ঢাকা ০২:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কাগজে মৃত, বাস্তবে জীবিত—বয়স্কভাতা থেকে বঞ্চিত মমিনা

আজিজুল হক সরকার, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের তেঁতুলিয়া গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের স্ত্রী ৮৯ বয়স্ক বৃদ্ধা মমিনা বেগম। জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় মৃত দেখানোর কারণে দীর্ঘ তিন বছর থেকে বয়স্কভাতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই বৃদ্ধা। ভুল ভেরিফিকেশন আর জনপ্রতিনিধির দায়িত্বহীন সুপারিশের কারণে তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে তার বয়স্কভাতা। এতে চরম কষ্টে দিন কাটছে এই বৃদ্ধার।

জানা যায়, ২০২৩ সালের ৯ আগস্ট উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সকল ভাতাভোগীদের ভেরিফিকেশন কার্যক্রম চালানো হয়। সে সময় জীবিকার প্রয়োজনে বৃদ্ধা মমিনা বেগম ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় ভেরিফিকেশনের সময় তাকে তার বাড়িতে না পেয়ে এবং পরবর্তীতে তার সম্পর্কে কোনো প্রকার খোঁজখবর না নিয়েই তৎকালীন ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর বাবলী আরা মমিনা বেগমকে মৃত দেখিয়ে পৌর মেয়রের কাছে একটি সুপারিশ দেন। কাউন্সিলরের সুপারিশের ভিত্তিতে পৌরসভা থেকে উপজেলা সমাজসেবা দপ্তরে মমিনা বেগমকে মৃত হিসেবে কাগজপত্র পাঠানো হলে তাকে মৃত তালিকাভুক্ত করা হয় সমাজসেবা দপ্তরের খাতায়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় তার বয়স্কভাতা। কিছুদিন পর ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে বিষয়টি জানতে পেরে বৃদ্ধা মমিনা বেগম উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। সেখানে তাকে জানানো হয় সরকারি কাগজপত্রে তিনি মৃত তাই তার বয়স্কভাতার কার্য বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়টি জানার পর তিনি বিচলিত হয়ে পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা পাননি মমিনা বেগম। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করলে মমিনা বেগম দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ দেন। পরবর্তীতে বিষয়টি তদন্ত করে মমিনা বেগম জীবিত এই মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র দেন পৌর প্রশাসক। কিন্তু পৌর প্রশাসকের জীবিতের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে একাধিকবার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও আজ পর্যন্ত বৃদ্ধার বয়স্ক ভাতা চালু করা যায়নি।

এলাকাবাসী জানান, ভোটের সময় কাউন্সিলররা ঠিকই বাড়ি বাড়ি আসে। অথচ খোঁজ না নিয়েই একজন জীবিত বৃদ্ধা নারীকে মৃত বানিয়ে তার বয়স্কভাতা বন্ধ করে দেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি। এরজন্য সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

মমিনা বেগমের পুত্রবধূ আমিনা বেগম বলেন, আমরা খুব গরিব মানুষ। আমার শাশুড়ি মমিনা বেগম অসুস্থ। তার খাবার আর চিকিৎসার খরচ দিতে পারছি না। আগে যে বয়স্ক ভাতা পেতেন, সেটাই ছিল আমাদের ভালোমন্দ খাবার এবং চিকিৎসার ভরসা। তিন বছর থেকে তার ভাতা বন্ধ থাকায় তিনি সময় মতো কিছুই করতে পারছেন না অর্থের অভাবে।

মমিনা বেগম বলেন, আমার বয়স্ক ভাতাটা চালু হলে আমি অনেক উপকৃত হতাম। এখন খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। আর কয়দিন বাঁচবো। যেকয়দিন বেঁচে আছি সে কয়দিন ভাতার টাকাটা পেলে অন্তত কিছু খাদ্য খোরাক খাওয়া আর ওষুধপাতি কিনতে পারতাম। টাকার অভাবে ঠিকমতো কোনটাই করতে পারছি না।

বৃদ্ধ মমিনা বেগমকে মৃত হিসেবে প্রত্যয়নদাতা তৎকালীন সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর বাবলী আরাকে একাধিকবার তার মুঠোফোনে ফোন দেওয়া হলেও তার মুঠোফোনের সুইচ বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কথা বলা যায়নি।

৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাসানুজ্জামান বলেন, মমিনা বেগম যেন তার বয়স্ক ভাতা পান সেজন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্মা সানোয়ার হোসেন বলেন, সমাজসেবা দপ্তরের সার্ভারে মমিনা বেগমকে মৃত দেখানো হয়েছে। কী কারণে এমন করা হয়েছে তা জানা নেই। তবে পৌরসভা থেকে যে কাগজপত্র এসেছে তারই ভিত্তিতে তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। তবে মমিনা বেগমের বিষয়টি সংশোধন করে দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ আসলে আবারও তার ভাতা চালু করা হবে।

পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা টাইমসকে বলেন, তৎকালীন মহিলা কাউন্সিলর বাবলী আরার সুপারিশের ভিত্তিতে মমিনা বেগমকে মৃত তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এ কারণে সমাজসেবার ভাতা ভেরিফিকেশন তালিকায় তাকে মৃত দেখিয়ে তার ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

