ঢাকা ০৫:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে দেলোয়ারের সংগ্রাম, ঈদের আনন্দও অধরা

মো: বিপ্লব, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও)
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:২০:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চারদিকে বিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ। পাশে দু’টি ছোট পুকুর, সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটি বসতঘর। সেই পুকুরপাড়েই মাটির চার দেয়ালে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর—ভাঙা টিনে ঘেরা, ওপরে ঢেউটিনের ছাউনি, আর সেটিকে চেপে রাখা হয়েছে গাছের ডালপালা দিয়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে পাখির বাসা। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটাই একজন মানুষের বসতভিটা, বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাঁও ইউনিয়নের জাবড়াকুড়া গ্রামের এই ঘরেই বসবাস করছেন প্রায় ৪৫ বছর বয়সী দেলোয়ার হোসেন। প্রতিবন্ধী একমাত্র সন্তানকে নিয়েই তার প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম।

সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট্ট সেই ঘরের একপাশে একটি পুরোনো চৌকি, পাশে একটি টেবিল, আর এক কোণে একটি টিউবওয়েল। ঘরের সামনের বারান্দায় একটি মাটির চুলা—সেটিই যেন এই পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র চিহ্ন। নেই কোনো স্যানিটেশন ব্যবস্থা; খোলা মাঠেই সারতে হয় প্রাকৃতিক প্রয়োজন।

দেলোয়ার হোসেনের কণ্ঠে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস যেন থামতেই চায় না। তিনি জানান, তার ছেলে বকুলের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই স্ত্রী মারা যান। ছোট্ট শিশুটিকে রেখে স্ত্রী না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর আর নতুন করে সংসার শুরু করেননি তিনি। কারণ, নতুন সংসারে প্রতিবন্ধী সন্তানকে কেউ মেনে নেবে না—এই আশঙ্কাই তাকে আজীবন একাকী করে রেখেছে।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর বকুলকে বড় করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন দেলোয়ারের মা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তাকেও হারাতে হয়। এরপর থেকে পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে দেলোয়ারের একার কাঁধে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার কঠিন সংগ্রামের পথচলা।

ছেলের চিকিৎসার জন্য বাবার দেওয়া সামান্য জমিজমাও বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। এখন মাত্র ছয় শতক জমির ওপর ভাঙাচোরা একটি ঘর তুলে দিনমজুরির আয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছেন বাবা-ছেলে। প্রতিদিনের আয়েই চলে তাদের খাবার জোগাড়, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা যেন প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবন্ধী সন্তানের দেখভাল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কাজই একাই করেন দেলোয়ার। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির সময় তাদের ভাঙা ঘরটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। এতে করে তাদের জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার নেই কোনো জমিজমা, নেই কোনো সম্পদ। আমার সবই আমার ছেলে। আগে সে সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেত, কিন্তু এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। আমার সামান্য আয় দিয়ে কোনোরকমে দিন কাটাই। সামনে ঈদ, অথচ মা-হারা ছেলেটাকে একটা নতুন কাপড়ও কিনে দিতে পারিনি।

দেলোয়ারের এই করুণ বাস্তবতা যেন সমাজের অবহেলিত মানুষের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যেখানে উৎসব আসে, কিন্তু আনন্দ আসে না; ঈদ আসে, কিন্তু হাসি ফোটে না।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে দেলোয়ারের সংগ্রাম, ঈদের আনন্দও অধরা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০২:২০:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬

চারদিকে বিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ। পাশে দু’টি ছোট পুকুর, সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কয়েকটি বসতঘর। সেই পুকুরপাড়েই মাটির চার দেয়ালে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর—ভাঙা টিনে ঘেরা, ওপরে ঢেউটিনের ছাউনি, আর সেটিকে চেপে রাখা হয়েছে গাছের ডালপালা দিয়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে পাখির বাসা। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটাই একজন মানুষের বসতভিটা, বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাঁও ইউনিয়নের জাবড়াকুড়া গ্রামের এই ঘরেই বসবাস করছেন প্রায় ৪৫ বছর বয়সী দেলোয়ার হোসেন। প্রতিবন্ধী একমাত্র সন্তানকে নিয়েই তার প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম।

সরেজমিনে দেখা যায়, ছোট্ট সেই ঘরের একপাশে একটি পুরোনো চৌকি, পাশে একটি টেবিল, আর এক কোণে একটি টিউবওয়েল। ঘরের সামনের বারান্দায় একটি মাটির চুলা—সেটিই যেন এই পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র চিহ্ন। নেই কোনো স্যানিটেশন ব্যবস্থা; খোলা মাঠেই সারতে হয় প্রাকৃতিক প্রয়োজন।

দেলোয়ার হোসেনের কণ্ঠে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস যেন থামতেই চায় না। তিনি জানান, তার ছেলে বকুলের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই স্ত্রী মারা যান। ছোট্ট শিশুটিকে রেখে স্ত্রী না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর আর নতুন করে সংসার শুরু করেননি তিনি। কারণ, নতুন সংসারে প্রতিবন্ধী সন্তানকে কেউ মেনে নেবে না—এই আশঙ্কাই তাকে আজীবন একাকী করে রেখেছে।

স্ত্রীর মৃত্যুর পর বকুলকে বড় করে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিলেন দেলোয়ারের মা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তাকেও হারাতে হয়। এরপর থেকে পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে দেলোয়ারের একার কাঁধে। সেখান থেকেই শুরু হয় তার কঠিন সংগ্রামের পথচলা।

ছেলের চিকিৎসার জন্য বাবার দেওয়া সামান্য জমিজমাও বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। এখন মাত্র ছয় শতক জমির ওপর ভাঙাচোরা একটি ঘর তুলে দিনমজুরির আয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছেন বাবা-ছেলে। প্রতিদিনের আয়েই চলে তাদের খাবার জোগাড়, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা যেন প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবন্ধী সন্তানের দেখভাল থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কাজই একাই করেন দেলোয়ার। বিশেষ করে ঝড়-বৃষ্টির সময় তাদের ভাঙা ঘরটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা সবসময়ই থাকে। এতে করে তাদের জীবন আরও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেলোয়ার হোসেন বলেন, আমার নেই কোনো জমিজমা, নেই কোনো সম্পদ। আমার সবই আমার ছেলে। আগে সে সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পেত, কিন্তু এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। আমার সামান্য আয় দিয়ে কোনোরকমে দিন কাটাই। সামনে ঈদ, অথচ মা-হারা ছেলেটাকে একটা নতুন কাপড়ও কিনে দিতে পারিনি।

দেলোয়ারের এই করুণ বাস্তবতা যেন সমাজের অবহেলিত মানুষের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যেখানে উৎসব আসে, কিন্তু আনন্দ আসে না; ঈদ আসে, কিন্তু হাসি ফোটে না।