এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
নারী প্রার্থী সংকট সংসদে, বিএনপিতে মাত্র ৩ শতাংশ
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:১৪:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬ ৯০ বার পড়া হয়েছে
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে আবারও সামনে এসেছে ‘নারী প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি’ প্রসঙ্গ। বিশেষ করে বিএনপি, ইসলামিক দল এবং কিছু জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলের অবস্থান ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের বিপরীতে বিএনপি ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দেয়—যা সংখ্যার হিসেবে দলগুলোর মধ্যে সর্বাধিক। কিন্তু খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৯ জনে। ফলে বৃহত্তম বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে নারী প্রার্থীর হার দাঁড়ায় মাত্র ৩ শতাংশে।
রাজনীতিতে নারী উপস্থিতি—সংখ্যায় কম, বিতর্কে বেশি
দলগতভাবে বিএনপি সংখ্যায় এগোলেও দেশের সামগ্রিক চিত্র ভিন্ন। নিবন্ধিত ৫১টি দলের মধ্যে ৩০টি দল এ নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীও দেয়নি। মনোনয়ন ফর্ম বিক্রির হিসাবেও নারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—নারী ভোটার সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য হলেও প্রার্থী কম কেন?
বিএনপির ক্ষেত্রে সংকট তিনটি স্তরে
বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে মূলত তিনটি কারণ উঠে আসে— “জেতার মতো” নারী প্রার্থী কম, সরাসরি মাঠ রাজনীতিতে নারীর অনুপস্থিতি, অর্থ, পেশিশক্তি ও কর্মীবাহিনী—এ তিনটিতে পিছিয়ে থাকা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন— “বিষয়টা নারী-পুরুষ না, জেতার সম্ভাবনা যার বেশি তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।”
তবে কেন নারী নেতৃত্ব তৈরি হয়নি—এ প্রশ্নে তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেন। তার ভাষায়— “গত ১৬/১৭ বছরে ভয়ের পরিবেশ ছিল। যোগ্য পুরুষও কম পেয়েছি, নারী তো আরও কম।”
‘পুরুষ কোটায় নারী প্রার্থী’ বিতর্ক
বিএনপির ভেতরেও অভিযোগ আছে— নারী প্রার্থী বাছাই হয়েছে পরিবারতন্ত্রের ভিত্তিতে, তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব নয়।
এ বিষয়ে বিএনপির দলের স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন—“সবাই কোনো না কোনো পুরুষ এমপি বা নেতার পরিবার থেকে আসা। এটাকে আমি বলি ‘পুরুষ কোটায় নারী প্রার্থী’।” তার মতে, মূল সমস্যা তৃণমূলে নয়, বরং দলের ভেতরের মূল্যায়নে।
ইসলামী দলগুলোতে নারীর অনুপস্থিতি—আদর্শিক নাকি বাস্তব?
ইসলামী দলগুলোর বড় নাম জামায়াতে ইসলামী— এইবার ২৭৬ আসনে প্রার্থী দিয়েও একজন নারীও নেই।
ইতিহাসেও জাতীয় নির্বাচনে নারী প্রার্থীর নজির নেই।
জামায়াতের পক্ষ থেকে যে কারণগুলো বলা হয়— পর্দা মানা ও মাঠ পর্যায়ে গণসংযোগের সীমাবদ্ধতা, নারীর ব্যক্তিগত আগ্রহ কম, নিরাপত্তা শঙ্কা। তবে দলটির মিডিয়া শাখার প্রধান এহসানুল মাহবুব জোবায়ের জানান— “নারী প্রার্থী দিতে বিধিনিষেধ নেই, সমস্যা আগ্রহ ও নিরাপত্তা ইস্যুতে।”
রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলেন— “নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও আদর্শিকভাবে নারীদের দূরে রাখার প্রবণতাই এখানে কাজ করছে।”
ব্যতিক্রম এনসিপি
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৪৭ আসনে ৩ নারী প্রার্থী দিয়েছে—হার ৭ শতাংশ, যা দেশে তুলনামূলকভাবে বেশি। ঢাকা-১৯ আসনে দিলশানা পারুল দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে মনোনীত হন।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি উল্লেখযোগ্য, কারণ—বড় দলগুলো নারী প্রার্থী নিম্ন মাত্রায় রেখেছে,ইসলামীসহ ৩০টি দল একটিও নারী প্রার্থী দেয়নি।
মূল সংকট—ক্ষমতার কাঠামো পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত
বিশ্লেষকদের মতে সমস্যাগুলো মূলত তিনটি স্তরে—দলীয় ক্ষমতার কাঠামো পুরুষ-প্রধান, মনোনয়ন বাণিজ্য ও নির্বাচনী ব্যয়, সহিংসতার সংস্কৃতি।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম বলেন—“দলগুলো যেকোনো মূল্যে জিততে চায়। নারীরা জিতবে না, টাকা কম—এই ধারণাই প্রাধান্য পায়।” এ ছাড়া পারিবারিক বাধা, সামাজিক ধারণা ও নিরাপত্তাজনিত ভয় নারীদের রাজনীতিতে নিরুৎসাহিত করে।
নারী ভোটার বাড়ছে, কিন্তু নারী প্রার্থী বাড়ছে না—এটা এখন বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
✔ ইসলামী দলগুলো নারীর অংশগ্রহণে আদর্শিক সংকটে
✔ বড় দলগুলোতে ক্ষমতা ও অর্থনীতির বাঁধা
✔ তৃণমূল নারীর জন্য দরজা খোলে না
✔ দলগুলো জিততে গিয়ে প্রতিনিধিত্ব বিসর্জন দেয়
ফলে রাজনৈতিক মাঠে নারী এখনো প্রান্তে, কেন্দ্রের কাছে নয়।

























