ঢাকা ০৫:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিএনপির ইশতেহারে ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:১৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সময়কাল নয়, বরং একটি চলমান রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রক্রিয়া—এমন ব্যাখ্যাই তুলে ধরেছে বিএনপি। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দলটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭৫-এর সিপাহী-জনতার বিপ্লব, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একই ঐতিহাসিক ধারায় যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে বিএনপি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকাকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

ইশতেহারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে “গণতন্ত্র রক্ষার সর্বশেষ অধ্যায়” হিসেবে উপস্থাপন করা শুধু অতীত স্মরণ নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপরিচালনার নৈতিক ভিত্তি নির্মাণের একটি কৌশলও। শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি আন্দোলন-নির্ভর রাজনীতিকে সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার বার্তা দিয়েছে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের ওপর জোর। দীর্ঘদিন ধরে শহীদ তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিএনপির এই অবস্থান ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি দূর করার অঙ্গীকার বিদ্যমান কাঠামোর সমালোচনাকেই ইঙ্গিত করে।

ইশতেহারে শিক্ষা কারিকুলামে “প্রকৃত ইতিহাস” অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিএনপি সরাসরি ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলেছে। এটি কেবল শিক্ষানীতি নয়, বরং রাজনৈতিক বয়ান পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কারণ ইতিহাসের ব্যাখ্যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনা গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।

এদিকে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন—বধ্যভূমি ও গণকবর সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণের ঘোষণা বিএনপির স্মৃতি-রাজনীতির কৌশলকে স্পষ্ট করে। এতে অতীতের আত্মত্যাগকে দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে রূপ দেওয়ার প্রয়াস রয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাব হলো, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের জন্য পৃথক বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা। এটি বাস্তবায়িত হলে জুলাই আন্দোলন প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হবে, যা রাজনৈতিকভাবে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সার্বিকভাবে, বিএনপির ইশতেহার মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানকে কেবল স্মৃতির জায়গায় সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব এবং ক্ষমতায় গেলে দলটি কতটা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

বিএনপির ইশতেহারে ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার বার্তা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৪:১৭:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সময়কাল নয়, বরং একটি চলমান রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রক্রিয়া—এমন ব্যাখ্যাই তুলে ধরেছে বিএনপি। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে দলটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭৫-এর সিপাহী-জনতার বিপ্লব, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একই ঐতিহাসিক ধারায় যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে বিএনপি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকাকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে চেয়েছে।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

ইশতেহারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে “গণতন্ত্র রক্ষার সর্বশেষ অধ্যায়” হিসেবে উপস্থাপন করা শুধু অতীত স্মরণ নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপরিচালনার নৈতিক ভিত্তি নির্মাণের একটি কৌশলও। শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আর্থিক সহায়তা এবং পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি আন্দোলন-নির্ভর রাজনীতিকে সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করার বার্তা দিয়েছে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের ওপর জোর। দীর্ঘদিন ধরে শহীদ তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বিএনপির এই অবস্থান ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি দূর করার অঙ্গীকার বিদ্যমান কাঠামোর সমালোচনাকেই ইঙ্গিত করে।

ইশতেহারে শিক্ষা কারিকুলামে “প্রকৃত ইতিহাস” অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিএনপি সরাসরি ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলেছে। এটি কেবল শিক্ষানীতি নয়, বরং রাজনৈতিক বয়ান পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কারণ ইতিহাসের ব্যাখ্যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনা গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।

এদিকে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন—বধ্যভূমি ও গণকবর সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণের ঘোষণা বিএনপির স্মৃতি-রাজনীতির কৌশলকে স্পষ্ট করে। এতে অতীতের আত্মত্যাগকে দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে রূপ দেওয়ার প্রয়াস রয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাব হলো, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের জন্য পৃথক বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা। এটি বাস্তবায়িত হলে জুলাই আন্দোলন প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হবে, যা রাজনৈতিকভাবে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সার্বিকভাবে, বিএনপির ইশতেহার মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানকে কেবল স্মৃতির জায়গায় সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত ভিত্তি হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব এবং ক্ষমতায় গেলে দলটি কতটা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।