হামের দাপট ৫৬ জেলায়: অদৃশ্য আতঙ্কে মানুষ
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৫৫:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ এপ্রিল ২০২৬ ৫৬ বার পড়া হয়েছে
সকালবেলা সন্তানের কপালে হাত রাখতেই মায়ের বুক কেঁপে ওঠে—জ্বরটা কি একটু বেশি? শরীরে লালচে দাগগুলো কি শুধু গরমের জন্য, নাকি অন্য কিছু? এমন অজানা শঙ্কা এখন যেন দেশের অসংখ্য পরিবারের নিত্যসঙ্গী।
একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রোগ আবারও নতুন করে চোখ রাঙাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশুরা—যাদের প্রতিটি হাসি এখন লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য আতঙ্কের আড়ালে।
গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে বাড়ছে ভিড়, উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠছে বাতাস। কেউ কোলে করে নিয়ে আসছেন জ্বরে কাঁপতে থাকা সন্তানকে, কেউ আবার অপেক্ষা করছেন একটি ভালো খবরের জন্য।
দেশের ৫৬ জেলায় হাম ছড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয় এ তথ্য লিখিতভাবে জানিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, হামে আক্রান্ত শিশুদের ৬৯ শতাংশের বয়স ২ বছরের নিচে, ৩৪ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক এ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১৯০ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ৬৭৬ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংক্রমণ ছড়িয়েছে ৫৬টি জেলায়। রাঙামাটি, বাগেরহাট, মেহেরপুর, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও বান্দারবান—এই আট জেলায় হাম ধরা পড়েনি।
জাতীয় পর্যায়ে সংক্রমণের হার প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় বর্তমানে প্রায় ১৬ দশমিক ৮, যা একটি দেশব্যাপী বিস্তারের স্পষ্ট ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশের পরিস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভা কার্যালয়কে ১৮ মার্চ জানিয়েছে ঢাকা কার্যালয়।
বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এ সংক্রমণের মূল কারণ হলো রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা, যারা গত দুই বছরে বিভিন্ন কারণে হামের টিকার এক বা একাধিক ডোজ পায়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশই দুই বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৪ শতাংশ, যা এই কনিষ্ঠতম জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ সংবেদনশীলতা নির্দেশ করে।
যদিও সংক্রমণ ৫৬টি জেলায় ছড়িয়েছে। তবে কিছু এলাকা এখন সংক্রমণের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে। বেশ কিছু জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকা সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম কোনো সাধারণ জ্বর নয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই শুরুতে বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না—ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকা নেওয়াই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
তবে এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় লড়াইটা লড়ছেন অভিভাবকরাই। সন্তানের ছোট্ট একটি কাশি বা জ্বরও এখন তাদের কাছে বড় আতঙ্কের কারণ।
হাম শুধু একটি রোগ নয়—এটি এখন এক ধরনের মানসিক চাপও তৈরি করছে পরিবারগুলোর মধ্যে। প্রতিটি দিন যেন নতুন করে উদ্বেগ নিয়ে শুরু হচ্ছে, আর শেষ হচ্ছে প্রার্থনায়—“সন্তানটা যেন সুস্থ থাকে।”
সব চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল
দেশে শিশুদের মধ্যে হামজনিত নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ায় সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) জারি করা এক অফিস আদেশে জানানো হয়, অর্জিত ও নৈমিত্তিকসহ সব ছুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে অধিদপ্তরসহ অধীনস্থ সব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ছুটি আপাতত কার্যকর থাকবে না।
হামে আরও ৩ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৯৪৭
দেশে হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৪৭ জন।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৪২ জন, তবে এ সময়ে নিশ্চিত কোনো মৃত্যু হয়নি।
এ ছাড়া সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৯৪৭ জন এবং মৃত্যু হয়েছে তিনজনের।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭১ জন। একই সময়ে সন্দেহজনক আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৭৯২। এ সময় নিশ্চিতভাবে ৯ জন এবং সন্দেহজনক হামে ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে, একই সময়ে মোট ২ হাজার ৫২৭ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।





















