তেল সংকট না আতঙ্ক? বাজারে বিশৃঙ্খলার শঙ্কা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৭:২২:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬ ৬১ বার পড়া হয়েছে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় দেশে এক ধরনের ‘লঙ্কাকাণ্ড’ পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বাজারে তেলের অপ্রতুলতা, দীর্ঘ লাইন এবং অবৈধ মজুতের খবর জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সরকার একদিকে বলছে দেশে জ্বালানির ঘাটতি নেই, অন্যদিকে অনেক পেট্রোল পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে না—এই দ্বৈত বাস্তবতা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। যেখানে তেল মিলছে, সেখানেও দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে তেল মজুত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে তথ্যদাতাদের জন্য সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেছে, যাতে পাচার ও মজুতদারদের চিহ্নিত করা যায়।
জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ঠেকাতে দেশজুড়ে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে সরকার। গত ৩ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৬৪ জেলায় মোট ৩ হাজার ১৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে অবৈধভাবে মজুত করা ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (৩০ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী।
তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত তেলের মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৬৫ লিটার ডিজেল, ২২ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন এবং ৪৬ হাজার ১৪৬ লিটার পেট্রল। অভিযানের সময় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৫৩টি মামলা করা হয়েছে এবং ১৬টি ঘটনায় কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জরিমানা আদায় করা হয়েছে প্রায় ৭৫ লাখ ১৬ হাজার টাকা।
সরবরাহ সংকট নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে। মার্চ মাস শেষে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার টন ডিজেল উদ্বৃত্ত আছে। এছাড়া ৩০ মার্চ ও ৩ এপ্রিল আরও দুটি জাহাজে ৫৪ হাজার ৬০০ টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে। ভারত থেকে পাইপলাইনে অতিরিক্ত ৭ হাজার টন ডিজেল যুক্ত হচ্ছে।
এছাড়া চীন, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আরও প্রায় দেড় লাখ টন ডিজেল আমদানি হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের মোট জ্বালানি সরবরাহের বড় অংশই ডিজেল (৬৩ শতাংশ), আর অকটেন মাত্র ৬ শতাংশ। তাই পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের মূল কারণ ডিজেলের সংকট নয়, বরং অকটেনের চাহিদা বেশি হওয়া।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বহুমুখী আমদানি উৎস খুঁজছে। রাশিয়া থেকে আগামী দুই মাসে ৬ লাখ টন ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারত, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ছাড়াও নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের অনুমতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে অস্থিরতার মূল কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা বড় ভূমিকা রাখছে। এই নৌপথ দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি পরিবহন হয়। সেখানে বিঘ্ন ঘটায় সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সাশ্রয়ী পদক্ষেপের কথাও ভাবছে। এর মধ্যে রয়েছে সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু, অফিস সময়সূচি পরিবর্তন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আংশিক অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, বাজার মনিটরিং বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অন্যথায় জ্বালানি তেলকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি ঘাটতি নেই, আতঙ্কই তৈরি করছে কৃত্রিম চাপ: জ্বালানিমন্ত্রী
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই; বরং সম্ভাব্য চাহিদার চেয়েও বেশি মজুত ও প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের।
সোমবার (৩০ মার্চ) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, অযথা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ক্রয় ও মজুত করার প্রবণতার কারণেই বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও তারেক রহমান–এর নির্দেশনায় সরকার আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে। ফলে দেশে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং গত বছরের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় ডিজেলের মজুত ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন, যা বর্তমানে বেড়ে ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করা হলেও মজুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থার প্রমাণ।
তিনি আরও জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ১০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত চাহিদা সেই হারে না বাড়লেও জনমনে অতিরিক্ত কেনার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে অকটেনের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়েছে—যা পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের অন্যতম কারণ।
মন্ত্রী বলেন, দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৬৫ শতাংশই ডিজেল, যার সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। অথচ অকটেন ও পেট্রোলের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখে অনেকেই ভুলভাবে সামগ্রিক সংকট মনে করছেন।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে সারা দেশে ৩ হাজারের বেশি অভিযান চালিয়েছে। এতে শতাধিক মামলা, লাখো টাকা জরিমানা এবং কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে; উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধভাবে মজুত করা জ্বালানি।
তিনি জানান, এপ্রিল মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানি এবং দেশীয় উৎস থেকে আরও ৩০ হাজার মেট্রিক টন যোগ হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমান মজুত দিয়ে অন্তত দুই মাসের চাহিদা নির্বিঘ্নে পূরণ করা সম্ভব।
জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, মার্চ-জুন প্রান্তিকে ডিজেল ও অকটেনে ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকা এবং এলএনজি আমদানিতে ১৫ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।
সবশেষে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অপচয় পরিহার, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমেই এই পরিস্থিতি সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব।


























