ঢাকা ০১:৩৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আলুর বাম্পার ফলন, কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ

ওসমান গনি
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৩৯:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ ৫৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ, আর এ দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো মেহনতি কৃষক। প্রতি বছর হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘাম ঝরিয়ে তারা সোনালি ফসল ফলান কেবল নিজেদের মুখে অন্ন তুলে দিতে নয়, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছিল। উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে মুন্সিগঞ্জ, সবখানেই ছিল সবুজের সমারোহ। মাঠের পর মাঠ সবুজ চারার নিচে লুকিয়ে ছিল কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতির নির্মম পরিহাস আর বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি আজ আলু চাষিদের ঠেলে দিয়েছে এক অন্ধকার গহ্বরে। যেখানে ছিল উৎসবের আমেজ, সেখানে আজ কেবলই হাহাকার। কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ এখন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, কারণ তাদের সারা বছরের শ্রম আর পুঁজি এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

এবারের আলু চাষের প্রেক্ষাপট ছিল অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে আলাদা। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক লোকসান কাটিয়ে উঠতে অনেক প্রান্তিক কৃষক বুকভরা আশা নিয়ে আলুর আবাদ করেছিলেন। গ্রামীণ জনপদে আলুকে ‘নগদ ফসল’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বিক্রি করে কৃষক তার মেয়ের বিয়ে দেয়, ঘর মেরামত করে কিংবা পুরনো ঋণ শোধ করে। এই আশায় কেউ এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন, কেউ আবার মহাজনের কাছ থেকে উচ্চহারে দাদন নিয়েছেন এই বিশ্বাসে যে, এবার হয়তো ভালো ফলন দিয়ে সব দেনা মিটিয়ে পরিবারের মুখে দুবেলা হাসি ফোটাবেন। আলুর ফলনও হয়েছে আশাতীত। কিন্তু ট্র্যাজেডি শুরু হলো ঠিক যখন আলু উত্তোলনের মোক্ষম সময় ঘনিয়ে এল। আকাশ ভেঙে নামল অকাল বৃষ্টি। এই অসময়ের বৃষ্টি কৃষকের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দেখা দিল। বৃষ্টির পানিতে আলুর মাঠ তলিয়ে গেল নিমেষেই। মাটির নিচে থাকা হৃষ্টপুষ্ট আলু এখন কর্দমাক্ত পানির নিচে পচে যাওয়ার উপক্রম।

