ঢাকা ০২:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হুম্মাম ও মীর হেলালকে দিয়ে তদবিরের পরামর্শ

খালাসের জন্য এক কোটি? কলরেকর্ড ঘিরে নতুন বিতর্ক

চট্টগ্রাম ব্যুরো
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি বহুল আলোচিত মামলায় চট্টগ্রামের রাউজানের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে খালাস পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১ কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি টেলিফোন কলরেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার (৯ মার্চ) তাকে প্রসিকিউটরের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

যদিও সাইমুম রেজা দাবি করেছেন, ছড়িয়ে পড়া কলরেকর্ডগুলো তার নয়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিক যাচাই শেষে জানিয়েছেন, এসব কলরেকর্ড ‘এআই জেনারেটেড’ নয় বলেই মনে হচ্ছে।

ctg 1 2

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে দায়ের করা গণহত্যার মামলায় চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত ও ৪৫৯ জন আহত হন এবং এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং ইতিমধ্যে তাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

২০০১ সালে চট্টগ্রামের রাউজান আসনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। এর পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

এক কোটির গল্প ফজলে করিমের সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কলরেকর্ডগুলোর একটিতে ফজলে করিম চৌধুরীর সাবেক স্ত্রী ও আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারকে। রিজওয়ানা ইউসুফ ফারাজ করিম চৌধুরী ও ফারহান করিম চৌধুরীর মা। ফজলে করিমের সঙ্গে দীর্ঘদিন আগে বিচ্ছেদ হলেও তাকে গ্রেপ্তারের পর আইনজীবী হিসেবে এগিয়ে আসেন তিনি।

ওই কথোপকথনের একপর্যায়ে সাইমুম রেজাকে বলতে শোনা যায়, ‘এখন টোটাল অ্যামাউন্টটা বলবো, নাকি আপাতত একটি টাকার এমাউন্ট বলবো?’ উত্তরে রিজওয়ানা ইউসুফ বলেন, ‘টোটাল ও আপাতত দুটি এমাউন্টই বলো ভাইয়া।’ জবাবে সাইমুম রেজা বলেন, ‘আপনাকে একটা হিন্টস দিয়েছিলাম, বলছিলাম যে যদি আলটিমেটলি একটা ব্যবস্থা করা যায়, তারপর ভেঙে ভেঙে সেটা… টোয়েন্টি… টোয়েন্টি…।’

অজ্ঞাতনামা নারীর বিদেশি নম্বরে গোপন আলাপ

আরেকটি কলরেকর্ডে অজ্ঞাতনামা এক নারীর সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় সাইমুম রেজা তালুকদারকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে ওই নারী অর্থ লেনদেনের বিষয়টি ‘এটা আপনি আর চাচীর বিষয়’ বলে উল্লেখ করেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারী ফজলে করিমের কোনো এক ভাইয়ের মেয়ে হতে পারেন।

ওই ফোনালাপে ফজলে করিমের মামলাকে কেন্দ্র করে প্রসিকিউটরদের বৈঠকের পরিকল্পনা, তাদের অবস্থান প্রভাবিত করার আলোচনা এবং আর্থিক লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফাঁস হওয়া কথোপকথনে সাইমুম রেজাকে বলতে শোনা যায়, বর্তমানে যে প্রসিকিউটর আছেন তিনি ‘ভালো’ ও ‘রিজনেবল’ মানুষ। সামনে মামলাটি নিয়ে তারেক আবদুল্লাহ, মঈনুল করিম, নোমান, তিনি নিজে এবং চিফ প্রসিকিউটর ও জোহা একসঙ্গে বসবেন। সেখানে অন্যরা বিপক্ষে অবস্থান নিলেও তিনি নিজের পক্ষ থেকে ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন। তার ভাষায়, সবার কথা শুনে চিফ প্রসিকিউটর সিদ্ধান্ত নেবেন না, তিনি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এই আলাপের সময় তিনি ওই নারীকে সতর্ক করে বলেন, তথ্যটি অন্য কোথাও যেন না যায়, নইলে উল্টো ফল হতে পারে। নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে ‘খুবই সাহসী’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার দল ক্ষমতায় থাকায় তিনি যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে সেই সিদ্ধান্তের জন্য পাশে সমর্থন দরকার হবে এবং তিনি নিজেও সেই সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানান।

