খতনার টেবিল থেকে লাশঘর, ভুল চেতনানাশকে নিভে গেল শিশু আয়ানের জীবন
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৯:৪০:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
পাঁচ বছর নয় মাস বয়সী আয়ান আহমেদের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল সুচ। অথচ সেই সুচই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল তার প্রাণ। সুন্নতে খতনার মতো একটি সাধারণ চিকিৎসা প্রক্রিয়া—যা হাজারো শিশু নিরাপদে পার করে—সেটিই হয়ে উঠল আয়ানের জন্য মৃত্যুপথযাত্রী হওয়ার সূচনা।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।
এদিন আদালতে অভিযুক্ত তিন চিকিৎসক উপস্থিত না থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর আগে গত ৯ জানুয়ারি বাড্ডা থানার পরিদর্শক মো. ইয়াসিন খন্দকার অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর সাঁতারকুলে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে খতনার জন্য নেওয়া হয় আয়ানকে। পরিবার ভেবেছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাসিমুখে ছেলেকে নিয়ে ফিরবে তারা। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও আয়ানের জ্ঞান ফেরেনি। ধীরে ধীরে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট, পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
অবশেষে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আট দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে চিকিৎসকেরা আয়ানকে মৃত ঘোষণা করেন। সেই মুহূর্তে হাসপাতালের করিডোরে ভেঙে পড়ে একটি পরিবার—চিরতরে থেমে যায় একটি শিশুর জীবন।
মামলার অভিযোগপত্র, ময়নাতদন্ত এবং বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। ভুলভাবে চেতনানাশক ও অন্যান্য ওষুধ প্রয়োগের কারণেই আয়ানের শ্বাসকষ্ট হয় এবং সেটিই তার মৃত্যুর মূল কারণ। প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের দায়িত্বে গুরুতর অবহেলার বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে সার্জন তাসনুভা মাহজাবীন, স্পেশাল অ্যানেসথেটিস্ট ডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদ এবং সহকারী স্পেশাল অ্যানেসথেটিস্ট ডা. মো. নাজিম উদ্দিনকে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। অভিযুক্ত চিকিৎসকেরা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
কিন্তু আয়ানের মৃত্যুর পরও শেষ হয়নি পরিবারের দুর্ভোগ। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মৃত্যুর পর চিকিৎসা ব্যয়ের নামে পরিবারের কাছে ৫ লাখ ৭৭ হাজার ২৫৭ টাকা দাবি করা হয়। বিল পরিশোধ না করা পর্যন্ত মরদেহ হস্তান্তর করা হবে না বলেও জানানো হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে আয়ানের নিথর দেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মামলার বাদী ও আয়ানের বাবা মো. শামীম আহমেদ অভিযোগপত্রে হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আসামি না করায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় তিনি নারাজি আবেদন না করে মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়—এটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি কঠিন প্রশ্ন। খতনার মতো সাধারণ চিকিৎসায় যদি ভুল চেতনানাশকে প্রাণ হারাতে হয়, তবে নিরাপত্তার দায় কার?
আয়ানের বাবা এখন শুধু একটাই চাওয়া রাখেন—“আমার ছেলেটা আর ফিরবে না, কিন্তু যেন আর কোনো বাবা-মাকে এমন লাশ নিয়ে হাসপাতাল ছাড়তে না হয়।”























