ট্রেনের ‘লাগেজ ভ্যানে’ বিনা টিকিটের যাত্রী, জড়িত গার্ড ও কর্মচারী
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:০৯:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে
ট্রেনের শব্দে কেঁপে ওঠা রেলপথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো হয়তো জানেন না—এই যাত্রার ভেতরেই লুকিয়ে আছে আরেকটি অজানা গল্প। যাত্রীবাহী বগি নয়, ট্রেনের ‘লাগেজ ভ্যান’—যেখানে থাকার কথা পণ্য ও মালামালের, সেখানেই গাদাগাদি করে বসে আছেন মানুষ। বিনা টিকিটে, অনিরাপদ এক যাত্রায়।
সম্প্রতি উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য—এই অবৈধ যাত্রার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন কিছু গার্ড ও রেলওয়ের কর্মচারী। তাদের সহায়তায়ই নিয়ম ভেঙে লাগেজ ভ্যানে তোলা হচ্ছে যাত্রীদের। বিনিময়ে নেওয়া হচ্ছে অর্থ।
যারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রা করছেন, তাদের অনেকেই নিম্নআয়ের মানুষ। গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়না, টিকিট না পাওয়া কিংবা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে বাধ্য হয়ে বেছে নিচ্ছেন এই পথ। কিন্তু তারা বুঝতে পারেন না—এই সিদ্ধান্ত তাদের জীবনের জন্য কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রামে কোটি টাকার লাগেজ ভ্যানে পণ্য পরিবহনের বদলে বিনা টিকিটে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। যেখানে পণ্য পরিবহন করে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির কথা, সেখানে বাইরে থেকে কোচের (বগি) তালা লাগিয়ে চলছে যাত্রী পরিবহন। এসবের নেপথ্যে রয়েছে ট্রেনের কিছু অসাধু গার্ড ও কর্মচারী। হঠাৎ রেলওয়ে গর্ভনমেন্ট পুলিশের (জিআরপি) অভিযানে এ চিত্র সামনে এসেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলেও এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
শনিবার (৪ এপ্রিল) রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন দপ্তর থেকে ব্যবস্থা না নেওয়া বিষয়টি জানা গেছে। এর আগে ২৫ মার্চ চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেনে রেল পুলিশের হাতে লাগেজ ভ্যানে যাত্রী পরিবহনের বিষয়টি ধরা পড়ে।
জানা গেছে, ট্রেনের গার্ড মনিরুল ইসলাম ও আরপিএ সায়মন লাগেজ ভ্যানে করে এভাবে প্রতিনিয়ত টিকিট যাত্রী পরিবহন করে থাকেন। বিনিময়ে এসব যাত্রীর কাছ থেকে আদায় করা অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন।
ঢাকা মেইল ট্রেনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যরা বলেন, বাধা দেওয়ার পরও গার্ড মনিরুল ইসলাম এবং আরপিএ সায়মুন লাগেজ ভ্যানে করে বিনা টিকিটে এভাবে যাত্রী পরিবহন করে থাকেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
জানা গেছে, ২৫ মার্চ রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম রেল পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসান লাগেজ ভ্যানের দরজা বন্ধ দেখে গার্ডকে খুলতে বলেন। গার্ড তখন তাকে ওসির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসতে বলেন। ওই সময় সাদা পোশাকধারী ওসি নিজের পরিচয় দিলে গার্ড ভ্যানের দরজা খুলে দেন।
দরজা খুলতেই বেশ কিছু যাত্রী হুড়মুড়িয়ে ভ্যান থেকে নামতে থাকেন। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ থাকায় ভেতরে তারা ঘেমে একাকার হয়ে যায়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে গার্ড মনিরুল ও রানিং পার্সেল এসিস্ট্যান্ট (আরপিএ) সায়মনের মুঠোফোনে একাধিক কল করা হলেও সাড়া মিলেনি।
চট্টগ্রাম রেল পুলিশের ওসি রফিকুল হাসান জানান, গোপন সূত্রে জানতে পেরে সিভিল ড্রেসে গিয়ে লাগেজ ভ্যানের দরজা খুলতে বলি। গার্ড তখন আমাকে বলে, ওসির সঙ্গে কথা বলতে। তখন আমি পরিচয় দিলে বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলতেই দেখি, ভেতর থেকে দলবেঁধে মানুষ লাগেজ ভ্যান থেকে নামছে। সবাই গরমে অতিষ্ঠ।
বিষয়টি পুলিশ সুপার ও রেলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে বলে জানান ওসি।
সহকারী বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আসিফ খান চৌধুরী জানান, বিষয়টি আমরা জানি না। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রেলওয়ের একাধিক সূত্র বলছে, বিষয়টি নতুন নয়, তবে সম্প্রতি তা আরও বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের যোগসাজশে এই অনিয়ম যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—কেন বন্ধ হচ্ছে না এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা? কারা দায় নেবে যদি কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে?






















