ঢাকা ০৭:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাজেট: রাষ্ট্র কোথা থেকে আয় করে, কোথায় ব্যয় করে

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:০৯:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ জুন ২০২৫ ৭৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাষ্ট্রের আয়ের কতকগুলো উৎস আছে। মূলত রাষ্ট্র নাগরিকদের কাছ থেকে নানাভাবে কর আদায় করে। এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর ও করবহির্ভূত আয়। প্রত্যক্ষ করের মধ্যে আছে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর কর (করপোরেট কর), দান কর, উত্তরাধিকার কর, যানবাহন কর, মাদক শুল্ক, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি। আর পরোক্ষ কর হচ্ছে আমদানি কর, আবগারি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), সম্পূরক শুল্ক-এ রকম নানা ধরনের কর।

কর ছাড়া আরও আয় আছে। যেমন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ, সুদ, সাধারণ প্রশাসন থেকে আয়; ডাক, তার ও টেলিফোন থেকে আয়; পরিবহন আয়, জরিমানা ও দণ্ড থেকে আয়; ভাড়া, ইজারা, টোল ও লেভি থেকে আয় ইত্যাদি।

এর মানে একটি দেশের ক্ষেত্রে বাজেট হচ্ছে সেই দেশের জনসাধারণের দেওয়া নানা রকম ট্যাক্স বা কর হিসেবে বা পাওয়া যাবে ও করের বাইরে থেকে যা পাওয়া যাবে, এসব মিলিয়ে একটা সম্ভাব্য আয়ের পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন ও চলতি (রাজস্ব) খাতে ওই আয় খরচ করার একটি বার্ষিক হিসাব।

সরকারের ব্যয় দুই রকম। একটি অনুন্নয়ন বা রাজস্ব ব্যয়। এটি হচ্ছে সরকার পরিচালনার খরচ। এই অনুন্নয়ন ব্যয় মোটাদাগে তিনটি—দেশরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসন চালানোর খরচ। বাংলাদেশ একটি কল্যাণরাষ্ট্র নয়। তারপরও বাজেটে একটি মানবিক চেহারা দেওয়ার চেষ্টা থাকে। এ জন্য নানা ধরনের সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। আবার কৃষি ও জ্বালানি খাতে সরকার ভর্তুকি দেয়। এরও ব্যয় আছে।

দেশ পরিচালনায় যত ধরনের ব্যয় আছে, তা পূরণ করে আয়ের বাকি অর্থ দিয়ে সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা অর্থই উন্নয়ন বাজেট। এই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। রাস্তা নির্মাণ, সেতু নির্মাণ থেকে শুরু করে গ্রামীণ উন্নয়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি; স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল তৈরিসহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করে সরকার। মূলত রাজস্ব উদ্বৃত্ত ও দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে নেওয়া ঋণ নিয়ে উন্নয়ন বাজেট করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নামে একটি প্রকল্প খাত রয়েছে। এ খাতেই সাধারণত উন্নয়ন বাজেটের খরচ দেখানো হয়।

বাজেট তো দেশের মানুষের জন্য। কিন্তু অনেকেই বাজেট নিয়ে আগ্রহ দেখান না। অথচ সাধারণ মানুষেরও বাজেটের দিকে মনোযোগ বাড়ানো উচিত। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেটের কোন কোন দিকে নজর রাখবেন তাঁরা।

ক. মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য

বাজেটে পণ্যের ওপর শুল্ক বা কর বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। সুতরাং দাম বাড়বে, এমন কোনো কর বা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে কি না সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার সাধারণ নাগরিকদের।

খ. করনীতি ও করের বোঝা

বাজেটে নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান করের হার পরিবর্তন সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়াতে পারে। বাংলাদেশে বেতনভোগী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিরাই হচ্ছেন কর আদায়ের সহজ লক্ষ্যবস্তু। নতুন বাজেটে কাদের লক্ষ্য করে কর বা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেটা জানা গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং এদিকেও নজর থাকবে।

