
মির্জা ফখরুল: পাকিস্তানকে অবশ্যই ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে — এটাই আমাদের অবস্থান। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা জরুরি।



