কৃষকরা এখন এক চরম কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। যারা অনেক কষ্টে কিছু আলু উদ্ধার করতে পেরেছেন, তারাও পড়েছেন মহাবিপদে। কারণ ভিজে যাওয়া বা বৃষ্টির পানি পাওয়া আলু বেশিদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার কর্তৃপক্ষও এই আলু রাখতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, কারণ পচন ধরার ভয় থাকে। আর যদি কোনোভাবে রাখা যায়ও, পচনশীল আলুর কারণে সুস্থ আলুগুলোও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। অন্যদিকে, বাজারের চিত্র আরও ভয়াবহ ও অমানবিক। একদিকে ফলন বেশি হওয়ায় বাজারে আলুর দামের ব্যাপক দরপতন ঘটেছে, অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে আলুর গুণমান নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় বড় বড় পাইকার ও ব্যবসায়ীরা আলু কিনতে অনীহা দেখাচ্ছেন। কৃষক এখন এক উভয় সংকটে পড়ে গেছেন। আলু যদি তারা পানির দরে বাজারে বিক্রি করে দেন, তবে চাষের খরচ, সার ও বীজের দামও উঠবে না। আর যদি বিক্রি না করেন, তবে চোখের সামনে কয়েকদিনের মধ্যেই আলু পচে কালো হয়ে যাবে। এই উভয় সংকটে পড়ে প্রান্তিক চাষিরা আজ দিশেহারা। তারা ভাবছেন কীভাবে ব্যাংকের ঋণ শোধ করবেন, কীভাবে এনজিওর কিস্তি মেটাবেন। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেক কৃষক এখন আত্মগ্লানিতে ভুগছেন। যদি তারা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারেন, তবে তাদের ওপর নেমে আসবে আইনি জটিলতা অথবা সামাজিক লাঞ্ছনা। অথচ এই কৃষকরাই দিনরাত এক করে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের প্লেটে খাবারের জোগান দেন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে আলুর অবদান অনস্বীকার্য। ধান ও গমের পরেই আলুকে আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি দেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের যে অবদান, তার একটি বিশাল অংশ আসে এই আলুর বাজার থেকে। রপ্তানি বাণিজ্যেও আলুর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপের বাজারে আমাদের আলুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতটি আজ চরম অবহেলার শিকার। কৃষি যদি বাংলাদেশের প্রাণ হয়, তবে সেই প্রাণের সঞ্চার করেন আমাদের কৃষকরা। কিন্তু আজ যখন কৃষকরা দুঃসময়ে পড়েছেন, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। যদি এই মুহূর্তে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায় থেকে কৃষকদের জন্য কোনো বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা না হয়, তবে কৃষির প্রতি তাদের চিরস্থায়ী অনীহা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একজন কৃষক যখন বারবার লোকসানের শিকার হন এবং চরম বিপদে কাউকে পাশে পান না, তখন তিনি নিরুপায় হয়ে কৃষি কাজ ছেড়ে শহরে রিকশা চালানো বা অন্য পেশায় নাম লেখান। এটি কেবল সেই কৃষকের একার ক্ষতি নয়, বরং পুরো দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী অশনি সংকেত।

বর্তমান এই সংকট উত্তরণে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বন্যায় বা অকাল বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠ পরিদর্শনে পাঠাতে হবে যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারি সুবিধার আওতায় আসে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, কৃষি ঋণের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ব্যাংক ও এনজিওগুলোকে নির্দেশ দিতে হবে যেন তারা আপাতত কিস্তি আদায় স্থগিত রাখে এবং ঋণের সুদ মকুব করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। এছাড়া, সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে আলু কেনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকার যদি সরাসরি কৃষকের উঠান থেকে আলু কেনে, তবে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়ারা আর সিন্ডিকেট করে দাম কমাতে পারবে না।

দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের কথা চিন্তা করলে আমাদের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আলুর দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা জরুরি, যেখানে বৃষ্টির পানি পাওয়া আলুও বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা যায়। এছাড়া আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। যদি আমরা আলুকে চিপস, স্টারক বা আলুর পাউডার হিসেবে রূপান্তর করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারি, তবে স্থানীয় বাজারে ধস নামলেও কৃষককে পথে বসতে হবে না। শিল্প মালিকদের আলুর বহুমুখী ব্যবহারে এগিয়ে আসতে হবে।

পাশাপাশি, কৃষকদের মাঝে উন্নত জাতের এবং দুর্যোগ সহনশীল বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন আবহাওয়া চরম অনিশ্চিত, তখন কৃষি গবেষণায় আরও অর্থায়ন ও শ্রম দিতে হবে। বিজ্ঞানীরা এমন জাতের আলু উদ্ভাবন করবেন যা জলাবদ্ধতা বা অধিক আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে। বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোকেও কেবল মুনাফা বা কিস্তি আদায়ের পেছনে না ছুটে এই দুর্যোগে কৃষকের পাশে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বীমা ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বে ‘ক্রপ ইন্স্যুরেন্স’ বা ফসল বীমা অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমাদের দেশেও যদি বাধ্যতামূলক ফসল বীমা চালু করা যেত, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলেও কৃষক অন্তত তার বিনিয়োগকৃত টাকা ফিরে পেতেন। এতে কৃষি থেকে কৃষকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার হার কমত।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কৃষককে আমরা কেবল ‘চাষি’ হিসেবে দেখি, কিন্তু তারা যে জাতির অন্নদাতা, সেই সম্মানটুকু দিতে কার্পণ্য করি। আজ আলুর বাজারে যে ধস, তার পেছনে সিন্ডিকেটের হাত থাকার অভিযোগও পুরনো। একদল অসাধু ব্যবসায়ী কৃষকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কম দামে আলু কিনে পরে চড়া দামে বিক্রি করে মুনাফা লুটে নেয়। এই বাজার তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কৃষকের জন্য সহজ শর্তে পরিবহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা সরাসরি বড় শহরগুলোর বাজারে তাদের পণ্য পৌঁছে দিতে পারে।

