ঢাকা ০১:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্ঘুম চালক: দুর্ঘটনার নীরব ঘাতক

জয়নাল আবেদিন
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪০:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬ ৪৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টানা তিন-চার দিন স্টিয়ারিং হাতে, চোখে ঘুম নেই, শরীরে ক্লান্তি—বাসচালক মো. ইব্রাহিম শেখের অভিজ্ঞতা যেন দেশের সড়ক বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে ঈদযাত্রার মতো চাপের সময়ে এই চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন চালকের টানা ৪ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশে অনেক চালকই ৩-৪ দিন পর্যন্ত প্রায় নির্ঘুম অবস্থায় গাড়ি চালাতে বাধ্য হন। এতে শুধু তাদের শারীরিক সক্ষমতাই কমে না, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

ঈদ মানেই ঘরে ফেরা, প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রতি বছর ঈদযাত্রা দেশের মহাসড়কগুলোকে এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাগারে পরিণত করে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো থেকে কয়েক কোটি মানুষের একযোগে যাত্রা যেন পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ঈদের আগে ও পরে কয়েক দিনের মধ্যে যাত্রী সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে— যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানো হয়, ট্রিপ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি করা হয়, কিন্তু চালক ও সহকারীর সংখ্যা বাড়ে না। এই অসমতা থেকেই তৈরি হয় মূল সংকট।

ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং শিল্পাঞ্চল কেন্দ্রিক কর্মসংস্থান জনিত কারণে দেশের কোটি মানুষের এই ছুটিপ্রবাহ মহাসড়কে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও প্রতিবছর ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা যেন অপ্রত্যাশিত নয়, বরং এক নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে চালকের প্রতিক্রিয়া সময় ধীর হয়ে যায়। ফলে হঠাৎ কোনো বিপদ সামনে এলে তা সামাল দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। এক মুহূর্তের ভুলেই ঘটে যেতে পারে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণের মধ্যে এই ‘নির্ঘুম চালনা’ একটি নীরব কিন্তু বড় ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে। অথচ এ বিষয়ে সচেতনতা ও কার্যকর তদারকির অভাব স্পষ্ট।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু যানবাহনের ফিটনেস বা সড়কের অবকাঠামো উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; চালকের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর বিশ্রাম নিশ্চিত করা, চালকদের জন্য শিফটভিত্তিক ডিউটি চালু করা এবং কঠোর নজরদারি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোসলেহ উদ্দিন হাসান এবং গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক মনে করেন, শুধু সড়ক নয়, যানবাহন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই দুর্ঘটনার মূল চাবিকাঠি। দক্ষ চালক নিয়োগ, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা এবং যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা—এসব পদক্ষেপ নিয়েই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সারসংক্ষেপে, ঈদযাত্রা শুধু আনন্দ নয়, একই সঙ্গে এটি আমাদের দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি। সঠিক ব্যবস্থাপনা, ট্রিপ পরিকল্পনা এবং চালকের সুস্থতা নিশ্চিত করলে এই আনন্দ উৎসবকে নিরাপদ করে তোলা সম্ভব।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

নির্ঘুম চালক: দুর্ঘটনার নীরব ঘাতক

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:৪০:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬

টানা তিন-চার দিন স্টিয়ারিং হাতে, চোখে ঘুম নেই, শরীরে ক্লান্তি—বাসচালক মো. ইব্রাহিম শেখের অভিজ্ঞতা যেন দেশের সড়ক বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে ঈদযাত্রার মতো চাপের সময়ে এই চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন চালকের টানা ৪ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর বাধ্যতামূলক বিশ্রাম নেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশে অনেক চালকই ৩-৪ দিন পর্যন্ত প্রায় নির্ঘুম অবস্থায় গাড়ি চালাতে বাধ্য হন। এতে শুধু তাদের শারীরিক সক্ষমতাই কমে না, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

ঈদ মানেই ঘরে ফেরা, প্রিয়জনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রতি বছর ঈদযাত্রা দেশের মহাসড়কগুলোকে এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষাগারে পরিণত করে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলো থেকে কয়েক কোটি মানুষের একযোগে যাত্রা যেন পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ঈদের আগে ও পরে কয়েক দিনের মধ্যে যাত্রী সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে— যানবাহনের সংখ্যা বাড়ানো হয়, ট্রিপ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি করা হয়, কিন্তু চালক ও সহকারীর সংখ্যা বাড়ে না। এই অসমতা থেকেই তৈরি হয় মূল সংকট।

ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং শিল্পাঞ্চল কেন্দ্রিক কর্মসংস্থান জনিত কারণে দেশের কোটি মানুষের এই ছুটিপ্রবাহ মহাসড়কে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও প্রতিবছর ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা যেন অপ্রত্যাশিত নয়, বরং এক নীরব মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে চালকের প্রতিক্রিয়া সময় ধীর হয়ে যায়। ফলে হঠাৎ কোনো বিপদ সামনে এলে তা সামাল দেওয়ার সুযোগ কমে যায়। এক মুহূর্তের ভুলেই ঘটে যেতে পারে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণের মধ্যে এই ‘নির্ঘুম চালনা’ একটি নীরব কিন্তু বড় ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে। অথচ এ বিষয়ে সচেতনতা ও কার্যকর তদারকির অভাব স্পষ্ট।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু যানবাহনের ফিটনেস বা সড়কের অবকাঠামো উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; চালকের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর বিশ্রাম নিশ্চিত করা, চালকদের জন্য শিফটভিত্তিক ডিউটি চালু করা এবং কঠোর নজরদারি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোসলেহ উদ্দিন হাসান এবং গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক মনে করেন, শুধু সড়ক নয়, যানবাহন ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই দুর্ঘটনার মূল চাবিকাঠি। দক্ষ চালক নিয়োগ, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা এবং যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা—এসব পদক্ষেপ নিয়েই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সারসংক্ষেপে, ঈদযাত্রা শুধু আনন্দ নয়, একই সঙ্গে এটি আমাদের দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি। সঠিক ব্যবস্থাপনা, ট্রিপ পরিকল্পনা এবং চালকের সুস্থতা নিশ্চিত করলে এই আনন্দ উৎসবকে নিরাপদ করে তোলা সম্ভব।