আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
আরাকান আর্মি ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:৪০:০১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ জুন ২০২৫ ১৪১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। তবে আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে মিয়ানমার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। একই সাথে আমরা মিয়ানমার সরকার, জনগণ, রাজনৈতিক দল এবং তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারনা পাচ্ছি। প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে আমাদের এই উদাসীনতার ফল এখন আমরা বেশ ভালভাবে টের পাচ্ছি। আমাদের পাশেই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য, এই রাজ্যের ১৭ টা শহরতলীর মধ্যে ১৪ টা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। মিয়ানমার সেনাবাহিনী রাজধানী সিতওয়ে, বন্দরনগরী চকপিউ এবং মানাউং, এই তিনটি শহর নিয়ন্ত্রণ করছে।
রাখাইন রাজ্যটি ভুকৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাখাইনে আঞ্চলিক দুই শক্তিধর রাষ্ট্র চীন এবং ভারতের স্বার্থ রয়েছে। দুটি দেশই মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সাথে তাদের স্বার্থ নিশ্চিতে যোগাযোগ রক্ষা করছে। মিয়ানমার সৃষ্ট রোহিঙ্গা সমস্যার চাপ বাংলাদেশ বহন করে চললেও মিয়ানমার জান্তা সরকার এবং আরাকান আর্মির সাথে এই সংকট সমাধানে বিগত বছরগুলোতে তেমন কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পারেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরই এই সংকট সমাধানের প্রক্রিয়া গতি পায় এবং এ বিষয়ে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২০১৭ সালে নির্মম অত্যাচার করে রোহিঙ্গাদেরকে তাদের বাসভূমি থেকে উৎখাত করেছিল। সেসময় আরাকান আর্মি ও স্থানীয় রাখাইনদের অনেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে এই নৃশংস অভিযানে অংশ নিয়েছিল। বর্তমানে রাখাইনের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত উত্তর আরাকানের পুরোটাই আরাকান আর্মির দখলে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর যেকোনো বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগে আরাকান আর্মির সহায়তা দরকার হবে। সম্প্রতি মিয়ানমার জান্তা ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিবে বলে জানিয়েছে। যেহেতু আরাকান আর মিয়ানমার আর্মির নিয়ন্ত্রণে নেই, তখন মিয়ানমার আর্মি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। চলমান পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মির সম্মতি ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো বাস্তবসম্মত হবে না।
২০২২ সালে আরাকান আর্মি প্রধান তোয়ান মারত নাইং বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও ইতিবাচক মতামত দেয়। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আরাকান আর্মি বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানায়, সে সময় বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে কোনো সাড়া দেয়নি। মিয়ানমারের ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্মেন্টের (এনইউজি) পক্ষ থেকেও ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের ঘোষণায় বলা হয় যে, তারা ক্ষমতায় গেলে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেবে। রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আরাকান আর্মি ও এনইউজির সেই ঘোষণার প্রেক্ষাপট বদলে গেছে।
আরাকান আর্মি ও বাংলাদেশের মধ্যেকার সাম্প্রতিক ঘটনাবলীঃ
আরাকান আর্মির সাথে সংঘর্ষের সময় মিয়ানমার আর্মি রাখাইনের রাজধানী সিতওয়েসহ বিভিন্ন এলাকার ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গাদের অস্ত্রের মুখে জোর করে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বাধ্য করে। মিয়ানমার জান্তা রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন না করে এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আরাকান আর্মিকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে। রাখাইনে বছরব্যাপী চলা যুদ্ধে আরসা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে ও জান্তা সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আরসাকে সহযোগিতার জন্য রোহিঙ্গাদের অভিযুক্ত করে আসছে আরাকান আর্মি। রাখাইন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে আসার পর তারা রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, ধ্বংস এবং অত্যাচার-নির্যাতন চালাচ্ছে। তাদের আক্রমন ও অত্যাচারের কারনে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে।
সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ‘রোহিঙ্গা শব্দটি নিষিদ্ধ করতে চাচ্ছে আরাকান আর্মি। ১৩ এপ্রিল আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সরকারকে সাতটি শর্ত দিয়ে যে চিঠি পাঠিয়েছে, সেখানে তারা রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশের মুসলিম শরণার্থী হিসেবে উল্লেখ করেছে। আরাকান আর্মি বাংলাদেশে সক্রিয় তিন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা, আরএসও, এআরএ কে নিষ্ক্রিয় করতে বলেছে, যা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করে তুলবে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপ, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সদিচ্ছার প্রয়োজন।