গ. কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব

এই সময়ের বড় সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগ মন্দায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম সৃষ্টি হচ্ছে। সুতরাং বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নতুন কোনো উদ্যোগ আছে কি না, সেটা দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ঘ. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ

সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে কখনোই পর্যাপ্ত বাজেট রাখা হয় না। নতুন বাজেটে এ দুই খাতে বাজেট বাড়ল না কমল, সেটাও জানা দরকার। কেননা এই খাতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলে সেবা উন্নত হবে, যা থেকে প্রত্যক্ষভাবে নাগরিকেরা উপকৃত হবেন।

ঙ. করমুক্ত আয়ের সীমা

টানা তিন বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ দেখছেন দেশের সাধারণ মানুষ। ফলে বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হলে কিছুটা স্বস্তি পাবে দেশের মানুষ। এতে ক্রয়ক্ষমতাও বাড়বে।

চ. উন্নয়ন প্রকল্প ও অবকাঠামো

নিজ এলাকায় রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ইত্যাদি অবকাঠামো খাতে নতুন কোনো প্রকল্প বা বরাদ্দ আছে কি না, সে বিষয়েও মানুষের আগ্রহ থাকবে।

ছ. ঋণ ও বাজেট–ঘাটতি

সরকার কি বাজেট–ঘাটতি পূরণের জন্য বেশি ঋণ নিচ্ছে—এ তথ্য জানা দরকার। ঋণ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বেশি নেওয়া হচ্ছে, নাকি বৈদেশিক ঋণ বেশি নিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ কতটা বাড়বে। এই চাপ অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

জ. স্বচ্ছতা

বাজেটের ব্যয় ও আয়ের হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে নাগরিকেরা বুঝতে পারেন তাঁদের করের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে। এতে সরকারের জবাবদিহিও নিশ্চিত হয়। সুতরাং বাজেট কতটা স্বচ্ছ, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বাজেট: রাষ্ট্র কোথা থেকে আয় করে, কোথায় ব্যয় করে

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:০৯:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ জুন ২০২৫

রাষ্ট্রের আয়ের কতকগুলো উৎস আছে। মূলত রাষ্ট্র নাগরিকদের কাছ থেকে নানাভাবে কর আদায় করে। এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়—প্রত্যক্ষ কর, পরোক্ষ কর ও করবহির্ভূত আয়। প্রত্যক্ষ করের মধ্যে আছে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর কর (করপোরেট কর), দান কর, উত্তরাধিকার কর, যানবাহন কর, মাদক শুল্ক, ভূমি রাজস্ব ইত্যাদি। আর পরোক্ষ কর হচ্ছে আমদানি কর, আবগারি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), সম্পূরক শুল্ক-এ রকম নানা ধরনের কর।

কর ছাড়া আরও আয় আছে। যেমন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের লাভ, সুদ, সাধারণ প্রশাসন থেকে আয়; ডাক, তার ও টেলিফোন থেকে আয়; পরিবহন আয়, জরিমানা ও দণ্ড থেকে আয়; ভাড়া, ইজারা, টোল ও লেভি থেকে আয় ইত্যাদি।

এর মানে একটি দেশের ক্ষেত্রে বাজেট হচ্ছে সেই দেশের জনসাধারণের দেওয়া নানা রকম ট্যাক্স বা কর হিসেবে বা পাওয়া যাবে ও করের বাইরে থেকে যা পাওয়া যাবে, এসব মিলিয়ে একটা সম্ভাব্য আয়ের পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন ও চলতি (রাজস্ব) খাতে ওই আয় খরচ করার একটি বার্ষিক হিসাব।

সরকারের ব্যয় দুই রকম। একটি অনুন্নয়ন বা রাজস্ব ব্যয়। এটি হচ্ছে সরকার পরিচালনার খরচ। এই অনুন্নয়ন ব্যয় মোটাদাগে তিনটি—দেশরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রশাসন চালানোর খরচ। বাংলাদেশ একটি কল্যাণরাষ্ট্র নয়। তারপরও বাজেটে একটি মানবিক চেহারা দেওয়ার চেষ্টা থাকে। এ জন্য নানা ধরনের সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। আবার কৃষি ও জ্বালানি খাতে সরকার ভর্তুকি দেয়। এরও ব্যয় আছে।