উপসংহারে বলা যায়, আলু চাষিদের এই বুকফাটা আর্তনাদ যেন কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ না থাকে। তাদের এই চোখের জল রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত পৌঁছানো জরুরি। বর্তমান সংকট সমাধানে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে দেশের কৃষি ব্যবস্থা এক বড় ধরনের কাঠামোগত সংকটে পড়বে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ যাই ঘটুক না কেন, মানুষের ক্ষুধা মেটানোর জন্য কৃষকের জমানো ফসলই একমাত্র বিকল্প। রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অন্তত ভাত বা আলুর উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই কৃষকদের এই দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো কেবল কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সরকারের উচিত অবিলম্বে আলু চাষিদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তাদের জন্য বিশেষ ‘রিলিফ প্যাকেজ’ ঘোষণা করা এবং দীর্ঘমেয়াদী কৃষি সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করা। তবেই হয়তো আবারও মাঠের কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে, মাঠের ফসল তার যোগ্য সম্মান পাবে এবং সোনার বাংলা তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। কৃষি এবং কৃষককে রক্ষা করাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। আমরা যদি আজ কৃষকের পাশে না দাঁড়াই, তবে কালকের খাদ্যসংকটের দায় আমাদেরই নিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
postnews25@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

আলুর বাম্পার ফলন, কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৩৯:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ, আর এ দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো মেহনতি কৃষক। প্রতি বছর হাড়ভাঙা খাটুনি আর ঘাম ঝরিয়ে তারা সোনালি ফসল ফলান কেবল নিজেদের মুখে অন্ন তুলে দিতে নয়, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে আলুর বাম্পার ফলন হয়েছিল। উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে মুন্সিগঞ্জ, সবখানেই ছিল সবুজের সমারোহ। মাঠের পর মাঠ সবুজ চারার নিচে লুকিয়ে ছিল কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতির নির্মম পরিহাস আর বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি আজ আলু চাষিদের ঠেলে দিয়েছে এক অন্ধকার গহ্বরে। যেখানে ছিল উৎসবের আমেজ, সেখানে আজ কেবলই হাহাকার। কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ এখন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, কারণ তাদের সারা বছরের শ্রম আর পুঁজি এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

এবারের আলু চাষের প্রেক্ষাপট ছিল অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে আলাদা। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক লোকসান কাটিয়ে উঠতে অনেক প্রান্তিক কৃষক বুকভরা আশা নিয়ে আলুর আবাদ করেছিলেন। গ্রামীণ জনপদে আলুকে ‘নগদ ফসল’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বিক্রি করে কৃষক তার মেয়ের বিয়ে দেয়, ঘর মেরামত করে কিংবা পুরনো ঋণ শোধ করে। এই আশায় কেউ এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন, কেউ আবার মহাজনের কাছ থেকে উচ্চহারে দাদন নিয়েছেন এই বিশ্বাসে যে, এবার হয়তো ভালো ফলন দিয়ে সব দেনা মিটিয়ে পরিবারের মুখে দুবেলা হাসি ফোটাবেন। আলুর ফলনও হয়েছে আশাতীত। কিন্তু ট্র্যাজেডি শুরু হলো ঠিক যখন আলু উত্তোলনের মোক্ষম সময় ঘনিয়ে এল। আকাশ ভেঙে নামল অকাল বৃষ্টি। এই অসময়ের বৃষ্টি কৃষকের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দেখা দিল। বৃষ্টির পানিতে আলুর মাঠ তলিয়ে গেল নিমেষেই। মাটির নিচে থাকা হৃষ্টপুষ্ট আলু এখন কর্দমাক্ত পানির নিচে পচে যাওয়ার উপক্রম।