একপর্যায়ে আসন্ন বৈঠকের সময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিগগিরই বৈঠক হতে পারে। বিষয়টি দ্রুত প্রসিকিউটরের কাছে পৌঁছে দিতে বিএনপির কোনো নেতার মাধ্যমে বার্তা দেওয়ার কথাও বলেন। এ ক্ষেত্রে রাঙ্গুনিয়া আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল অথবা মন্ত্রী পর্যায়ের কারও মাধ্যমে বিষয়টি জানানো যেতে পারে বলে পরামর্শ দেন।

‘পার্ট পেমেন্ট চাবো নাকি একবারে চাবো’

সাইমুম রেজার কথোপকথনে ফজলে করিমের ছোট ছেলে ফারহান করিম চৌধুরীর প্রসঙ্গও আসে। তিনি বলেন, ‘না আই অ্যাম নট টকিং উইথ ইউ। আই অ্যাম টকিং উইথ ফারহান এন্ড আদার।’ জবাবে ওই নারী বলেন, ‘ওহ্ ভাইয়া নাই। ভাইয়া কথা বলতে পারে নাই। কারণ ভাইয়ার অসম্ভব ফুড পয়জনিং। আর ভাইয়া অসম্ভব প্রাইভেট। জীবনেও ওনার পেট থেকে কোনো কথা বের হয় না।’ তখন সাইমুম রেজা বলেন, ‘ঠিক আছে, আমার দিক থেকে আমি ট্রাই করবো। অ্যাডভার্সারি তো আছেই।’

ফোনালাপের শেষ দিকে আর্থিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। সাইমুম রেজা বলেন, ‘আর একটি জিনিস ফ্রাংকলি বলি। আমি জানি না, আমি কি আপনাদের থেকে পার্ট পেমেন্ট চাবো নাকি একবারে চাবো—কোনটি বেটার হয়, কোনটি ওয়াইজ হয়?’

জবাবে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, লেনদেনের বিষয়টি তার নয়; এটি তিনি ও ‘চাচী’র বিষয়। ‘চাচী’ জানতে চেয়েছেন কখন তার কাছে যেতে পারবেন।

জবাবে সাইমুম রেজা বলেন, ‘বিদেশি নাম্বার হলে বেস্ট। ওনার নাম্বারটা সেইফ না।’

সাইমুম রেজার আত্মপক্ষ

এদিকে সোমবার রাত নয়টার দিকে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লিখেন, ‘আমার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ এর ঘটনায় একটি অভিযোগ এসেছে। অভিযোগটি এরকম যে একজন আসামিকে খালাস করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে নারীর সাথে কথোপকথনের দুটি অডিও ক্লিপ, যেখানে আমি নাকি ১ কোটি টাকা দাবি করেছি, ১০ লক্ষ টাকা অগ্রিম চেয়েছি। এই দাবি ভিত্তিহীন ও অসত্য। এমন কিছু কখনও ঘটেনি, আমিও কারও থেকে উপরোক্ত কিছু চাইনি।’

গ্রেপ্তার ও বিভিন্ন মামলা

২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর সময় চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সরাইল ব্যাটালিয়নের একটি দল।

গ্রেপ্তারের সময় তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, সীমান্ত পার করে দেওয়ার কথা বলে এক ব্যক্তি তাকে ঢাকা থেকে আখাউড়া সীমান্তে নিয়ে আসে। সেখানে পাঞ্জাবি পরিহিত আরেক ব্যক্তি তাকে রিসিভ করেন। দুজনই তার অপরিচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। ওই ব্যক্তির সঙ্গে সীমান্ত বরাবর কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার সময় বিজিবির হাতে আটক হন তিনি।

পালানোর কারণ জানতে চাইলে ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, হার্টের ব্লকসহ দীর্ঘদিন ধরে একাধিক জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াও তার জন্য সহজ ছিল না।

এর আগে ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও রাউজান থানা পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রিভলভার, পিস্তল, রাইফেল, শটগান, টিয়ার গ্যাস লঞ্চার, বিপুল পরিমাণ গুলি, একনলা বন্দুক, বন্দুকের কার্তুজসহ বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করে রাউজান থানা পুলিশ।

গত বছরের ১৩ জুলাই জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার এজাহারে বলা হয়, অনুসন্ধানে তার ২৪ কোটি ৮ লাখ ৩০ হাজার ২৩২ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। আয়কর বিবরণীর চেয়ে ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৯২ হাজার ৭৭২ টাকার বেশি সম্পদ অবৈধভাবে অর্জন ও ভোগদখলের অভিযোগ আনা হয়েছে।

হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানো, অস্ত্রের মুখে জমি লিখিয়ে নেওয়া, ভাঙচুর ও দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩২টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন মামলায় তাকে একাধিকবার রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

