স্বৈরাচার পতনের পরও বহাল ‘ব্যাংকিং খাতে, সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন ঘিরে প্রশ্ন
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১১:৪৫:৪২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬ ১৮৯ বার পড়া হয়েছে
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রীয় ও আর্থিক খাতে সংস্কারের আলোচনা জোরালো হলেও এখনো কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির অবস্থান অটুট রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে এমনই এক আলোচিত নাম সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন। তৃতীয় দফায় তাকে এমডি হিসেবে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত ঘিরে ব্যাংকিং খাতের ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
আরও পড়ুন : আওয়ামী ফ্যাসিস্টমুক্ত হয়নি ব্যাংকপাড়া, বহাল তবিয়তে সিটি ব্যংকের এমডি মাসরুর
ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যেও মাসরুর আরেফিন ছিলেন ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী একটি গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিয়োগ বাণিজ্য, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং অনিয়ম ঢাকতে কর্পোরেট ডোনেশনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়াই তাকে আরও তিন বছরের জন্য এমডি নিয়োগ দেওয়ায় আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনিয়ম-দুর্নীতির আরও বিশদ খবর থাকছে আগামী পর্বে।
ব্যাংকিং খাতের ক্ষয় ও ‘বিশেষ কর্মকর্তাদের’ উত্থান
বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনে দেশের ব্যাংকিং খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজনৈতিকভাবে অনুগত শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেছে নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, মাসরুর আরেফিন ছিলেন সেই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মুখ।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যখন ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের দাবি উঠছে, ঠিক তখনই তাকে তৃতীয় দফায় এমডি হিসেবে বহাল রাখাকে অনেকেই ‘পুরনো ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা’ হিসেবে দেখছেন।
পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
সিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়েও রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। গত দেড় দশকে ব্যাংকটির বোর্ডে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের একচেটিয়া উপস্থিতি ছিল বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন :সিটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক সিজনের কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ
সাম্প্রতিক সময়ে আজিজ আল কায়সার টিটুকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও তার আগেই আগের বোর্ড মাসরুর আরেফিনকে নতুন করে তিন বছরের জন্য এমডি নিয়োগ দেয়। পরে আনোয়ার গ্রুপের হোসেন খালেদ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন—যা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
ক্ষমতার উৎস ও অভিযোগের বিস্তার
ব্যাংকিং খাতের একটি অংশের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়াই ছিল মাসরুর আরেফিনের মূল শক্তি। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি ব্যাংকের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
অনুসন্ধানী সূত্রগুলো বলছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে তিনি বিভিন্ন সময়ে বই প্রকাশ, কর্পোরেট আয়োজন ও ডোনেশনের মাধ্যমে নিজেকে অনুগত হিসেবে উপস্থাপন করতেন। আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আরও পড়ুন :বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে জমি কিনে ভবন করছে সিটি ব্যাংক, এমডির কারসাজি
এমনকি ব্যাংকটিকে দলীয় ডোনার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। এসব ব্যয়ের অর্থ এসেছে সাধারণ মানুষের আমানত থেকেই—এমন অভিযোগও রয়েছে। সে সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা আছে।
নিরাপত্তা ও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা
কিছু মহলের দাবি, মাসরুর আরেফিনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট শুধু ব্যাংকিং অনিয়মেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক পলায়নকারী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগসহ রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
মন্তব্য দিতে অনিচ্ছা
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার দপ্তর থেকে জানানো হয়, বিষয়গুলো তদন্তাধীন থাকায় এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
ব্যাংকিং খাত সংস্কারের কথা যখন সর্বত্র আলোচিত, তখন এমন বিতর্কিত অভিযোগের মুখে থাকা একজন কর্মকর্তার পুনর্নিয়োগ কী বার্তা দেয়—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে আর্থিক খাতজুড়ে। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার উত্তর খুঁজছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদক যা বললো
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক কর্মকর্তা বলেন, সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।



















