ঢাকা ০৬:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জনগণের নেতা “তারেক”

বিশেষ প্রতিবেদক
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ৫২ বার পড়া হয়েছে
বাংলা টাইমস অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করার পর ৬০ বছর বয়সে তার দেশে ফেরা শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বিরোধী রাজনীতির শক্তি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বলেও ধরা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং তার “দু’বার মুক্তি”-র মন্তব্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ এবং নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিল। এখন দেখার, এই প্রত্যাবর্তন আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কী ধরনের পরিবর্তন আনে।

সময়ের পরীক্ষায়, নির্বাসন জীবনে নিঃসঙ্গতা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাপে তারেক রহমান আজ একটি দলের নেতা নন, তিনি জনতার নেতা। তার রাজনীতির হাতেখড়ি ঘরের ভেতরেই, মায়ের কাছে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন রাজনীতির পাঠ। শিখেছেন সংগ্রাম কী, ত্যাগ কী, আর জনগণের পাশে দাঁড়ানোর মূল দর্শন। মায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল আপসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই। এই লড়াইয়ের প্রতিটি অধ্যায় তারেক রহমানের চিন্তায় ছাপ ফেলেছে। রাজনীতি শুধু ক্ষমতার অঙ্ক নয়, এটি মানুষের আশা, বেদনা আর প্রাপ্তির ভাষা। সেই ভাষা যিনি হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন, তিনি তারেক রহমান।

১৭ বছরের নির্বাসন জীবন কাটিয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তারেক রহমান। সেখানে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা তাকে স্বাগত জানান। প্রায় এক ঘণ্টা বিমানবন্দরে অবস্থান করে দুপুর ১২টা ৪১ মিনিটে পূর্বাচলে নির্মিত গণসংবর্ধনা মঞ্চের উদ্দেশে বাসে করে যাত্রা করেন তিনি। তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরের আশপাশের সড়ক ও পূর্বাচলে সমবেত হয়েছিলেন লাখ লাখ নেতা–কর্মী। উচ্ছ্বসিত নেতা–কর্মীদের অভিনন্দনের জবাব দিতে দিতে সংবর্ধনাস্থলে যান তারেক রহমান। এতে সাত কিলোমিটার দূরত্বের ওই পথ যেতে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।

এরপর বিকেল ৪টার আগে পূর্বাচলে জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে আয়োজিত সংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান।

সেখানে বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলের মানুষ আছে, এই দেশে মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই সকলে মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, আমরা যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, একজন মা দেখেন, অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই।

এসময় তিনি বলেন, এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময় অর্জিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য সেদিন সিপাহি–জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। একইভাবে পরবর্তীতে ১৯৯০–এ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের জনগণ, এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ছিনিয়ে এনেছিল। কিন্তু তারপরেও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। আমরা তারপর দেখেছি ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট এ দেশের ছাত্র–জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, নারী, পুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দলমত–নির্বিশেষে সব শ্রেণি–পেশানির্বিশেষে সকল মানুষ সেদিন এই দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনও তারেক রহমানকে ভেঙে দেয়নি। বরং গড়ে তুলেছে আরও দৃঢ়ভাবে। দেশের মাটি থেকে দূরে থেকেও তিনি ছিলেন মানুষের কাছে। আন্দোলনের প্রতিটি ঢেউ, নিপীড়নের প্রতিটি খবর, গণতন্ত্রের জন্য জনতার প্রতিটি আহ্বান সবকিছুই তিনি ধারণ করেছেন হৃদয়ে। দূরত্ব তাকে বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং জনতার কণ্ঠস্বর আরও স্পষ্টভাবে শুনতে শিখিয়েছে।

সময়ের ধারায় তারেক রহমান বদলেছেন। রাজনীতিবিদ থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন জনতার প্রতিনিধি। বক্তৃতার শব্দে নয়, বরং ধৈর্য, সহমর্মিতা আর প্রত্যাশার ভাষায় তিনি কথা বলেন। তার নেতৃত্বে মানুষ খুঁজে পান আশ্বাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, আর ভবিষ্যতের প্রতি দিশা।