হুম্মাম ও মীর হেলালকে দিয়ে তদবিরের পরামর্শ

খালাসের জন্য এক কোটি? কলরেকর্ড ঘিরে নতুন বিতর্ক

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি বহুল আলোচিত মামলায় চট্টগ্রামের রাউজানের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে খালাস পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১ কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি টেলিফোন কলরেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার (৯ মার্চ) তাকে প্রসিকিউটরের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

যদিও সাইমুম রেজা দাবি করেছেন, ছড়িয়ে পড়া কলরেকর্ডগুলো তার নয়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিক যাচাই শেষে জানিয়েছেন, এসব কলরেকর্ড ‘এআই জেনারেটেড’ নয় বলেই মনে হচ্ছে।

ctg 1 2

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে দায়ের করা গণহত্যার মামলায় চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত ও ৪৫৯ জন আহত হন এবং এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং ইতিমধ্যে তাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

২০০১ সালে চট্টগ্রামের রাউজান আসনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। এর পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

এক কোটির গল্প ফজলে করিমের সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কলরেকর্ডগুলোর একটিতে ফজলে করিম চৌধুরীর সাবেক স্ত্রী ও আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারকে। রিজওয়ানা ইউসুফ ফারাজ করিম চৌধুরী ও ফারহান করিম চৌধুরীর মা। ফজলে করিমের সঙ্গে দীর্ঘদিন আগে বিচ্ছেদ হলেও তাকে গ্রেপ্তারের পর আইনজীবী হিসেবে এগিয়ে আসেন তিনি।

ওই কথোপকথনের একপর্যায়ে সাইমুম রেজাকে বলতে শোনা যায়, ‘এখন টোটাল অ্যামাউন্টটা বলবো, নাকি আপাতত একটি টাকার এমাউন্ট বলবো?’ উত্তরে রিজওয়ানা ইউসুফ বলেন, ‘টোটাল ও আপাতত দুটি এমাউন্টই বলো ভাইয়া।’ জবাবে সাইমুম রেজা বলেন, ‘আপনাকে একটা হিন্টস দিয়েছিলাম, বলছিলাম যে যদি আলটিমেটলি একটা ব্যবস্থা করা যায়, তারপর ভেঙে ভেঙে সেটা… টোয়েন্টি… টোয়েন্টি…।’

অজ্ঞাতনামা নারীর বিদেশি নম্বরে গোপন আলাপ

আরেকটি কলরেকর্ডে অজ্ঞাতনামা এক নারীর সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায় সাইমুম রেজা তালুকদারকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে ওই নারী অর্থ লেনদেনের বিষয়টি ‘এটা আপনি আর চাচীর বিষয়’ বলে উল্লেখ করেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারী ফজলে করিমের কোনো এক ভাইয়ের মেয়ে হতে পারেন।

ওই ফোনালাপে ফজলে করিমের মামলাকে কেন্দ্র করে প্রসিকিউটরদের বৈঠকের পরিকল্পনা, তাদের অবস্থান প্রভাবিত করার আলোচনা এবং আর্থিক লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ফাঁস হওয়া কথোপকথনে সাইমুম রেজাকে বলতে শোনা যায়, বর্তমানে যে প্রসিকিউটর আছেন তিনি ‘ভালো’ ও ‘রিজনেবল’ মানুষ। সামনে মামলাটি নিয়ে তারেক আবদুল্লাহ, মঈনুল করিম, নোমান, তিনি নিজে এবং চিফ প্রসিকিউটর ও জোহা একসঙ্গে বসবেন। সেখানে অন্যরা বিপক্ষে অবস্থান নিলেও তিনি নিজের পক্ষ থেকে ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন। তার ভাষায়, সবার কথা শুনে চিফ প্রসিকিউটর সিদ্ধান্ত নেবেন না, তিনি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এই আলাপের সময় তিনি ওই নারীকে সতর্ক করে বলেন, তথ্যটি অন্য কোথাও যেন না যায়, নইলে উল্টো ফল হতে পারে। নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে ‘খুবই সাহসী’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার দল ক্ষমতায় থাকায় তিনি যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে সেই সিদ্ধান্তের জন্য পাশে সমর্থন দরকার হবে এবং তিনি নিজেও সেই সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানান।

একপর্যায়ে আসন্ন বৈঠকের সময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিগগিরই বৈঠক হতে পারে। বিষয়টি দ্রুত প্রসিকিউটরের কাছে পৌঁছে দিতে বিএনপির কোনো নেতার মাধ্যমে বার্তা দেওয়ার কথাও বলেন। এ ক্ষেত্রে রাঙ্গুনিয়া আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল অথবা মন্ত্রী পর্যায়ের কারও মাধ্যমে বিষয়টি জানানো যেতে পারে বলে পরামর্শ দেন।

