সিন্ডিকেট ভাঙতে ব্যর্থ সরকার, দামে দামে ভোগান্তি
লুটপাটে ‘এলপিজি সিন্ডিকেট’
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৩৭:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারী ২০২৬ ৮৫ বার পড়া হয়েছে
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও কৃত্রিম সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। তিন দিনের বেশি সময় ধরে চলমান এই সংকটের সুযোগে খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে আদায় করা হচ্ছে ইচ্ছেমতো দাম। অথচ বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট দমনে সরকার বা প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
ভোক্তাদের অভিযোগ, একটি শক্তিশালী এলপিজি সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ইউনূস সরকারের পক্ষ থেকে এই লুটপাট ঠেকাতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। এতে বাজারে নজিরবিহীন অরাজকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ডিসেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে ১ হাজার ২৫৩ টাকা। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই বাজারে। বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় একই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। কোথাও কোথাও সংকটের অজুহাতে দাম নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত।
ঢাকার মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, মিরপুর, কল্যাণপুর, কাজীপাড়া ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ কম থাকায় খুচরা বিক্রেতারা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন। অনেক দোকানে আবার সিলিন্ডারই নেই, ফলে এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফজল হোসেন বলেন, “সবসময়ই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছু বেশি দিতে হয়। কিন্তু এবার পুরো এলাকা ঘুরে এক জায়গায় সিলিন্ডার পেলাম ১ হাজার ৯০০ টাকায়। এই অরাজকতার দায় কে নেবে?”
একই এলাকার গৃহিনী শামসুন্নাহার বলেন, “অতিরিক্ত দামের পাশাপাশি মরচে ধরা সিলিন্ডার নিয়ে ভয় কাজ করে। কিন্তু রান্না বন্ধ রাখা যায় না।”
রামপুরার বাসিন্দা মো. আরিফ জানান, গত দুদিনে ১ হাজার ৮০০ টাকার কমে কোথাও সিলিন্ডার পাননি। শেষ পর্যন্ত মালিবাগ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় কিনতে হয়েছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সমস্যার শুরু পরিবেশক পর্যায় থেকেই। পাইকারি বাজারে সিলিন্ডার কম, আবার বেশি দামে কিনতে হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ছে। রামপুরার এক ব্যবসায়ী জানান, এখন তাদেরই ১২ কেজি সিলিন্ডার কিনতে ১ হাজার ৫২০ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। পরিবহন যোগ করলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা অসম্ভব।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, শীতকালে বিশ্ববাজারে চাহিদা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু জাহাজ সংকটে পড়ায় ডিসেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ফলে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তবে এলপিজি ব্যবসায়ী ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদের দাবি, তারা পরিবেশকদের কাছে বিইআরসি নির্ধারিত দামেই এলপিজি সরবরাহ করছেন। খুচরা পর্যায়ের অতিরিক্ত দামের দায় তারা নিচ্ছেন না। তার এই বক্তব্যেই সিন্ডিকেটের কারসাজির ইঙ্গিত মিলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খুচরা ব্যবসায়ী বলেন, “সিন্ডিকেট না থাকলে এমন সংকট হতো না। আগে কখনো এভাবে সিলিন্ডার উধাও হয়ে যায়নি।”
এলপিজি সিলিন্ডার পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান বলেন, “সরবরাহ কিছুটা কম হলেও ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি নেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।”
ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে এই অনিয়ম বন্ধ করা যাচ্ছে না।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, “সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিইআরসি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ভোক্তাদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।”
বিইআরসি জানিয়েছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আমদানি ব্যয় বাড়লে কোম্পানিগুলো প্রমাণসহ তথ্য দিলে মূল্য সমন্বয় বিবেচনা করা হবে। এর আগে বাড়তি দামে বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।
এলপিজির পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাইপলাইন গ্যাসেও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানায়, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় আবাসিক গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে সর্বোচ্চ ২৫০ কোটি ঘনফুট।
সব মিলিয়ে এলপিজি ও গ্যাস সংকট সিন্ডিকেটনির্ভর লুটপাটে রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন ভোক্তারা। বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুত কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবার।






