আরাকান আর্মি রাখাইনে তাদের অবস্থান সংহত করার পর নাফ নদীতে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে পাঁচ মাসে আরাকান আর্মি নাফ নদী ও তৎসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির সদস্যরা জেলেদের ট্রলারসহ ধরে নিয়ে যায়।
পরবর্তীতে বি জি বি তাদেরকে ফেরত আনলেও নাফ নদীর জলসীমায় আরাকান আর্মির টহল তৎপরতা বেড়ে যাওয়াতে টেকনাফের প্রায় তিন হাজার জেলেনাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছে। রাখাইন রাজ্য জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদলিপি ও পতাকা বৈঠক করা যেত, এখন আরাকান আর্মির কাছে রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না। আরাকান আর্মির বাধার কারনে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন বন্দর থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরের গত ৩ মাস ধরে পণ্য আমদানি বন্ধ। আমদানি কারকরা জানায় যে ইয়াঙ্গুন থেকে পণ্য আমদানি করতে হলে তাদেরকে আরাকান আর্মিকেও ট্যাক্স দিতে হবে। রাখাইনের সংঘর্ষের কারনে সীমান্ত-বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে, এতে বন্দরের ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই সাথে বাংলাদেশ সরকারও বিপুল পরিমান রাজস্ব হারাচ্ছে।
২০২৪ সালের ১৪ জানুয়ারি আরাকান আর্মি মিয়ানমারের চিন প্রদেশের পালেতোয়া শহর এবং বাংলাদেশ সংলগ্ন ৮০ কিলোমিটার বিস্তৃত সীমান্ত এবং ভারতের সাথে গুরুত্বপূর্ণ একটি বাণিজ্যিক করিডোরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ১৬ ও ১৭ এপ্রিল আরাকান আর্মির সদস্যরা বাংলাদেশের ভেতরে জলকেলি উৎসবে যোগ দিতে এসেছে মর্মে খবর প্রকাশিত হয়। বিজিবি, নিরাপত্তাবাহিনী ও প্রশাসনের চাপের মুখে তারা ২০ এপ্রিল থানচি উপজেলার রেমাক্রি, তিন্দুসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সাঙ্গু নদীপথে সীমান্তের ওপারে চিন রাজ্যের লাবওয়া এবং পার্শ্ববর্তী তুপুই ক্যাম্পে চলে যায়। তবে ওই উৎসবে আরাকান আর্মির কোনো সশস্ত্র সদস্য ছিল না বলে জানিয়েছে বিজিবি।
আরাকান আর্মির সাথে ভারত ও চীনের সম্পৃক্ততাঃ ১৯৯৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী মিলিতভাবে রাখাইনের বিদ্রোহী সংগঠন ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি অব আরাকানের সামরিক শাখার প্রধান খাইং রাজা এবং এর দলের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অপারেশন লিচ নামে এক অভিযান পরিচালনা করে এতে খাইং রাজা সহ ছয় নেতা মৃত্যুবরন করে। পরবর্তীতে, ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী মিলে আরাকান আর্মি এবং ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড-খাপলাং নামে আরেকটি সংগঠনকে নিস্ক্রিয় করতে এক যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। এসব কারনে আরাকান আর্মি ভারতের প্রতি ২৬ বছর ধরে বিরোধপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে আসছিল। একই সাথে ভারতও আরাকান আর্মিকে কৌশলগত কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্টের জন্য নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে এবং দুইপক্ষের মধ্যে বেশ কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে বলেও জানা যায়। ভারত সম্প্রতিক বাস্তবতা ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ বাড়িয়েছে এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে কালাদান প্রজেক্ট রক্ষার অঙ্গীকার আদায় করে নিয়েছে। এ প্রজেক্ট বাস্তবায়নে ভারত আরাকান আর্মিকে রাখাইনের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সহায়তা এবং মিজোরাম থেকে রাখাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। আরাকান আর্মি বোঝাতে পেরেছে যে, রাখাইন অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরাকান আর্মির সাথে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়ন আবশ্যক।
চীনও আরাকান আর্মির সাথে তাদের সম্পর্ককে গুরুত্বের সাথে দেখে। আরাকান আর্মি রাখাইনের চকপিউ থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত তেল ও গ্যাস পাইপলাইনের সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছে। এছাড়াও চীন চকপিউতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও ভারত—এ দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় তোয়ান মারত নাইংয়ের মূল কৌশল হলো ভারসাম্য রক্ষা ও কোনো এক পক্ষের ওপর নির্ভর না হয়ে রাখাইন রাজ্যের স্বার্থে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নেয়া। চীন ও ভারত তাদের নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণে মিয়ানমার জান্তা সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। বাংলাদেশকে ও নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে।
আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশের প্রত্যাশাঃ আরাকান আর্মি প্রধান তোয়ান মারত নাইং এর দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারনে উত্তর ও দক্ষিণ আরাকানের জনগনের মধ্যেকার বিভেদ দূর হয়েছে এবং ইউনাইটেড লীগ অফ আরাকান আরাকানের শক্তিশালী এবং একমাত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। আরাকান আর্মির প্রধান মেজর জেনারেল তোয়ান মারত নাইং মনে করেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই একটা জাতি, তবে তারা বাঙালি। সম্প্রতি রোহিঙ্গারা আরাকান আর্মির বিপক্ষে অস্ত্র তুলে নেয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। তাঁর নেতৃত্বে রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যেকার বিরোধ মেটানো সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। এর ফলে আরাকান আর্মি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং তোয়ান মারত নাইং আরাকানের সর্বজন স্বীকৃত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আরাকান আর্মির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক সুবিধা পেতে পারে। বহিঃবিশ্বের সাথে রাখাইনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুটি পথ হচ্ছে বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগর। ভবিষ্যতে রাখাইন রাজ্যকে অনেকটাই বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে। মিয়ানমার জান্তা রাখাইনে মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ড থেকে সরবরাহ বন্ধ করে দিলে রাখাইনে সরবরাহ ও লজিস্টিক সংকট সৃষ্টি হবে। বিকল্প হিসেবে ভারতের মিজোরাম রাজ্যের জো খা ও থার এবং মিয়ানমারের চিন রাজ্যের রি খাও দার দিয়ে কিছু সরবরাহ আসতে পারে। ভারতের এই রাজ্যগুলোতে পর্যাপ্ত সরবরাহ চালু রাখতে কালাদান মাল্টি মোডাল ট্রানজিট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে আরাকান আর্মি আরও দ্রুত সরবরাহ ও সহায়তা পেতে পারে।
আরাকান আর্মির সদস্য কিংবা মিয়ানমারের বাসিন্দারা যেন অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম না করে সে বিষয়ে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত আরাকান আর্মির সদস্যদেরকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা সীমান্তের ব্যবস্থাপনা উন্নত করার চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশের জলসীমায় অবৈধ ভাবে অনুপ্রবেশ করে বাংলাদেশের জেলেদের সাথে হয়রানিমূলক আচরণ বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জনপদে আক্রমণ বা উস্কানিমুলক আচরনের মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণ না হয়। আরাকান আর্মিকে অবিলম্বে রোহিঙ্গা নিধন বন্ধ করতে হবে তা না হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মত তারাও বিচারের সম্মুখীন হতে পারে। ছোট এই রাখাইন রাজ্যে তাদের অবস্থান নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও সহায়তা জরুরী। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ও শাসনকার্য পরিচালনা এক নয়। আরাকান আর্মি এটা বুঝতে পারবে বলে আশা করা যায়।
রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়ে অনুকুল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে রোহিঙ্গা ও রাখাইন সম্পর্ক উন্নয়নে আরাকান আর্মি তৎপর হলে এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মহলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিবে। রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন আর কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নয় এটি এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু। রাখাইন জনগণের মনোভাব পরিবর্তনের জন্য রাখাইনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আরাকান আর্মি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হলে ওই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার্থে আরাকান আর্মিকে একটি স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ অঞ্চল গঠনে সাহায্য করতে পারে। আরাকান আর্মি বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনীতিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারে।
আরাকান আর্মির কাছে বর্তমানে বিপুল পরিমান প্রাপ্ত ও জব্দ করা অস্ত্রের ভান্ডার রয়েছে। এইগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এই অস্ত্র যেন আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে না আসে সে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। সামনের দিনগুলোতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান এবং রাখাইনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের পাশাপাশি আরাকান আর্মিকেও সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। এই অঞ্চলের উন্নয়নে রাখাইন ও মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা জরুরী। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহল, আঞ্চলিক দেশগুলো এবং অন্যান্য অংশীদারকে সাথে নিয়ে রাখাইনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে তৎপর হতে হবে।
লেখক : ব্রিঃ জেঃ হাসান মোঃ শামসুদ্দীন, এন ডি সি, এ এফ ডব্লিউ সি, পি এস সি, এম ফিল (অবঃ)
মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক





















