ঢাকা ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মোবাইল কোর্টে ‘আইনবহির্ভূত’ দণ্ড, ইউএনওর ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:৪৩:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬ ৪১ বার পড়া হয়েছে

প্রতিকী ছবি

বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

থানায় গ্রেপ্তার বা আটক ব্যক্তিকে নিয়মিত আদালতে না পাঠিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল কোর্টে হাজির করে দণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আইনি প্রশ্ন উঠেছে। কক্সবাজারের পেকুয়ায় মা–মেয়েকে থানায় আটক করার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় বিষয়টি সামনে আসে। এ নিয়ে কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছেন এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছেন।

মঙ্গলবার (৮ মার্চ) কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পিস মোহাম্মদ শফিউল আযম এ আদেশ দেন। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮–এর ২৫ ধারার ক্ষমতাবলে তিনি পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাইরুল আলমকে আগামী ১৬ মার্চ আদালতে হাজির হয়ে পুরো ঘটনার লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিডি বা মামলা, গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নথি, ডিউটি রোস্টার, সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে বলা হয়েছে।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দুই নারীকে প্রথমে থানায় আটক করা হয় এবং পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে এনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। যদি ঘটনাটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯–এর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এর মধ্যেই সোমবার (১৬ মার্চ) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা দেওয়া সেই পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুবকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বদলি করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ৪ মার্চ বুধবার বিকেলে। পেকুয়া থানায় ডেকে নিয়ে ইউএনও মাহবুব মা-মেয়েকে নির্যাতনের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এক মাস করে সাজা দেন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত শেষে সোমবার (১৬ মার্চ) চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোতাহার হোসেন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মাহবুব আলম মাহবুবের বদলীর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

থানায় ঘটনা, মোবাইল কোর্টে সাজা

ঘটনার সূত্রপাত কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাবেক গুলদি এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্রী জুবাইদা জন্নাত ও তার মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে ঘিরে। জুবাইদার বাবা মৃত নুরুল আবছার। জুবাইদার বয়স যখন প্রায় এক বছর, তখন তার বাবা–মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে নির্যাতনের কারণেই সেই বিচ্ছেদ হয়েছিল।

বিচ্ছেদের পর মা জুবাইদাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। নুরুল আবছার পরে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করে নতুন সংসার শুরু করেন। অন্যদিকে রেহেনা মোস্তফা রানুও নতুন করে সংসার শুরু করেন এবং সেই সংসারে রুবেল নামের আরেক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি ছেলে ও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যান।

২০১৩ সালের ২৩ মে নুরুল আবছারের মৃত্যু হলে পৈতৃক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার দাবি তোলেন জুবাইদা। অভিযোগ রয়েছে, তার চাচারা তাকে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। ওয়ারিশ সনদের জন্য পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করলেও তা পাননি। অভিযোগ রয়েছে, জুবাইদার ফুফু স্থানীয় নারী সদস্য বিজু সনদ প্রদানে বাধা দেন।

পরে চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন জুবাইদা। আদালত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। প্রায় এক বছরেও সেই প্রতিবেদন না আসায় তদন্তভার পেকুয়া থানাকে দেওয়া হয়।

তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই পল্লব কুমার ঘোষ। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে তিনি ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। জুবাইদার খালা নিজের স্বর্ণের আংটি বন্ধক রেখে সেই টাকা দেন। এরপরও জুবাইদার বিপক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

গত বুধবার (৪ মার্চ) জুবাইদা ও তার মা থানায় গিয়ে এসআই পল্লব কুমার ঘোষের কাছে জানতে চান কেন তাকে বঞ্চিত করা হলো এবং ঘুষ হিসেবে দেওয়া ২০ হাজার টাকা ফেরত চান। অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা ফেরত চাইতেই পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয় এবং নারী পুলিশ দিয়ে মা–মেয়েকে মারধর করা হয়।

পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলমকে ডেকে এনে থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। সেই আদালতের মাধ্যমে মা ও মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালতে খালাস

ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে জেলায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত শনিবার (৭ মার্চ) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম জামিন শুনানি করেন। শুনানি শেষে তিনি কলেজছাত্রী জুবাইদা জন্নাত ও তার মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে বেকসুর খালাস দেন। বিকেলে সেই আদেশ জেলা কারাগারে পৌঁছালে সন্ধ্যায় তারা মুক্তি পান। বর্তমানে তারা একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানিয়েছেন জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল।