কৃষকরা এখন এক চরম কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। যারা অনেক কষ্টে কিছু আলু উদ্ধার করতে পেরেছেন, তারাও পড়েছেন মহাবিপদে। কারণ ভিজে যাওয়া বা বৃষ্টির পানি পাওয়া আলু বেশিদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার কর্তৃপক্ষও এই আলু রাখতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, কারণ পচন ধরার ভয় থাকে। আর যদি কোনোভাবে রাখা যায়ও, পচনশীল আলুর কারণে সুস্থ আলুগুলোও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। অন্যদিকে, বাজারের চিত্র আরও ভয়াবহ ও অমানবিক। একদিকে ফলন বেশি হওয়ায় বাজারে আলুর দামের ব্যাপক দরপতন ঘটেছে, অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে আলুর গুণমান নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় বড় বড় পাইকার ও ব্যবসায়ীরা আলু কিনতে অনীহা দেখাচ্ছেন। কৃষক এখন এক উভয় সংকটে পড়ে গেছেন। আলু যদি তারা পানির দরে বাজারে বিক্রি করে দেন, তবে চাষের খরচ, সার ও বীজের দামও উঠবে না। আর যদি বিক্রি না করেন, তবে চোখের সামনে কয়েকদিনের মধ্যেই আলু পচে কালো হয়ে যাবে। এই উভয় সংকটে পড়ে প্রান্তিক চাষিরা আজ দিশেহারা। তারা ভাবছেন কীভাবে ব্যাংকের ঋণ শোধ করবেন, কীভাবে এনজিওর কিস্তি মেটাবেন। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেক কৃষক এখন আত্মগ্লানিতে ভুগছেন। যদি তারা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারেন, তবে তাদের ওপর নেমে আসবে আইনি জটিলতা অথবা সামাজিক লাঞ্ছনা। অথচ এই কৃষকরাই দিনরাত এক করে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের প্লেটে খাবারের জোগান দেন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে আলুর অবদান অনস্বীকার্য। ধান ও গমের পরেই আলুকে আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি দেশের জিডিপিতে কৃষিখাতের যে অবদান, তার একটি বিশাল অংশ আসে এই আলুর বাজার থেকে। রপ্তানি বাণিজ্যেও আলুর বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে ইউরোপের বাজারে আমাদের আলুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতটি আজ চরম অবহেলার শিকার। কৃষি যদি বাংলাদেশের প্রাণ হয়, তবে সেই প্রাণের সঞ্চার করেন আমাদের কৃষকরা। কিন্তু আজ যখন কৃষকরা দুঃসময়ে পড়েছেন, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। যদি এই মুহূর্তে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায় থেকে কৃষকদের জন্য কোনো বিশেষ সহায়তা নিশ্চিত করা না হয়, তবে কৃষির প্রতি তাদের চিরস্থায়ী অনীহা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একজন কৃষক যখন বারবার লোকসানের শিকার হন এবং চরম বিপদে কাউকে পাশে পান না, তখন তিনি নিরুপায় হয়ে কৃষি কাজ ছেড়ে শহরে রিকশা চালানো বা অন্য পেশায় নাম লেখান। এটি কেবল সেই কৃষকের একার ক্ষতি নয়, বরং পুরো দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী অশনি সংকেত।

বর্তমান এই সংকট উত্তরণে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বন্যায় বা অকাল বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠ পরিদর্শনে পাঠাতে হবে যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারি সুবিধার আওতায় আসে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তার ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, কৃষি ঋণের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ব্যাংক ও এনজিওগুলোকে নির্দেশ দিতে হবে যেন তারা আপাতত কিস্তি আদায় স্থগিত রাখে এবং ঋণের সুদ মকুব করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। এছাড়া, সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে আলু কেনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সরকার যদি সরাসরি কৃষকের উঠান থেকে আলু কেনে, তবে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়ারা আর সিন্ডিকেট করে দাম কমাতে পারবে না।

দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের কথা চিন্তা করলে আমাদের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। আলুর দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার স্থাপন করা জরুরি, যেখানে বৃষ্টির পানি পাওয়া আলুও বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা যায়। এছাড়া আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। যদি আমরা আলুকে চিপস, স্টারক বা আলুর পাউডার হিসেবে রূপান্তর করে বিদেশে রপ্তানি করতে পারি, তবে স্থানীয় বাজারে ধস নামলেও কৃষককে পথে বসতে হবে না। শিল্প মালিকদের আলুর বহুমুখী ব্যবহারে এগিয়ে আসতে হবে।

পাশাপাশি, কৃষকদের মাঝে উন্নত জাতের এবং দুর্যোগ সহনশীল বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন আবহাওয়া চরম অনিশ্চিত, তখন কৃষি গবেষণায় আরও অর্থায়ন ও শ্রম দিতে হবে। বিজ্ঞানীরা এমন জাতের আলু উদ্ভাবন করবেন যা জলাবদ্ধতা বা অধিক আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে। বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোকেও কেবল মুনাফা বা কিস্তি আদায়ের পেছনে না ছুটে এই দুর্যোগে কৃষকের পাশে মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বীমা ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বে ‘ক্রপ ইন্স্যুরেন্স’ বা ফসল বীমা অত্যন্ত জনপ্রিয়। আমাদের দেশেও যদি বাধ্যতামূলক ফসল বীমা চালু করা যেত, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলেও কৃষক অন্তত তার বিনিয়োগকৃত টাকা ফিরে পেতেন। এতে কৃষি থেকে কৃষকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার হার কমত।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কৃষককে আমরা কেবল ‘চাষি’ হিসেবে দেখি, কিন্তু তারা যে জাতির অন্নদাতা, সেই সম্মানটুকু দিতে কার্পণ্য করি। আজ আলুর বাজারে যে ধস, তার পেছনে সিন্ডিকেটের হাত থাকার অভিযোগও পুরনো। একদল অসাধু ব্যবসায়ী কৃষকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কম দামে আলু কিনে পরে চড়া দামে বিক্রি করে মুনাফা লুটে নেয়। এই বাজার তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কৃষকের জন্য সহজ শর্তে পরিবহণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা সরাসরি বড় শহরগুলোর বাজারে তাদের পণ্য পৌঁছে দিতে পারে।

উপসংহারে বলা যায়, আলু চাষিদের এই বুকফাটা আর্তনাদ যেন কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ না থাকে। তাদের এই চোখের জল রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত পৌঁছানো জরুরি। বর্তমান সংকট সমাধানে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে দেশের কৃষি ব্যবস্থা এক বড় ধরনের কাঠামোগত সংকটে পড়বে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষ যাই ঘটুক না কেন, মানুষের ক্ষুধা মেটানোর জন্য কৃষকের জমানো ফসলই একমাত্র বিকল্প। রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অন্তত ভাত বা আলুর উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই কৃষকদের এই দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো কেবল কোনো দয়া বা করুণা নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সরকারের উচিত অবিলম্বে আলু চাষিদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তাদের জন্য বিশেষ ‘রিলিফ প্যাকেজ’ ঘোষণা করা এবং দীর্ঘমেয়াদী কৃষি সুরক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করা। তবেই হয়তো আবারও মাঠের কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে, মাঠের ফসল তার যোগ্য সম্মান পাবে এবং সোনার বাংলা তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। কৃষি এবং কৃষককে রক্ষা করাই হোক আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার। আমরা যদি আজ কৃষকের পাশে না দাঁড়াই, তবে কালকের খাদ্যসংকটের দায় আমাদেরই নিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
postnews25@gmail.com