পাহাড়ে সংকুচিত বন্য প্রাণীর আবাস: হুমকিতে জীববৈচিত্র্য
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, পাহাড়ি বনভূমি ও ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই জীববৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় একসময় ছিল অসংখ্য বন্য প্রাণীর বিচরণ।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের কারণে এসব অঞ্চলে বন্য প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে পার্বত্যাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এখন স্পষ্টভাবে হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
আবাসস্থল সংকুচিত, বিপন্ন হচ্ছে প্রজাতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি, জলাভূমি ও পাহাড়ি ছড়া—এই তিন ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশই বহু বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। এসব পরিবেশে বাঘ, হাতি, শজারু, লজ্জাবতী বানর, হনুমান, উল্লুক, শকুন, চিতাবাঘ, অজগরসহ নানা প্রজাতির প্রাণীর বসবাস ছিল।
কিন্তু বনভূমি উজাড়, পাহাড় কাটার প্রবণতা, কৃষি সম্প্রসারণ এবং বসতি স্থাপনের কারণে এসব প্রাণীর আবাসস্থল দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক প্রজাতি ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে, আবার কিছু প্রজাতি ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আইইউসিএনের তথ্য কী বলছে
প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-এর গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে অন্তত ৩১টি প্রাণীর প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সংস্থাটির হিসাব বলছে, দেশে প্রায় ১,৬০০ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৩৯০টি প্রজাতি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর তালিকায় রয়েছে আমুর চিতাবাঘ, গণ্ডার, ওরাংওটান, গরিলা, সাওলা, সুন্দা বাঘ, ইয়াংজি ফিনলেস পোরপোইস, কচ্ছপ ও হাতির মতো প্রাণীও।
স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণ
পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের মতে, একসময় পার্বত্য অঞ্চলে বাঘ, হরিণ, চিতা সহ নানা ধরনের বন্য প্রাণী সহজেই দেখা যেত। এখন সেসব প্রাণীর অনেকগুলোই আর দেখা যায় না।
স্থানীয়দের দাবি, নির্বিচারে বনভূমি উজাড়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং পাহাড়ে অনিয়ন্ত্রিত চাষাবাদের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
পরিবেশকর্মীদের সতর্কবার্তা
প্রকৃতি ও জীবন সংগঠনের সংগঠক সাংবাদিক আরমান খান বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে মানুষ নির্বিচারে বন উজাড় করছে। এতে শুধু বনই নয়, বহু বন্য প্রাণীর অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ছে।
তার মতে, বন্য প্রাণী সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা এবং তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
বন ধ্বংসে নতুন হুমকি
ব্যক্তিগত উদ্যোগে বন সৃষ্টি ও বন্য প্রাণী রক্ষায় কাজ করা মাহফুজ রাসেল বলেন, পার্বত্যাঞ্চল একসময় বন্য প্রাণীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল।
কিন্তু বর্তমানে পাহাড়ে বিভিন্ন চাষাবাদ, বিশেষ করে কাসাভা ও অন্যান্য বাণিজ্যিক ফসলের চাষের জন্য গাছ কাটা, পাহাড়ি ছড়া ও নদী ভরাট করা এবং মাটির উর্বর স্তর নষ্ট হওয়ার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বন্য প্রাণীর অস্তিত্বের ওপর।
বন বিভাগের অবস্থান
বাংলাদেশ বন বিভাগ-এর রাঙামাটি জুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. তবিবুর রহমান জানান, বন্য প্রাণী সংরক্ষণে বন বিভাগ নিয়মিত কাজ করছে।
তিনি বলেন, শিকারিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা প্রাণীগুলোকে পুনরায় বনে অবমুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া কেউ বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সচেতনতার প্রয়োজন
পরিবেশবিদদের মতে, শুধুমাত্র দিবস পালনের মাধ্যমে বন্য প্রাণী রক্ষা সম্ভব নয়। বনভূমি সংরক্ষণ, অবৈধ শিকার বন্ধ, ক্ষতিকর তামাক চাষ ও ইটভাটার দূষণ নিয়ন্ত্রণ—এসব কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
উল্লেখ্য, বিপন্ন বন্য প্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতে জাতিসংঘের ৬৮তম সাধারণ অধিবেশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর ৩ মার্চ বিশ্বব্যাপী বিশ্ব বন্য প্রাণী দিবস পালিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের বন ও বন্য প্রাণীকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।





















