ন্যায়বিচারের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ: নতুন সরকারের কঠিন পরীক্ষা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৫২:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ ৬১ বার পড়া হয়েছে
একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, কতটা মানবিক এবং কতটা টেকসই—তা বোঝা যায় সংকটের মুহূর্তে তার আচরণে। আইন যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, বিচার যখন বিলম্বিত বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়, আর অপরাধীরা যখন রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ে দায়মুক্তি পায়—তখন রাষ্ট্র নিজেই তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গত ১৮ মাসে বাংলাদেশ সেই বাস্তবতারই এক উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি দেখেছে। নতুন সরকারের সামনে আজ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নেই; সামনে রয়েছে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব। জনগণের আস্থা ভেঙে পড়েছে, ন্যায়বিচারের ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এই প্রেক্ষাপটে কিছু মৌলিক দাবি শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়—এগুলো রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখার শর্ত।
গত দেড় বছরে মব সহিংসতা একটি ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। গুজব, সন্দেহ কিংবা রাজনৈতিক উসকানিতে মানুষকে প্রকাশ্যে মারধর, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো রাষ্ট্রের নীরবতা। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে, প্রশাসন কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে গেছে। মব সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ। নতুন সরকারের কাছে জনগণের সুস্পষ্ট দাবি—গত ১৮ মাসে সংঘটিত প্রতিটি মব সহিংসতার ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া এখানে কোনো বিকল্প নেই। কারণ একটি মবকে শাস্তি না দিলে ভবিষ্যতে হাজারটি মব জন্ম নেয়।
দুর্নীতি কোনো নৈতিক বিচ্যুতি নয়; এটি একটি সংগঠিত অপরাধ। গত সরকারসহ বিগত ১৮ মাসে লুটপাট, ঘুষ ও অর্থপাচার যে মাত্রায় হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। ব্যাংক খাত সংকটে পড়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং সাধারণ মানুষকে মূল্যস্ফীতি ও বাড়তি করের বোঝা বহন করতে হয়েছে।
এখানে প্রশ্ন একটাই—এই অর্থ কোথায় গেল এবং কারা লাভবান হলো? জনগণের দাবি হলো—সব ধরনের দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনতে হবে। শুধু তদন্ত প্রতিবেদন নয়, দৃশ্যমান শাস্তি প্রয়োজন। বড় মাছ ধরা না পড়লে দুর্নীতির জাল কখনো ছিঁড়বে না। যে দেশে একজন দিনমজুর ন্যূনতম জীবিকা নিয়ে লড়াই করে, সেই দেশেই যদি কিছু মানুষ রাতারাতি অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠে—তাহলে তা শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীর সামাজিক সংকটের লক্ষণ। গত ১৮ মাসে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করে যারা অস্বাভাবিকভাবে সম্পদশালী হয়েছে, তারা রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের জীবন্ত প্রতীক।
নতুন সরকারের দায়িত্ব হলো—এই অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, কেউ যেন দেশত্যাগ করে বিচারের হাত এড়িয়ে যেতে না পারে। ন্যায়বিচার যদি সীমান্তে থেমে যায়, তবে তা ন্যায়বিচার নয়—তা ভানমাত্র। একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন তার মেরুদণ্ড। কিন্তু যখন নিয়োগ ও পদোন্নতি যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য ও অবৈধ সুপারিশের ভিত্তিতে হয়, তখন সেই মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। গত সময়ে এমন অসংখ্য নিয়োগ ও পদোন্নতি হয়েছে, যা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও দক্ষতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই অবৈধ নিয়োগ ও পদোন্নতি বাতিল করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন। যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তারা যখন বারবার বঞ্চিত হন, তখন দুর্নীতিই স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কার অসম্ভব।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই ‘আইনশৃঙ্খলা সমস্যার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা। গত ১৮ মাসে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করে—দোষীরা শাস্তি পায়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে উৎসাহ পেয়েছে। নতুন সরকারের কাছে জনগণের স্পষ্ট দাবি—এই সব অপরাধের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ সকল নাগরিকের জান-মালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে, সংখ্যাগরিষ্ঠও শেষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকে না—ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়।
মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি একটি নীরব যুদ্ধ, যেখানে প্রতিদিন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পরাজিত হচ্ছে। মাদক উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রিতে জড়িত চক্রগুলো বছরের পর বছর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয় পেয়ে এসেছে।এখন আর শুধু কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিলে চলবে না—বাস্তব প্রয়োগ চাই। মাদকবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মানে কোনো ছাড় নয়, কোনো আপস নয়, কোনো দ্বৈতনীতি নয়। ক্ষমতাবান মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই ন্যায়বিচারের ন্যূনতম শর্ত।
নতুন সরকার আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তারা চাইলে পুরোনো ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে, অথবা সাহসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের পথে হাঁটতে পারে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্নই মনে রাখবে—
রাষ্ট্র কি অপরাধীর পাশে দাঁড়াবে, না কি নাগরিকের? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে দেশের ভবিষ্যৎ।
লেখক: শিক্ষক
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com





















