ঢাকা ০১:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কেন ইরানের পাশে নেই ‘মুসলিম বিশ্ব’?—সংহতির আড়ালের বাস্তবতা

বাংলা টাইমস ডেস্ক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৪২:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ইরান–কে ঘিরে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো মুসলিম দেশের দৃশ্যমান অবস্থান না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—কোথায় সেই ‘মুসলিম সংহতি’? বাস্তবতা বলছে, বিষয়টি আবেগের নয়, বরং জটিল ভূ-রাজনীতি, স্বার্থ এবং অবিশ্বাসের সমন্বয়।

১. ‘মুসলিম বিশ্ব’ আসলে একক নয়

মুসলিম দেশগুলোকে অনেক সময় একসত্তা হিসেবে ভাবা হলেও বাস্তবে তারা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে পরিচালিত হয়। ফলে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তারা কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

২. ইরানকে ‘মিত্র’ নয়, বরং ‘হুমকি’ হিসেবে দেখে অনেকে

বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো—যেমন সৌদি আরব—ইরানকে দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। ইরানের প্রভাব বিস্তার, শিয়া মতাদর্শ প্রচার এবং বিভিন্ন দেশে প্রক্সি গোষ্ঠী সমর্থনের কারণে তাদের মধ্যে অবিশ্বাস গভীর।

৩. সুন্নি–শিয়া বিভাজন

ইরান মূলত শিয়া অধ্যুষিত, আর অধিকাংশ মুসলিম দেশ সুন্নি। এই ঐতিহাসিক বিভাজন শুধু ধর্মীয় নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখে। ফলে রাজনৈতিক সংহতি গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।

৪. যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা

অনেক আরব দেশ নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামরিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-এর ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা সরাসরি ইরানের পক্ষে অবস্থান নিলে নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

৫. ইরানের আঞ্চলিক নীতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া

ইরান দীর্ঘদিন ধরে হেজবুল্লাহ, হুথিসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অনেক আরব দেশ এটিকে ‘সংহতি’ নয়, বরং নিজেদের প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে দেখে।

৬. যুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি

বর্তমান সংঘাত বড় আকার ধারণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। কোনো দেশই অনিশ্চিত পরিণতির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না, বিশেষ করে যখন নিজেদের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ে।

৭. নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা

২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এর মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এতে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যেখানে ইরানকে অনেকের কাছে ‘সাধারণ প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানের পাশে মুসলিম দেশগুলোর অনুপস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি বহু বছরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মতাদর্শগত বিভাজন, আঞ্চলিক শক্তির লড়াই এবং আন্তর্জাতিক নির্ভরতার ফল।

ধর্মীয় সংহতির ধারণা থাকলেও বাস্তবে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়—আর এই কারণেই ইরান আজ অনেকটাই কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

কেন ইরানের পাশে নেই ‘মুসলিম বিশ্ব’?—সংহতির আড়ালের বাস্তবতা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০৬:৪২:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬

ইরান–কে ঘিরে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো মুসলিম দেশের দৃশ্যমান অবস্থান না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে—কোথায় সেই ‘মুসলিম সংহতি’? বাস্তবতা বলছে, বিষয়টি আবেগের নয়, বরং জটিল ভূ-রাজনীতি, স্বার্থ এবং অবিশ্বাসের সমন্বয়।

১. ‘মুসলিম বিশ্ব’ আসলে একক নয়

মুসলিম দেশগুলোকে অনেক সময় একসত্তা হিসেবে ভাবা হলেও বাস্তবে তারা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে পরিচালিত হয়। ফলে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তারা কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

২. ইরানকে ‘মিত্র’ নয়, বরং ‘হুমকি’ হিসেবে দেখে অনেকে

বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো—যেমন সৌদি আরব—ইরানকে দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। ইরানের প্রভাব বিস্তার, শিয়া মতাদর্শ প্রচার এবং বিভিন্ন দেশে প্রক্সি গোষ্ঠী সমর্থনের কারণে তাদের মধ্যে অবিশ্বাস গভীর।

৩. সুন্নি–শিয়া বিভাজন

ইরান মূলত শিয়া অধ্যুষিত, আর অধিকাংশ মুসলিম দেশ সুন্নি। এই ঐতিহাসিক বিভাজন শুধু ধর্মীয় নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণেও বড় ভূমিকা রাখে। ফলে রাজনৈতিক সংহতি গড়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে।

৪. যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা

অনেক আরব দেশ নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামরিক সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-এর ওপর নির্ভরশীল। তাই তারা সরাসরি ইরানের পক্ষে অবস্থান নিলে নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

৫. ইরানের আঞ্চলিক নীতির বিরূপ প্রতিক্রিয়া

ইরান দীর্ঘদিন ধরে হেজবুল্লাহ, হুথিসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। অনেক আরব দেশ এটিকে ‘সংহতি’ নয়, বরং নিজেদের প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবে দেখে।

৬. যুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি

বর্তমান সংঘাত বড় আকার ধারণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। কোনো দেশই অনিশ্চিত পরিণতির যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না, বিশেষ করে যখন নিজেদের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ে।

৭. নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা

২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এর মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এতে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, যেখানে ইরানকে অনেকের কাছে ‘সাধারণ প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরানের পাশে মুসলিম দেশগুলোর অনুপস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি বহু বছরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মতাদর্শগত বিভাজন, আঞ্চলিক শক্তির লড়াই এবং আন্তর্জাতিক নির্ভরতার ফল।

ধর্মীয় সংহতির ধারণা থাকলেও বাস্তবে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়—আর এই কারণেই ইরান আজ অনেকটাই কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন।