নকল ওয়ারিশ সাজিয়ে মরদেহ দান, এরপর বিক্রি
বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে বাণিজ্য, বিক্রি হচ্ছে ২ থেকে ৩ লাখে
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:৩১:১২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫ ১৭৬ বার পড়া হয়েছে
লাশ নিয়ে চলছে ভয়াবহ বাণিজ্য। হাসপাতালে কোনো বেওয়ারিশ লাশ নিয়ে আসা হলে মর্গের কর্মচারীরা তা সংরক্ষণ করেন। এক সময় চক্রের কোনো ব্যক্তিকে ওই লাশের ওয়ারিশ সাজিয়ে সেটি হাসপাতালের বাইরে নেয়া হয়। এরপর মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রি করে দেয়া হয় বিভিন্ন মেডিকেল প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষার্থীদের কাছে। এর সাথে জড়িত রয়েছে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কতিপয় অসাধু লোকজন।
ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের এক মর্গ সহকারী জানান, বেওয়ারিশ লাশগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামকে দেয়া হয়। এরপর সেগুলোর কী হয়, তা তাদের জানা নেই। আবার নকল ওয়ারিশকে দিয়ে লিখিতভাবে মরদেহ দান করানো হয়। এরপর সেটি ২ থেকে ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। মেডিকেল শিক্ষার্থীরা কিছুদিন তাদের শিক্ষণ-প্রশিক্ষণে ব্যবহারের পর সেটি দিয়ে কঙ্কাল তৈরি করা হয়। বিক্রি করা হয় মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে। অনেক সময় সরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থী ছাড়া বেসরকারি মেডিকেলে বিক্রি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি মেডিকেল কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, এমবিবিএসের প্রথম দেড় বছর এনাটমি বিভাগে কঙ্কালের প্রয়োজন হয়। তখন প্রত্যেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে কঙ্কাল সংগ্রহের হিড়িক পড়ে। সিনিয়র ভাইদের কাছ থেকে ছাড়া যে যার মতো কঙ্কালের ব্যবস্থা করেন। এক্ষেত্রে গুনতে হয় বড় অংকের টাকা। বাজারে প্লাস্টিকের কঙ্কাল পাওয়া গেলেও সেটা দিয়ে ভালো শেখা যায় না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অ্যানাটমি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সামিনা জানান, মেডিকেল শিক্ষা ও গবেষণার জন্য দুভাবে কঙ্কাল সংগ্রহ করা হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রের জন্য অনেকে নিজের দেহ দান করেন। এর বাইরেও শিক্ষার্থীরা কঙ্কাল কিনে থাকেন নানা কৌশলে। তাছাড়া মানুষের কঙ্কালের পরিবর্তে এখন কৃত্রিম কঙ্কালও ব্যবহার করা হয়। তবে কৃত্রিম কঙ্কাল দিয়ে শিক্ষার বিষয়টি সঠিকভাবে হয় না।
সূত্রে জানা যায়, অধিক লাভজনক হওয়ায় এই কাজে মেডিকেল শিক্ষক, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে কর্মচারীরাও জড়িয়ে পড়ছে। কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক এবং ছাত্রনেতা এর ভাগ পান। চক্রটি মূলত বিভিন্ন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনাটমি বিভাগে ব্যবহারের জন্য পচা-গলা লাশ অথবা কঙ্কাল বিক্রি করে থাকে।
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের তথ্যমতে, ২০২২ সালে বেওয়ারিশ মরদেহ ছিল ৪৪৩টি। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯০টিতে। আর এ বছর প্রথম ৩ মাসেই বেওয়ারিশ মরদেহ মিলেছে ১২৬ জনের বেশি। ২০২৪ সালে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ৫৭০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে।
তবে ২০২৫ সালের তথ্য না পাওয়া গেলেও গত ৬ মাসে প্রায় ৩০০ শতাধিক মানুষের লাশের তথ্য মিলছে। গোয়েন্দারা বলছেন, রাজনৈতিক কারণে ২০২৫ সালে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা বাড়তে পারে।
তবে এখন প্রশ্ন হলো-বেওয়ারিশ লাশ সব কি দফন হচ্ছে? যদি তা না হয় তবে কি বিক্রি হচ্ছে সেসব লাশ? কীভাবে বিক্রি হয় এবং কারা জড়িত? অনুসন্ধানে নেমে জানা যায়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের মর্গ থেকে বেওয়ারিশ লাশ বিক্রির সাথে জড়িত একাধিক চক্র।
তবে লাশগুলো বেশিরভাগই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থীদের কাছে কঙ্কাল হিবাসে মোটা দামে বিক্রি করে দেয় চক্রটি। তথ্য রয়েছে, মেডিকেল কলেজ ও কবরস্থানকেন্দ্রিক চক্রগুলোর সঙ্গে জড়িত রয়েছে দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেলের অসাধু কিছু চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে, ঢাকা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক এক চিকিৎসক বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে নানা অবৈধ পন্থায় বেওয়ারিশ লাশ ও কঙ্কাল বিক্রি করা হয়। যার প্রধান ক্রেতা হচ্ছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। এবং বেশির ভাগ লাশ বিক্রির সঙ্গে জড়িত মর্গের নিয়োগপ্রাপ্ত ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে বেওয়ারিশ লাশ বিক্রির সঙ্গে জড়িত ডোমদের প্রধান হিসেবে কাজ করছে একজন। যার রয়েছে ৮ জনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। যারা সরাসরি জড়িত লাশ বেচাকেনার সঙ্গে।
সাধারণত, বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধারের পর থানায় একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু বা আনন্যাচারাল ডেথ (ইউডি) মামলা হয়। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দাফনের জন্য দিয়ে দেওয়া হয় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে। প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্বের সঙ্গে লাশের আনুষ্ঠানিক সকলপ্রকার কাজ সম্পন্ন করে আজিমপুর বা জুরাইন কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করতে পাঠায়। কিন্তু এরপর লাশগুলো দাফন করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে কেউ তদারকি করে না, যে সুযোগটি গ্রহণ করে এই চক্রটি।
বাংলাদেশে বেওয়ারিশ লাশের (অশনাক্তকৃত মৃতদেহ) ক্ষেত্রে আইন রয়েছে, যা মৃতদেহ শনাক্তকরণ, ময়নাতদন্ত, এবং দাফন বা সৎকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে। যদি কোনো মৃতদেহ শনাক্ত করা না যায়, তবে পুলিশ তার পরিচয় জানার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়, যেমন আঙুলের ছাপ সংগ্রহ ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো।
এরপর আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মতো সেবামূলক সংস্থা লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে দায়িত্ব পালন করে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান জানান, হাসপাতালে আসা লাশগুলো মর্গে পাঠানো হয়। সেখান থেকে অজ্ঞাত লাশগুলো পুলিশের মাধ্যমে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামে হস্তান্তর করা হয়। এর পর আর মেডিকেল কোনো খবর রাখে না।
বাংলাদেশ পুলিশের এডিশনাল ডিআইজি মাসুদুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, বেওয়ারিশ লাশের আলামত ও ছবি তুলে রাখা হয়। এছাড়া মৃতের বর্ণনা লিখেও রাখা হয়, যাতে পরবর্তী সময়ে নিখোঁজ কারও পরিবার জানতে চাইলে তাদের সঠিক তথ্য দেওয়া যায়।
কঙ্কালের বেচাকেনা নিয়ে দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় ব্যবসায়ীদের লাগামহীন বেঁধে দেয়া দাম দিয়ে কঙ্কাল কিনতে গিয়ে ভোগান্তির মুখে পড়েন মেডিকেল শিক্ষার্থীরা।

























