ঢাকা ০২:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বিচারে আটক, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০২:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্বিচার আটক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ঝালকাঠির কীর্তিপাশা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শংকর মুখার্জীর মামলা-ঘটনা তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। ২৭ ডিসেম্বর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার হওয়া শংকরকে ২০২২ সালের একটি মামলায় দায়ের করা হয়েছে। পরিবার অভিযোগ করেছেন, জমি ও খামারের দখল নিতেই ওই মামলা সাজানো হয়েছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রযোজ্য নির্বিচার আটক অন্তর্বর্তী সরকারেও বহাল রয়েছে। শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থক—যাদের মধ্যে আইনজীবী, অভিনেতা, রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন—সন্দেহভাজন হত্যা মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। সংবিধান স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে, বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখা যাবে না। তবে বাস্তবে এ আইন প্রায়ই লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আদালতের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়েছে। মামলার সংখ্যা অগণনীয় হলেও বিচার প্রক্রিয়ায় মাত্র সামান্য কিছু মামলা কার্যকরভাবে সমাধান হচ্ছে। এছাড়া ‘মব সহিংসতা’ এবং সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে পুলিশকে প্রায়শই জনসাধারণের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করতে হচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর আওতায় অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে নির্যাতনের কারণে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ, নিহত হয়েছেন ৮১ জন। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই আদালতের আদেশ ছাড়াই দীর্ঘ সময় আটক ছিলেন। সংবিধান স্পষ্টভাবে বলছে—গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে এবং তাকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবে, এই অধিকারগুলো ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করছে, বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে এবং মব সহিংসতার সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করছে। ফলে আইন, সংবিধান এবং মানবাধিকারের মূলনীতি বাস্তবতায় কার্যকর হচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের শৃঙ্খলিত হস্তক্ষেপ এবং বিচার ব্যবস্থার অক্ষমতা একদিকে রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তার ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে দেশের আইনি কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

নির্বিচারে আটক, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০২:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নির্বিচার আটক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ঝালকাঠির কীর্তিপাশা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শংকর মুখার্জীর মামলা-ঘটনা তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। ২৭ ডিসেম্বর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার হওয়া শংকরকে ২০২২ সালের একটি মামলায় দায়ের করা হয়েছে। পরিবার অভিযোগ করেছেন, জমি ও খামারের দখল নিতেই ওই মামলা সাজানো হয়েছে।

নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রযোজ্য নির্বিচার আটক অন্তর্বর্তী সরকারেও বহাল রয়েছে। শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থক—যাদের মধ্যে আইনজীবী, অভিনেতা, রাজনৈতিক কর্মীরাও রয়েছেন—সন্দেহভাজন হত্যা মামলায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। সংবিধান স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে, বিনা বিচারে কাউকে আটক রাখা যাবে না। তবে বাস্তবে এ আইন প্রায়ই লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আদালতের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়েছে। মামলার সংখ্যা অগণনীয় হলেও বিচার প্রক্রিয়ায় মাত্র সামান্য কিছু মামলা কার্যকরভাবে সমাধান হচ্ছে। এছাড়া ‘মব সহিংসতা’ এবং সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে পুলিশকে প্রায়শই জনসাধারণের ওপর অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করতে হচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৪ জন নিহত হয়েছেন। ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর আওতায় অন্তত ৮ হাজার ৬০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে নির্যাতনের কারণে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ, নিহত হয়েছেন ৮১ জন। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই আদালতের আদেশ ছাড়াই দীর্ঘ সময় আটক ছিলেন। সংবিধান স্পষ্টভাবে বলছে—গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে এবং তাকে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবে, এই অধিকারগুলো ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করছে, বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে এবং মব সহিংসতার সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করছে। ফলে আইন, সংবিধান এবং মানবাধিকারের মূলনীতি বাস্তবতায় কার্যকর হচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের শৃঙ্খলিত হস্তক্ষেপ এবং বিচার ব্যবস্থার অক্ষমতা একদিকে রাজনৈতিক সহিংসতার বিস্তার ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে দেশের আইনি কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।