দেশ পরিচালনায় যত ধরনের ব্যয় আছে, তা পূরণ করে আয়ের বাকি অর্থ দিয়ে সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা অর্থই উন্নয়ন বাজেট। এই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। রাস্তা নির্মাণ, সেতু নির্মাণ থেকে শুরু করে গ্রামীণ উন্নয়ন, বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি; স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল তৈরিসহ নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ করে সরকার। মূলত রাজস্ব উদ্বৃত্ত ও দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে নেওয়া ঋণ নিয়ে উন্নয়ন বাজেট করা হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নামে একটি প্রকল্প খাত রয়েছে। এ খাতেই সাধারণত উন্নয়ন বাজেটের খরচ দেখানো হয়।

বাজেট তো দেশের মানুষের জন্য। কিন্তু অনেকেই বাজেট নিয়ে আগ্রহ দেখান না। অথচ সাধারণ মানুষেরও বাজেটের দিকে মনোযোগ বাড়ানো উচিত। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, বাজেটের কোন কোন দিকে নজর রাখবেন তাঁরা।

ক. মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য

বাজেটে পণ্যের ওপর শুল্ক বা কর বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলে। সুতরাং দাম বাড়বে, এমন কোনো কর বা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে কি না সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার সাধারণ নাগরিকদের।

খ. করনীতি ও করের বোঝা

বাজেটে নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান করের হার পরিবর্তন সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়াতে পারে। বাংলাদেশে বেতনভোগী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিরাই হচ্ছেন কর আদায়ের সহজ লক্ষ্যবস্তু। নতুন বাজেটে কাদের লক্ষ্য করে কর বা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেটা জানা গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং এদিকেও নজর থাকবে।

গ. কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব

এই সময়ের বড় সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগ মন্দায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম সৃষ্টি হচ্ছে। সুতরাং বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নতুন কোনো উদ্যোগ আছে কি না, সেটা দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

ঘ. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ

সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে কখনোই পর্যাপ্ত বাজেট রাখা হয় না। নতুন বাজেটে এ দুই খাতে বাজেট বাড়ল না কমল, সেটাও জানা দরকার। কেননা এই খাতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলে সেবা উন্নত হবে, যা থেকে প্রত্যক্ষভাবে নাগরিকেরা উপকৃত হবেন।

ঙ. করমুক্ত আয়ের সীমা

টানা তিন বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ দেখছেন দেশের সাধারণ মানুষ। ফলে বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হলে কিছুটা স্বস্তি পাবে দেশের মানুষ। এতে ক্রয়ক্ষমতাও বাড়বে।

চ. উন্নয়ন প্রকল্প ও অবকাঠামো

নিজ এলাকায় রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ইত্যাদি অবকাঠামো খাতে নতুন কোনো প্রকল্প বা বরাদ্দ আছে কি না, সে বিষয়েও মানুষের আগ্রহ থাকবে।

ছ. ঋণ ও বাজেট–ঘাটতি

সরকার কি বাজেট–ঘাটতি পূরণের জন্য বেশি ঋণ নিচ্ছে—এ তথ্য জানা দরকার। ঋণ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বেশি নেওয়া হচ্ছে, নাকি বৈদেশিক ঋণ বেশি নিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ কতটা বাড়বে। এই চাপ অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

জ. স্বচ্ছতা

বাজেটের ব্যয় ও আয়ের হিসাব স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে নাগরিকেরা বুঝতে পারেন তাঁদের করের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে। এতে সরকারের জবাবদিহিও নিশ্চিত হয়। সুতরাং বাজেট কতটা স্বচ্ছ, সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।