মোবাইল কোর্ট আইনের সীমা

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯–এর ৬(১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কেবল তার সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষ স্বীকার করলে নির্ধারিত দণ্ড দিতে পারেন। কিন্তু পুলিশ আগে থেকে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করলে সেই অপরাধ আর ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে তাৎক্ষণিকভাবে সংঘটিত বলে গণ্য হয় না। ফলে এমন ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা আইনের এখতিয়ারবহির্ভূত বলে বিবেচিত হয়।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তরা যদি থানায় এসে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া বা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার মতো কোনো কাজ করে থাকেন, তাহলে তা আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় মামলা রুজু করা এবং ১৫৭ ধারায় তদন্ত শুরু করা পুলিশের আইনি দায়িত্ব।

উচ্চ আদালতের রায় ও সংবিধানের বাধ্যবাধকতা

এ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগের ‘সুয়ো মোটো রুল নম্বর ০৯ অব ২০১৬’ মামলার রায়ের কথাও আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘দ্য স্টেট বনাম সখিপুরের ইউএনও ও অন্যান্য’ মামলায় হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছেন, পুলিশ আগে থেকে কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করলে তাকে মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে সাজা দেওয়া যাবে না। যদি এমনভাবে দণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে পুরো কার্যক্রমই অবৈধ এবং এখতিয়ারবহির্ভূত বলে গণ্য হবে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই রায় সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য বাধ্যতামূলক।

আগেও ছিল সতর্কতা

এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে আগেও বিচার বিভাগ সতর্কতা দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহার রুমী এক প্রশাসনিক আদেশে উল্লেখ করেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আটক আসামিদের নিয়মিত আদালতে না পাঠিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করছেন এবং পরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ওই আদেশে বলা হয়, এ ধরনের প্রক্রিয়া মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এবং সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সেই আদেশে থানার কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলা হয়েছিল, পুলিশ কর্তৃক ধৃত আসামিদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে আইনবহির্ভূত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কোনো ঘটনা সামনে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করা হবে।

পেকুয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সেই আইনি বিতর্ক সামনে এসেছে। নিয়মিত আদালতে সোপর্দ না করে থানায় আটক ব্যক্তিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল কোর্টে হাজির করে দণ্ড দেওয়ার অভিযোগ কতটা সত্য, তা এখন আদালতের তলব করা ব্যাখ্যার ওপরই নির্ভর করছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

মোবাইল কোর্টে ‘আইনবহির্ভূত’ দণ্ড, ইউএনওর ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:৪৩:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬

থানায় গ্রেপ্তার বা আটক ব্যক্তিকে নিয়মিত আদালতে না পাঠিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল কোর্টে হাজির করে দণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আইনি প্রশ্ন উঠেছে। কক্সবাজারের পেকুয়ায় মা–মেয়েকে থানায় আটক করার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় বিষয়টি সামনে আসে। এ নিয়ে কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছেন এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছেন।

মঙ্গলবার (৮ মার্চ) কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পিস মোহাম্মদ শফিউল আযম এ আদেশ দেন। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮–এর ২৫ ধারার ক্ষমতাবলে তিনি পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খাইরুল আলমকে আগামী ১৬ মার্চ আদালতে হাজির হয়ে পুরো ঘটনার লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিডি বা মামলা, গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নথি, ডিউটি রোস্টার, সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে বলা হয়েছে।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দুই নারীকে প্রথমে থানায় আটক করা হয় এবং পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ডেকে এনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। যদি ঘটনাটি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯–এর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এর মধ্যেই সোমবার (১৬ মার্চ) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা দেওয়া সেই পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুবকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বদলি করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে গত ৪ মার্চ বুধবার বিকেলে। পেকুয়া থানায় ডেকে নিয়ে ইউএনও মাহবুব মা-মেয়েকে নির্যাতনের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে এক মাস করে সাজা দেন। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত শেষে সোমবার (১৬ মার্চ) চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোতাহার হোসেন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মাহবুব আলম মাহবুবের বদলীর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

থানায় ঘটনা, মোবাইল কোর্টে সাজা

ঘটনার সূত্রপাত কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাবেক গুলদি এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্রী জুবাইদা জন্নাত ও তার মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে ঘিরে। জুবাইদার বাবা মৃত নুরুল আবছার। জুবাইদার বয়স যখন প্রায় এক বছর, তখন তার বাবা–মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে নির্যাতনের কারণেই সেই বিচ্ছেদ হয়েছিল।

বিচ্ছেদের পর মা জুবাইদাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। নুরুল আবছার পরে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করে নতুন সংসার শুরু করেন। অন্যদিকে রেহেনা মোস্তফা রানুও নতুন করে সংসার শুরু করেন এবং সেই সংসারে রুবেল নামের আরেক ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি ছেলে ও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যান।

