ঢাকা ১১:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধের উত্তাপে জ্বালানি ঝুঁকি: চাপের মুখে বাংলাদেশ?

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:১০:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকেও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আসে আমদানির মাধ্যমে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং এলপি গ্যাসের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রতি বছর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। পাশাপাশি কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল সরকার।

তবে চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই রুট দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এখানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যেখানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রায় ৬৭ ডলার, তা এখন বেড়ে প্রায় ৭৬ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে দেশের বাজারে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

এরই মধ্যে দেশের জ্বালানি মজুত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১৪ দিনের, পেট্রোলের ১৫ দিনের এবং অকটেনের প্রায় ২৮ দিনের। যদিও ফার্নেস তেলের মজুত প্রায় ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েল রয়েছে প্রায় ৫৫ দিনের। তবে এলএনজি সংরক্ষণের স্থায়ী অবকাঠামো না থাকায় এই জ্বালানির বড় কোনো মজুত রাখা সম্ভব হয় না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেইনের মতে, বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির বড় অংশই হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা প্রয়োজন ছিল।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকট দীর্ঘ হলে বর্তমান সরবরাহকারী দেশগুলোর কাছ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন উৎসের সন্ধানও করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তবে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্পখাতেও চাপ বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই পড়বে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

যুদ্ধের উত্তাপে জ্বালানি ঝুঁকি: চাপের মুখে বাংলাদেশ?

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:১০:০৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে বাড়তে থাকা সামরিক উত্তেজনা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকেও নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আসে আমদানির মাধ্যমে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং এলপি গ্যাসের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন প্রতি বছর সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। পাশাপাশি কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল সরকার।

তবে চলমান উত্তেজনার কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই রুট দিয়ে পরিবহন হয়। ফলে এখানে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যেখানে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রায় ৬৭ ডলার, তা এখন বেড়ে প্রায় ৭৬ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে দেশের বাজারে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

এরই মধ্যে দেশের জ্বালানি মজুত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে প্রায় ১৪ দিনের, পেট্রোলের ১৫ দিনের এবং অকটেনের প্রায় ২৮ দিনের। যদিও ফার্নেস তেলের মজুত প্রায় ৯৩ দিনের এবং জেট ফুয়েল রয়েছে প্রায় ৫৫ দিনের। তবে এলএনজি সংরক্ষণের স্থায়ী অবকাঠামো না থাকায় এই জ্বালানির বড় কোনো মজুত রাখা সম্ভব হয় না।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেইনের মতে, বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির বড় অংশই হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকা প্রয়োজন ছিল।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংকট দীর্ঘ হলে বর্তমান সরবরাহকারী দেশগুলোর কাছ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন উৎসের সন্ধানও করা হবে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলতে থাকে, তবে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্পখাতেও চাপ বাড়তে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই পড়বে।