ঢাকা ০৫:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভাঙন পেরিয়ে যমুনার চরে নতুন জীবনের লড়াই

লিয়াকত হোসাইন লায়ন, জামালপুর
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০৪:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যমুনার বুকে জেগে ওঠা নতুন চরজমিতে এখন সবুজের সমারোহ। উর্বর পলিমাটিতে সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ। নানা ফসলের আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। ভাঙন আর বন্যার সঙ্গে লড়াই করেও এই চরাঞ্চলে গড়ে উঠছে এক নীরব কৃষি বিপ্লব।

প্রবাহমান যমুনা নদীর ভাঙা-গড়ার খেলায় একদিকে হারিয়ে যায় বসতভিটা, অন্যদিকে জেগে ওঠে নতুন জমি। একসময় এসব চরজমি বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকলেও এখন আর সেই চিত্র নেই। জীবিকার তাগিদে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষ নতুন জেগে ওঠা চরে গড়ে তুলছেন ঘর-বসতি, আবাদ করছেন জমি। তাদের পরিশ্রমে অনাবাদী বালুচর আজ পরিণত হয়েছে শস্যভাণ্ডারে।

Islampur Jamalpur Jomuna Chor Pic 25.02 1

স্থানীয়দের মতে, গত প্রায় ২০ বছর ধরে যমুনায় ধীরে ধীরে নতুন চর জেগে উঠছে। প্রতি বছরই বাড়ছে এর বিস্তৃতি। নদীর দুই পাড়ের বহু পরিবার জীবিকার সন্ধানে এখানে বসতি স্থাপন করেছেন। বর্তমানে এসব চরে ধান, পাট, ভুট্টা, গম, মরিচ, মসুর, খেসারি, ছোলা, চিনাবাদাম, মিষ্টি আলু, পেঁয়াজ, রসুন, তিল, তিসি, কালোজিরা, আখ ও মাসকালাইসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে।

সাপধরী ইউনিয়নের কাশারী ডোবা গ্রামের বাসিন্দা ছকিনা বেগম বলেন, প্রায় ৪৫ বছর আগে নদীভাঙনে তাদের পৈতৃক বাড়ি বিলীন হয়ে যায়। পরে অন্য জেলায় আশ্রয় নিলেও আবার জমি জেগে ওঠায় সেখানে ফিরে এসে নতুন করে ঘরবাড়ি করেছেন।

ষাটোর্ধ কৃষক আহেদ আলী জানান, বর্ষায় চরাঞ্চল পানির নিচে থাকায় বালুর ওপর পলিমাটি জমে, যা প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। এতে ফলন ভালো হয় এবং খরচও কম পড়ে।

কৃষক আব্দুল্লাহ শেখ বলেন, বছরে প্রায় পাঁচ মাস জমি পানির নিচে থাকে। পানি নেমে যাওয়ার পর পলিমাটিতেই আবাদ শুরু করা হয়। কম খরচে ভালো ফলন হওয়ায় এই জমিই এখন তাদের জীবিকার প্রধান ভরসা।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, চরাঞ্চলে ব্যাপক আবাদ হলেও সরকারি কৃষি সহায়তা খুব কমই পাওয়া যায়। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য গভীর নলকূপ বা অন্য ব্যবস্থা করা হলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

ইসলামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ জানান, চরাঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। কৃষকরা নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন। মাঠকর্মীদের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

যমুনার বুকে জেগে ওঠা এই চর শুধু মাটি নয়—নদীভাঙনে সর্বহারা মানুষের নতুন করে বেঁচে ওঠার গল্প, সংগ্রাম আর সম্ভাবনার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

ভাঙন পেরিয়ে যমুনার চরে নতুন জীবনের লড়াই

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১০:০৪:২৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

যমুনার বুকে জেগে ওঠা নতুন চরজমিতে এখন সবুজের সমারোহ। উর্বর পলিমাটিতে সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছেন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ। নানা ফসলের আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। ভাঙন আর বন্যার সঙ্গে লড়াই করেও এই চরাঞ্চলে গড়ে উঠছে এক নীরব কৃষি বিপ্লব।

প্রবাহমান যমুনা নদীর ভাঙা-গড়ার খেলায় একদিকে হারিয়ে যায় বসতভিটা, অন্যদিকে জেগে ওঠে নতুন জমি। একসময় এসব চরজমি বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকলেও এখন আর সেই চিত্র নেই। জীবিকার তাগিদে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষ নতুন জেগে ওঠা চরে গড়ে তুলছেন ঘর-বসতি, আবাদ করছেন জমি। তাদের পরিশ্রমে অনাবাদী বালুচর আজ পরিণত হয়েছে শস্যভাণ্ডারে।

Islampur Jamalpur Jomuna Chor Pic 25.02 1

স্থানীয়দের মতে, গত প্রায় ২০ বছর ধরে যমুনায় ধীরে ধীরে নতুন চর জেগে উঠছে। প্রতি বছরই বাড়ছে এর বিস্তৃতি। নদীর দুই পাড়ের বহু পরিবার জীবিকার সন্ধানে এখানে বসতি স্থাপন করেছেন। বর্তমানে এসব চরে ধান, পাট, ভুট্টা, গম, মরিচ, মসুর, খেসারি, ছোলা, চিনাবাদাম, মিষ্টি আলু, পেঁয়াজ, রসুন, তিল, তিসি, কালোজিরা, আখ ও মাসকালাইসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে।

সাপধরী ইউনিয়নের কাশারী ডোবা গ্রামের বাসিন্দা ছকিনা বেগম বলেন, প্রায় ৪৫ বছর আগে নদীভাঙনে তাদের পৈতৃক বাড়ি বিলীন হয়ে যায়। পরে অন্য জেলায় আশ্রয় নিলেও আবার জমি জেগে ওঠায় সেখানে ফিরে এসে নতুন করে ঘরবাড়ি করেছেন।

ষাটোর্ধ কৃষক আহেদ আলী জানান, বর্ষায় চরাঞ্চল পানির নিচে থাকায় বালুর ওপর পলিমাটি জমে, যা প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজ করে। এতে ফলন ভালো হয় এবং খরচও কম পড়ে।

কৃষক আব্দুল্লাহ শেখ বলেন, বছরে প্রায় পাঁচ মাস জমি পানির নিচে থাকে। পানি নেমে যাওয়ার পর পলিমাটিতেই আবাদ শুরু করা হয়। কম খরচে ভালো ফলন হওয়ায় এই জমিই এখন তাদের জীবিকার প্রধান ভরসা।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, চরাঞ্চলে ব্যাপক আবাদ হলেও সরকারি কৃষি সহায়তা খুব কমই পাওয়া যায়। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য গভীর নলকূপ বা অন্য ব্যবস্থা করা হলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

ইসলামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ জানান, চরাঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। কৃষকরা নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন। মাঠকর্মীদের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

যমুনার বুকে জেগে ওঠা এই চর শুধু মাটি নয়—নদীভাঙনে সর্বহারা মানুষের নতুন করে বেঁচে ওঠার গল্প, সংগ্রাম আর সম্ভাবনার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।