২০১৩ সালের ২৩ মে নুরুল আবছারের মৃত্যু হলে পৈতৃক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার দাবি তোলেন জুবাইদা। অভিযোগ রয়েছে, তার চাচারা তাকে স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান। ওয়ারিশ সনদের জন্য পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করলেও তা পাননি। অভিযোগ রয়েছে, জুবাইদার ফুফু স্থানীয় নারী সদস্য বিজু সনদ প্রদানে বাধা দেন।

পরে চকরিয়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন জুবাইদা। আদালত উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। প্রায় এক বছরেও সেই প্রতিবেদন না আসায় তদন্তভার পেকুয়া থানাকে দেওয়া হয়।

তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই পল্লব কুমার ঘোষ। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে তিনি ২০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। জুবাইদার খালা নিজের স্বর্ণের আংটি বন্ধক রেখে সেই টাকা দেন। এরপরও জুবাইদার বিপক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়।

গত বুধবার (৪ মার্চ) জুবাইদা ও তার মা থানায় গিয়ে এসআই পল্লব কুমার ঘোষের কাছে জানতে চান কেন তাকে বঞ্চিত করা হলো এবং ঘুষ হিসেবে দেওয়া ২০ হাজার টাকা ফেরত চান। অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা ফেরত চাইতেই পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয় এবং নারী পুলিশ দিয়ে মা–মেয়েকে মারধর করা হয়।

পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলমকে ডেকে এনে থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হয়। সেই আদালতের মাধ্যমে মা ও মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালতে খালাস

ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে জেলায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত শনিবার (৭ মার্চ) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম জামিন শুনানি করেন। শুনানি শেষে তিনি কলেজছাত্রী জুবাইদা জন্নাত ও তার মা রেহেনা মোস্তফা রানুকে বেকসুর খালাস দেন। বিকেলে সেই আদেশ জেলা কারাগারে পৌঁছালে সন্ধ্যায় তারা মুক্তি পান। বর্তমানে তারা একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে জানিয়েছেন জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল।

মোবাইল কোর্ট আইনের সীমা

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯–এর ৬(১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কেবল তার সম্মুখে সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলেই তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষ স্বীকার করলে নির্ধারিত দণ্ড দিতে পারেন। কিন্তু পুলিশ আগে থেকে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করলে সেই অপরাধ আর ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে তাৎক্ষণিকভাবে সংঘটিত বলে গণ্য হয় না। ফলে এমন ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা আইনের এখতিয়ারবহির্ভূত বলে বিবেচিত হয়।

আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তরা যদি থানায় এসে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া বা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার মতো কোনো কাজ করে থাকেন, তাহলে তা আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪ ধারায় মামলা রুজু করা এবং ১৫৭ ধারায় তদন্ত শুরু করা পুলিশের আইনি দায়িত্ব।

উচ্চ আদালতের রায় ও সংবিধানের বাধ্যবাধকতা

এ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগের ‘সুয়ো মোটো রুল নম্বর ০৯ অব ২০১৬’ মামলার রায়ের কথাও আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘দ্য স্টেট বনাম সখিপুরের ইউএনও ও অন্যান্য’ মামলায় হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছেন, পুলিশ আগে থেকে কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করলে তাকে মোবাইল কোর্ট আইনের অধীনে সাজা দেওয়া যাবে না। যদি এমনভাবে দণ্ড দেওয়া হয়, তাহলে পুরো কার্যক্রমই অবৈধ এবং এখতিয়ারবহির্ভূত বলে গণ্য হবে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই রায় সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য বাধ্যতামূলক।

আগেও ছিল সতর্কতা

এ ধরনের ঘটনার বিষয়ে আগেও বিচার বিভাগ সতর্কতা দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহার রুমী এক প্রশাসনিক আদেশে উল্লেখ করেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আটক আসামিদের নিয়মিত আদালতে না পাঠিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করছেন এবং পরে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ওই আদেশে বলা হয়, এ ধরনের প্রক্রিয়া মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এবং সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সেই আদেশে থানার কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলা হয়েছিল, পুলিশ কর্তৃক ধৃত আসামিদের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে আইনবহির্ভূত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার কোনো ঘটনা সামনে এলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করা হবে।

পেকুয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সেই আইনি বিতর্ক সামনে এসেছে। নিয়মিত আদালতে সোপর্দ না করে থানায় আটক ব্যক্তিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মোবাইল কোর্টে হাজির করে দণ্ড দেওয়ার অভিযোগ কতটা সত্য, তা এখন আদালতের তলব করা ব্যাখ্যার ওপরই নির্ভর করছে।