কাগজে মৃত, বাস্তবে জীবিত—বয়স্কভাতা থেকে বঞ্চিত মমিনা

সংবাদ প্রকাশের সময় : ০১:০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের তেঁতুলিয়া গ্রামের মৃত মকবুল হোসেনের স্ত্রী ৮৯ বয়স্ক বৃদ্ধা মমিনা বেগম। জীবিত থেকেও সরকারি খাতায় মৃত দেখানোর কারণে দীর্ঘ তিন বছর থেকে বয়স্কভাতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই বৃদ্ধা। ভুল ভেরিফিকেশন আর জনপ্রতিনিধির দায়িত্বহীন সুপারিশের কারণে তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে তার বয়স্কভাতা। এতে চরম কষ্টে দিন কাটছে এই বৃদ্ধার।

জানা যায়, ২০২৩ সালের ৯ আগস্ট উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সকল ভাতাভোগীদের ভেরিফিকেশন কার্যক্রম চালানো হয়। সে সময় জীবিকার প্রয়োজনে বৃদ্ধা মমিনা বেগম ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় ভেরিফিকেশনের সময় তাকে তার বাড়িতে না পেয়ে এবং পরবর্তীতে তার সম্পর্কে কোনো প্রকার খোঁজখবর না নিয়েই তৎকালীন ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর বাবলী আরা মমিনা বেগমকে মৃত দেখিয়ে পৌর মেয়রের কাছে একটি সুপারিশ দেন। কাউন্সিলরের সুপারিশের ভিত্তিতে পৌরসভা থেকে উপজেলা সমাজসেবা দপ্তরে মমিনা বেগমকে মৃত হিসেবে কাগজপত্র পাঠানো হলে তাকে মৃত তালিকাভুক্ত করা হয় সমাজসেবা দপ্তরের খাতায়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় তার বয়স্কভাতা। কিছুদিন পর ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে বিষয়টি জানতে পেরে বৃদ্ধা মমিনা বেগম উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। সেখানে তাকে জানানো হয় সরকারি কাগজপত্রে তিনি মৃত তাই তার বয়স্কভাতার কার্য বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়টি জানার পর তিনি বিচলিত হয়ে পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা পাননি মমিনা বেগম। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করলে মমিনা বেগম দায়িত্বপ্রাপ্ত তৎকালীন প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ দেন। পরবর্তীতে বিষয়টি তদন্ত করে মমিনা বেগম জীবিত এই মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র দেন পৌর প্রশাসক। কিন্তু পৌর প্রশাসকের জীবিতের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে একাধিকবার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও আজ পর্যন্ত বৃদ্ধার বয়স্ক ভাতা চালু করা যায়নি।

এলাকাবাসী জানান, ভোটের সময় কাউন্সিলররা ঠিকই বাড়ি বাড়ি আসে। অথচ খোঁজ না নিয়েই একজন জীবিত বৃদ্ধা নারীকে মৃত বানিয়ে তার বয়স্কভাতা বন্ধ করে দেওয়া মোটেও ঠিক হয়নি। এরজন্য সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

মমিনা বেগমের পুত্রবধূ আমিনা বেগম বলেন, আমরা খুব গরিব মানুষ। আমার শাশুড়ি মমিনা বেগম অসুস্থ। তার খাবার আর চিকিৎসার খরচ দিতে পারছি না। আগে যে বয়স্ক ভাতা পেতেন, সেটাই ছিল আমাদের ভালোমন্দ খাবার এবং চিকিৎসার ভরসা। তিন বছর থেকে তার ভাতা বন্ধ থাকায় তিনি সময় মতো কিছুই করতে পারছেন না অর্থের অভাবে।

মমিনা বেগম বলেন, আমার বয়স্ক ভাতাটা চালু হলে আমি অনেক উপকৃত হতাম। এখন খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। আর কয়দিন বাঁচবো। যেকয়দিন বেঁচে আছি সে কয়দিন ভাতার টাকাটা পেলে অন্তত কিছু খাদ্য খোরাক খাওয়া আর ওষুধপাতি কিনতে পারতাম। টাকার অভাবে ঠিকমতো কোনটাই করতে পারছি না।

বৃদ্ধ মমিনা বেগমকে মৃত হিসেবে প্রত্যয়নদাতা তৎকালীন সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর বাবলী আরাকে একাধিকবার তার মুঠোফোনে ফোন দেওয়া হলেও তার মুঠোফোনের সুইচ বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কথা বলা যায়নি।

৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হাসানুজ্জামান বলেন, মমিনা বেগম যেন তার বয়স্ক ভাতা পান সেজন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্মা সানোয়ার হোসেন বলেন, সমাজসেবা দপ্তরের সার্ভারে মমিনা বেগমকে মৃত দেখানো হয়েছে। কী কারণে এমন করা হয়েছে তা জানা নেই। তবে পৌরসভা থেকে যে কাগজপত্র এসেছে তারই ভিত্তিতে তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। তবে মমিনা বেগমের বিষয়টি সংশোধন করে দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ আসলে আবারও তার ভাতা চালু করা হবে।

পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বাংলা টাইমসকে বলেন, তৎকালীন মহিলা কাউন্সিলর বাবলী আরার সুপারিশের ভিত্তিতে মমিনা বেগমকে মৃত তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এ কারণে সমাজসেবার ভাতা ভেরিফিকেশন তালিকায় তাকে মৃত দেখিয়ে তার ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।