‘পার্ট পেমেন্ট চাবো নাকি একবারে চাবো’

সাইমুম রেজার কথোপকথনে ফজলে করিমের ছোট ছেলে ফারহান করিম চৌধুরীর প্রসঙ্গও আসে। তিনি বলেন, ‘না আই অ্যাম নট টকিং উইথ ইউ। আই অ্যাম টকিং উইথ ফারহান এন্ড আদার।’ জবাবে ওই নারী বলেন, ‘ওহ্ ভাইয়া নাই। ভাইয়া কথা বলতে পারে নাই। কারণ ভাইয়ার অসম্ভব ফুড পয়জনিং। আর ভাইয়া অসম্ভব প্রাইভেট। জীবনেও ওনার পেট থেকে কোনো কথা বের হয় না।’ তখন সাইমুম রেজা বলেন, ‘ঠিক আছে, আমার দিক থেকে আমি ট্রাই করবো। অ্যাডভার্সারি তো আছেই।’

ফোনালাপের শেষ দিকে আর্থিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। সাইমুম রেজা বলেন, ‘আর একটি জিনিস ফ্রাংকলি বলি। আমি জানি না, আমি কি আপনাদের থেকে পার্ট পেমেন্ট চাবো নাকি একবারে চাবো—কোনটি বেটার হয়, কোনটি ওয়াইজ হয়?’

জবাবে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, লেনদেনের বিষয়টি তার নয়; এটি তিনি ও ‘চাচী’র বিষয়। ‘চাচী’ জানতে চেয়েছেন কখন তার কাছে যেতে পারবেন।

জবাবে সাইমুম রেজা বলেন, ‘বিদেশি নাম্বার হলে বেস্ট। ওনার নাম্বারটা সেইফ না।’

সাইমুম রেজার আত্মপক্ষ

এদিকে সোমবার রাত নয়টার দিকে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লিখেন, ‘আমার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ এর ঘটনায় একটি অভিযোগ এসেছে। অভিযোগটি এরকম যে একজন আসামিকে খালাস করিয়ে দেয়ার বিনিময়ে নারীর সাথে কথোপকথনের দুটি অডিও ক্লিপ, যেখানে আমি নাকি ১ কোটি টাকা দাবি করেছি, ১০ লক্ষ টাকা অগ্রিম চেয়েছি। এই দাবি ভিত্তিহীন ও অসত্য। এমন কিছু কখনও ঘটেনি, আমিও কারও থেকে উপরোক্ত কিছু চাইনি।’

গ্রেপ্তার ও বিভিন্ন মামলা

২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর সময় চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সরাইল ব্যাটালিয়নের একটি দল।

গ্রেপ্তারের সময় তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, সীমান্ত পার করে দেওয়ার কথা বলে এক ব্যক্তি তাকে ঢাকা থেকে আখাউড়া সীমান্তে নিয়ে আসে। সেখানে পাঞ্জাবি পরিহিত আরেক ব্যক্তি তাকে রিসিভ করেন। দুজনই তার অপরিচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। ওই ব্যক্তির সঙ্গে সীমান্ত বরাবর কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার সময় বিজিবির হাতে আটক হন তিনি।

পালানোর কারণ জানতে চাইলে ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, হার্টের ব্লকসহ দীর্ঘদিন ধরে একাধিক জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়াও তার জন্য সহজ ছিল না।

এর আগে ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ও রাউজান থানা পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রিভলভার, পিস্তল, রাইফেল, শটগান, টিয়ার গ্যাস লঞ্চার, বিপুল পরিমাণ গুলি, একনলা বন্দুক, বন্দুকের কার্তুজসহ বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করে রাউজান থানা পুলিশ।

গত বছরের ১৩ জুলাই জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার এজাহারে বলা হয়, অনুসন্ধানে তার ২৪ কোটি ৮ লাখ ৩০ হাজার ২৩২ টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। আয়কর বিবরণীর চেয়ে ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৯২ হাজার ৭৭২ টাকার বেশি সম্পদ অবৈধভাবে অর্জন ও ভোগদখলের অভিযোগ আনা হয়েছে।

হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, হত্যাচেষ্টা, অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানো, অস্ত্রের মুখে জমি লিখিয়ে নেওয়া, ভাঙচুর ও দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩২টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন মামলায় তাকে একাধিকবার রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে।