‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি’, ভোটের মাঠে আলোচনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি

- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৮:৫৬:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
নির্বাচনের সময় এলেই রাজনীতির মাঠে নানা চমক দেখা যায়। কখনো প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি, কখনো ব্যতিক্রমী প্রচারণা—সব মিলিয়ে ভোটের রাজনীতি হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রে। চলমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এখানে আলোচনায় কোনো বড় দলের হেভিওয়েট নেতা নন, বরং আলো কেড়ে নিয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আশা মনি। তাঁর বক্তব্য, আচরণ ও প্রচারের ধরন ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সবখানেই আলোচনা তৈরি করেছে।
আশা মনির নাম প্রথম আলোচনায় আসে কয়েক দিন আগে, যখন এক জনসভায় তরুণ ভোটারদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। ওই সভায় তিনি বলেন, তরুণ সমাজ যদি তাঁকে ভোট দেয়, তবে তিনি তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। বক্তব্যটি মুহূর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ এটিকে রসিকতা হিসেবে দেখেছেন, কেউ আবার একে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য বলে সমালোচনা করেছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিয়ের মতো ব্যক্তিগত বিষয় জুড়ে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?
এতেই শেষ নয়। ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি’ নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেন আশা মনি নিজেই। সম্প্রতি তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেন, যেখানে বিকাশ, নগদ ও রকেটের নম্বর দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য আর্থিক সহায়তা চান। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় থাকতে ও প্রচারের প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে তাঁর আর্থিক সহায়তা দরকার। দেশ ও বিদেশে থাকা সমর্থকদের কাছে তিনি আবেদন জানান—যে যতটা পারেন, ততটাই যেন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
এই পোস্ট প্রকাশের পরপরই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ বিষয়টিকে সাহসী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে বলছেন—এভাবে প্রকাশ্যে অর্থ সহায়তা চাওয়া নির্বাচনী শালীনতার পরিপন্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সমর্থকদের একটি অংশ মনে করছেন, বড় দলের প্রার্থীদের মতো বিপুল অর্থ ও সংগঠন না থাকায় সাধারণ মানুষের ওপর ভরসা করাই একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর একমাত্র পথ। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, এটি ভোটারদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশা মনি বলেন, তিনি কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থন বা অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে নির্বাচনে নামেননি। তাঁর ভাষ্য, আমি সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। আমার পেছনে বড় কোনো ফান্ড নেই। যারা আমাকে বিশ্বাস করেন, তাদের সহযোগিতাতেই আমি নির্বাচনী লড়াই চালিয়ে যেতে চাই।
তিনি আরও বলেন, বিয়ের প্রসঙ্গটি তিনি প্রতীকী অর্থে বলেছেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বোঝাতে।
তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের একাংশ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাঁদের দাবি, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাওয়া মূলত ভোট কেনার শামিল। এটি নির্বাচনী আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা। একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্বাচন কোনো মজার বিষয় নয়। ভোটারদের এমন প্রলোভন দেখানো গণতন্ত্রের জন্য ভালো বার্তা দেয় না।
স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট। রাণীশংকৈল উপজেলার এক তরুণ ভোটার বলেন, বিয়ের কথা শুনে প্রথমে হাসিই পেয়েছিল। পরে ভাবলাম, এটা কি সত্যিই কোনো প্রতিশ্রুতি নাকি শুধু আলোচনায় আসার কৌশল? আবার এক দোকানি বলেন, সবাই তো বড় বড় কথা বলে। অন্তত উনি মানুষের কাছে সরাসরি যাচ্ছেন, এটুকু ভালো লাগছে।
চায়ের দোকান, হাটবাজার কিংবা সামাজিক আড্ডায় এখন একটাই আলোচনা—আশা মনির এই ব্যতিক্রমী প্রচারণা তাঁকে কতটা সুবিধা দেবে? কেউ বলছেন, এতে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন, যা একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য বড় অর্জন। আবার কেউ বলছেন, অতিরিক্ত আলোচনায় নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে।
নির্বাচনী বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে বিতর্ক অনেক সময় প্রচারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তবে সেটি ভোটে রূপ নেয় কি না, তা নির্ভর করে ভোটারদের বাস্তব বিবেচনার ওপর। ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় সমস্যাগুলোই শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের নির্বাচনী মাঠে আশা মনি এখন একটি আলোচিত নাম। বিয়ের প্রতিশ্রুতি ও অনলাইন সহায়তার আহ্বান তাঁকে সাময়িকভাবে আলোচনার শীর্ষে তুললেও, শেষ পর্যন্ত এই ব্যতিক্রমী কৌশল ব্যালট বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই সেই উত্তর জানার অপেক্ষায় রয়েছে এ আসনের ভোটাররা।















