সাড়ে তিন হাজার সদস্যের নজিরবিহীন অভিযান
অভিযানের খবর ফাঁস, রাতেই জঙ্গল সলিমপুর ছাড়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা
- সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৩২:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম জঙ্গল সলিমপুরে ভোরের অন্ধকার ভাঙার আগেই শুরু হয় নজিরবিহীন অভিযান। প্রায় সাড়ে তিন হাজার সদস্যের যৌথবাহিনী চারদিক ঘিরে ফেলে পাহাড়ঘেরা বিস্তীর্ণ এলাকাটি। তবে অভিযান শুরুর অল্পক্ষণের মধ্যেই যৌথবাহিনী টের পায়, কঠোর গোপনীয়তায় পরিকল্পিত এই অভিযানের খবর আগেই পেয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। রাতভর কোথাও ব্যারিকেড, কোথাও কালভার্ট ভেঙে দেওয়া, কোথাও আবার নালার স্ল্যাব উড়িয়ে দিয়ে তারা বাহিনীর যাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা চালায়। এর মধ্যেই মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে গভীর রাতেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযানের পর নিয়ন্ত্রণের দাবি
সোমবার (৯ মার্চ) দুপুরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আহসান হাবীব পলাশ জানান, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় এখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, ভোর থেকে র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান চালান। মোট প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য এতে অংশ নেন। বিশাল এই এলাকায় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই ছিল অভিযানের মূল লক্ষ্য এবং তা অর্জন করা গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
নিরাপত্তা জোরদারে এলাকায় র্যাব ও পুলিশের দুটি স্থায়ী ক্যাম্প বা তল্লাশিচৌকি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ। তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পের নিরাপত্তাবিধানে যদি এখানে কামান দেওয়া লাগে, আমরা কামান দেব।’
তবে অভিযানের সময় জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার ‘ইয়াসিন বাহিনী’র প্রধান মোহাম্মদ ইয়াসিন পালিয়ে গেছেন বলে জানান তিনি। অভিযানে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে, যদিও তাদের মধ্যে আলোচিত কোনো সন্ত্রাসী নেই।
আগেই তৈরি করা হয় প্রতিবন্ধকতা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতেই আগে থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। আলীনগরে ঢোকার প্রধান সড়কে একটি বড় ট্রাক রেখে দেওয়া হয়। একই এলাকায় খালের ওপরের একটি কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হয়, যাতে বাহিনীর যানবাহন প্রবেশ করতে না পারে।
পরে খালে ইট, বালি ও সিমেন্ট ফেলে অস্থায়ীভাবে রাস্তা তৈরি করে যান চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। নিরাপত্তার কারণে অভিযান চলাকালে সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় সাঁজোয়া যান মোতায়েন রাখা হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, আলীনগরের শুরুতেই একটি বড় ট্রাক রেখে দেওয়া হয়েছিল এবং খালের ওপরের কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে। তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর বিস্তীর্ণ এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন ভাগে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুরো অভিযান শেষ হলে কী কী উদ্ধার হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
আকাশ ও স্থলপথে নজরদারি
সোমবার সকাল ছয়টা থেকে শুরু হওয়া অভিযানে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সাড়ে তিন হাজার সদস্য অংশ নেন। সকাল থেকেই জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলে যৌথ বাহিনী। প্রবেশ ও বের হওয়ার সব পথেই তল্লাশিচৌকি বসানো হয়, যাতে অভিযান চলাকালে কেউ পালিয়ে যেতে না পারে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালান। সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকে এলাকায় হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়। ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি চালানো হয়। ঝোপঝাড় কিংবা মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারে ডগ স্কোয়াডও ব্যবহার করা হয়।
অভিযানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ পুলিশ, ৫৫০ সেনাসদস্য, ৪০০ র্যাব সদস্য, ৩৩০ এপিবিএন সদস্য এবং ১২০ বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এটিই সবচেয়ে বড় ও সমন্বিত অভিযান বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে পরিণত হওয়া বসতি
প্রশাসনিকভাবে জঙ্গল সলিমপুর সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও এলাকাটিতে প্রবেশ করতে হয় চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে। বায়েজিদ লিংক রোড হয়ে ভাটিয়ারি যাওয়ার পথে ডান পাশে অবস্থিত এই এলাকা প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাস জমি জুড়ে বিস্তৃত।
টিলা কেটে গড়ে ওঠা কয়েক হাজার অবৈধ বসতি ধীরে ধীরে একটি দুর্ভেদ্য সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। কয়েক দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে বসতি গড়ে উঠেছে এবং এখনো পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য চলছে। এই দখল ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী।
বর্তমানে সেখানে দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ সক্রিয়। একটির নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অন্যটির নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিন আগে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম আল মামুনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি নিজেকে বিএনপির নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী বলে দাবি করেন। অন্যদিকে স্থানীয় সূত্র জানায়, আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে রোকন উদ্দিনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
এলাকাটি সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে। স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়া বাইরের কেউ সহজে সেখানে প্রবেশ করতে পারেন না।
উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা প্রশাসনের
ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘আমরা বিভাগীয় কমিশনার ও প্রশাসনকে অনুরোধ করব, এই এলাকায় প্রশাসনের নেওয়া পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য। আপনারা কল্পনাও করতে পারবেন না, এটি কত বড় এলাকা।’
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ডা. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘এলাকাটিতে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এখন সম্ভব হয়েছে। সরকার আগে থেকেই এই অঞ্চল ঘিরে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছিল, এখন সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় স্থাপিত ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী ভারী অস্ত্র মোতায়েন করা হবে বলেও জানান ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ।
গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব–৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় একটি মামলা দায়ের করে র্যাব। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে। এতে ইয়াসিন ও নুরুল হক ভান্ডারীসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়।




















