ঢাকা ০২:০৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

পুরো শরীরে পোড়া দাগ, গৃহকর্মী শিশুর নীরব আর্তনাদ

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:২০:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৩৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

হাসপাতালের বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে ১১ বছরের একটি শিশু। শরীরজুড়ে পোড়া দাগ, কোথাও ফোসকা, কোথাও কালচে ক্ষত। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবার চোখে শুধু অশ্রু—কণ্ঠে চাপা আর্তনাদ।

মেয়ের বয়স যখন এক বছর, তখনই সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীকে হারান তিনি। এরপর এক দশক ধরে একাই বড় করেছেন সন্তানকে। মেয়ের কষ্ট হবে—এই ভেবে আর বিয়েও করেননি। কিন্তু দারিদ্র্য আর ভবিষ্যতের চিন্তায় সাত মাস আগে মেয়েটিকে ঢাকার উত্তরার এক বিত্তবান পরিবারে গৃহকর্মীর কাজে দেন। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল—মেয়ের বিয়েসহ সব দায়িত্ব তারা নেবে।

কিন্তু সেই আশ্বাসের আড়ালেই শুরু হয় নরকযন্ত্রণা।

গত বছরের জুনে মেয়েটি কাজে যায় রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সাফিকুর রহমানের বাসায়। বাবা জানান, সাত মাস ধরে সেখানে শিশুটিকে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

গত ৩১ জানুয়ারি মেয়েকে আনতে গিয়ে তিনি যে দৃশ্য দেখেন, তা কোনো বাবার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। দুই হাত, গলা, পিঠ, পা—শরীরের প্রায় সব জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। কোথাও স্পষ্ট পোড়া ক্ষত।

মেয়েটির বাবা বলেন,“আমার মেয়ের সারা শরীরে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। ডাক্তার বলেছেন, সুস্থ হতে অন্তত দুই মাস লাগতে পারে।”

ঘটনার পর মেয়েটিকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা গুরুতর।

রোববার উত্তরা পশ্চিম থানায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন শিশুটির বাবা। মামলায় বিমান বাংলাদেশের এমডি সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বিথী আক্তারসহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। ওই রাতেই পুলিশ উত্তরা থেকে সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মেয়েটির বাবা জানান, তাঁদের বাড়ি পঞ্চগড়ে। তিনি আশুলিয়ার একটি হোটেলে কাজ করেন। একটি চায়ের দোকানে পরিচয়ের সূত্রে বিমানের এমডির বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর আলম তাঁর মেয়েকে কাজে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে মালিক পক্ষ মেয়ের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

শেষবার গত ২ নভেম্বর মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন তিনি। এরপর একাধিকবার দেখা করতে গেলে নানা অজুহাতে বাধা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ৩১ জানুয়ারি দুপুরে ফোন করে জানানো হয়—মেয়েটি অসুস্থ, নিয়ে যেতে হবে। সন্ধ্যায় বাড়ির বাইরে এসে মেয়েটিকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার দুপুরে কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা। বলেন,“আমি শুধু চাই, আমার মেয়েটা বেঁচে থাকুক। আর কোনো বাবার সন্তান যেন এমন নির্যাতনের শিকার না হয়।”

এই শিশুটির শরীরে পোড়া দাগ শুধু একটি পরিবারের নিষ্ঠুরতার নয়—এটি সমাজের নীরবতারও জ্বলন্ত প্রমাণ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

পুরো শরীরে পোড়া দাগ, গৃহকর্মী শিশুর নীরব আর্তনাদ

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:২০:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

হাসপাতালের বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছে ১১ বছরের একটি শিশু। শরীরজুড়ে পোড়া দাগ, কোথাও ফোসকা, কোথাও কালচে ক্ষত। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাবার চোখে শুধু অশ্রু—কণ্ঠে চাপা আর্তনাদ।

মেয়ের বয়স যখন এক বছর, তখনই সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীকে হারান তিনি। এরপর এক দশক ধরে একাই বড় করেছেন সন্তানকে। মেয়ের কষ্ট হবে—এই ভেবে আর বিয়েও করেননি। কিন্তু দারিদ্র্য আর ভবিষ্যতের চিন্তায় সাত মাস আগে মেয়েটিকে ঢাকার উত্তরার এক বিত্তবান পরিবারে গৃহকর্মীর কাজে দেন। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল—মেয়ের বিয়েসহ সব দায়িত্ব তারা নেবে।

কিন্তু সেই আশ্বাসের আড়ালেই শুরু হয় নরকযন্ত্রণা।

গত বছরের জুনে মেয়েটি কাজে যায় রাষ্ট্রীয় বিমান পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সাফিকুর রহমানের বাসায়। বাবা জানান, সাত মাস ধরে সেখানে শিশুটিকে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

গত ৩১ জানুয়ারি মেয়েকে আনতে গিয়ে তিনি যে দৃশ্য দেখেন, তা কোনো বাবার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। দুই হাত, গলা, পিঠ, পা—শরীরের প্রায় সব জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। কোথাও স্পষ্ট পোড়া ক্ষত।

মেয়েটির বাবা বলেন,“আমার মেয়ের সারা শরীরে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে। ঠিকমতো কথা বলতে পারে না। ডাক্তার বলেছেন, সুস্থ হতে অন্তত দুই মাস লাগতে পারে।”

ঘটনার পর মেয়েটিকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার অবস্থা গুরুতর।

রোববার উত্তরা পশ্চিম থানায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন শিশুটির বাবা। মামলায় বিমান বাংলাদেশের এমডি সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বিথী আক্তারসহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। ওই রাতেই পুলিশ উত্তরা থেকে সাফিকুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মেয়েটির বাবা জানান, তাঁদের বাড়ি পঞ্চগড়ে। তিনি আশুলিয়ার একটি হোটেলে কাজ করেন। একটি চায়ের দোকানে পরিচয়ের সূত্রে বিমানের এমডির বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর আলম তাঁর মেয়েকে কাজে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পরে মালিক পক্ষ মেয়ের ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

শেষবার গত ২ নভেম্বর মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন তিনি। এরপর একাধিকবার দেখা করতে গেলে নানা অজুহাতে বাধা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ৩১ জানুয়ারি দুপুরে ফোন করে জানানো হয়—মেয়েটি অসুস্থ, নিয়ে যেতে হবে। সন্ধ্যায় বাড়ির বাইরে এসে মেয়েটিকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার দুপুরে কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা। বলেন,“আমি শুধু চাই, আমার মেয়েটা বেঁচে থাকুক। আর কোনো বাবার সন্তান যেন এমন নির্যাতনের শিকার না হয়।”

এই শিশুটির শরীরে পোড়া দাগ শুধু একটি পরিবারের নিষ্ঠুরতার নয়—এটি সমাজের নীরবতারও জ্বলন্ত প্রমাণ।