জনতার রাজনীতিতে যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের অধিকার, আর নেতৃত্বের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে দায়িত্ব। এই পথচলা আবেগের, সংগ্রাম এবং আশার।

শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ের উত্তাল সময়ের মধ্য দিয়ে। তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন।

কৈশোরে তারেক রহমান রাজনৈতিক পরিবেশ খুব কাছ থেকে দেখেন। এ সময় পিতার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ পরিচালনার পাশাপাশি নবগঠিত বিএনপিকে এগিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ও জনসম্পৃক্ত কাজে প্রাথমিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পড়াশোনার সময় তিনি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হবস, লক, রুশো, ভলতেয়ার ও কার্ল মার্কসের মতো মহান দার্শনিকদের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন, যা তার রাজনৈতিক দর্শনকে সমৃদ্ধ করে।

আশির দশকে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একজন তরুণ রাজনীতিক হিসেবে তারেক রহমানের ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কারণ সময়টি ছিল তার মা খালেদা জিয়ার সাতদলীয় জোটের ব্যানারে রাজপথে আপসহীন নেতৃত্ব দেওয়ার কাল। যা তারেক রহমানের চিন্তা ও মনন গঠনে ব্যাপক অবদান রাখে।

তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরশাসনের পতন ঘটলে ১৯৯১ সালে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়। এ সময় তারেক রহমান মায়ের সঙ্গে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় নির্বাচনি প্রচারে যান। এ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে এবং বেগম জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

পরে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে তিনি গোপন ব্যালটের মাধ্যমে জেলা নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালু করেন। তিনি ২০০১ সালে রাজধানীতে একটি গবেষণা দফতর স্থাপন করেন। সেখানে স্থানীয় সরকার ও সুশাসন বিষয়ে গবেষণা হয়। এসব আধুনিক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দলীয় প্রধানের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তারেক রহমান কোনো সরকারি পদ বা সংসদ সদস্য হওয়ার মোহ দেখাননি। বরং তার পূর্ণ মনোযোগ ছিল সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপিকে শক্তিশালী করার দিকে। এই সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন। এই দায়িত্বে থেকে তিনি দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলন আয়োজন করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান।

এ সময় তিনি সাধারণ মানুষের পাঠানো ১৮ হাজারেরও বেশি চিঠির উত্তর দেন। এই জনসম্পৃক্ততার পথ ধরেই তিনি কৃষকদের ভর্তুকি, বয়স্ক ভাতা, পরিবেশ রক্ষা এবং সমাজে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে নারী শিক্ষার প্রসারে বৃত্তি চালুসহ নানা জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

তারেক রহমান ১৯৯৪ সালে চিকিৎসক জুবাইদা রহমানকে বিয়ে করেন। জুবাইদা রহমান সাবেক নৌবাহিনী প্রধান ও দুইবারের মন্ত্রী রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের মেয়ে। ডা. জুবাইদা রহমান একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বর্তমানে আইন পেশায় নিয়োজিত।

তারেক রহমান ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে হারান। কোকো মালয়েশিয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। একদিকে ছোট ভাইকে হারানো এবং একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জনগণের গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার বিষয়টি তারেক রহমানকে আরও মানবিক ও সহানুভূতিশীল নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ করে।

তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ৭ মার্চ কোনো আগাম অভিযোগ বা নোটিস ছাড়াই তারেক রহমানকে আটক করে। ১৮ মাসের বন্দিজীবনে তিনি পুলিশ রিমান্ডে ভয়াবহ নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের শিকার হন। তিনি ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি পান। তার শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য এক সপ্তাহ পর বিদেশে পাঠানো হয়।

এই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোই তার নৈতিক সাহস এবং দল ও জাতির প্রতি অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। তারেক রহমানের বিচক্ষণ ও দক্ষ রাজনৈতিক চিন্তাধারা কেবল জাতীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃত হয়েছে। দেশের রাজনীতিকদের প্রতিহিংসা ও সংঘাতের পথ পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে দেশকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

জনগণের নেতা “তারেক”

সংবাদ প্রকাশের সময় : ১২:১৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫

প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরে রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দীর্ঘদিন লন্ডনে অবস্থান করার পর ৬০ বছর বয়সে তার দেশে ফেরা শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং বিরোধী রাজনীতির শক্তি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বলেও ধরা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং তার “দু’বার মুক্তি”-র মন্তব্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ এবং নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিল। এখন দেখার, এই প্রত্যাবর্তন আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কী ধরনের পরিবর্তন আনে।

সময়ের পরীক্ষায়, নির্বাসন জীবনে নিঃসঙ্গতা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাপে তারেক রহমান আজ একটি দলের নেতা নন, তিনি জনতার নেতা। তার রাজনীতির হাতেখড়ি ঘরের ভেতরেই, মায়ের কাছে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন রাজনীতির পাঠ। শিখেছেন সংগ্রাম কী, ত্যাগ কী, আর জনগণের পাশে দাঁড়ানোর মূল দর্শন। মায়ের রাজনৈতিক জীবন ছিল আপসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই। এই লড়াইয়ের প্রতিটি অধ্যায় তারেক রহমানের চিন্তায় ছাপ ফেলেছে। রাজনীতি শুধু ক্ষমতার অঙ্ক নয়, এটি মানুষের আশা, বেদনা আর প্রাপ্তির ভাষা। সেই ভাষা যিনি হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে চলেছেন, তিনি তারেক রহমান।

১৭ বছরের নির্বাসন জীবন কাটিয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বেলা ১১টা ৩৯ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তারেক রহমান। সেখানে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা তাকে স্বাগত জানান। প্রায় এক ঘণ্টা বিমানবন্দরে অবস্থান করে দুপুর ১২টা ৪১ মিনিটে পূর্বাচলে নির্মিত গণসংবর্ধনা মঞ্চের উদ্দেশে বাসে করে যাত্রা করেন তিনি। তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরের আশপাশের সড়ক ও পূর্বাচলে সমবেত হয়েছিলেন লাখ লাখ নেতা–কর্মী। উচ্ছ্বসিত নেতা–কর্মীদের অভিনন্দনের জবাব দিতে দিতে সংবর্ধনাস্থলে যান তারেক রহমান। এতে সাত কিলোমিটার দূরত্বের ওই পথ যেতে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।

এরপর বিকেল ৪টার আগে পূর্বাচলে জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়েতে আয়োজিত সংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান।

সেখানে বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, এই দেশে যেমন পাহাড়ের মানুষ আছে, এই দেশে একইভাবে সমতলের মানুষ আছে, এই দেশে মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বসবাস করে। আমরা চাই সকলে মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব, আমরা যেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, একজন মা দেখেন, অর্থাৎ একটি নিরাপদ বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই।

এসময় তিনি বলেন, এই প্রিয় মাতৃভূমি ১৯৭১ সালে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময় অর্জিত হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে রক্ষার জন্য সেদিন সিপাহি–জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা হয়েছিল। একইভাবে পরবর্তীতে ১৯৯০–এ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এ দেশের জনগণ, এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে ছিনিয়ে এনেছিল। কিন্তু তারপরেও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। আমরা তারপর দেখেছি ১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ যেমন স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট এ দেশের ছাত্র–জনতাসহ সর্বস্তরের মানুষ কৃষক, শ্রমিক, গৃহবধূ, নারী, পুরুষ, মাদ্রাসার ছাত্রসহ দলমত–নির্বিশেষে সব শ্রেণি–পেশানির্বিশেষে সকল মানুষ সেদিন এই দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেছিল।

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনও তারেক রহমানকে ভেঙে দেয়নি। বরং গড়ে তুলেছে আরও দৃঢ়ভাবে। দেশের মাটি থেকে দূরে থেকেও তিনি ছিলেন মানুষের কাছে। আন্দোলনের প্রতিটি ঢেউ, নিপীড়নের প্রতিটি খবর, গণতন্ত্রের জন্য জনতার প্রতিটি আহ্বান সবকিছুই তিনি ধারণ করেছেন হৃদয়ে। দূরত্ব তাকে বিচ্ছিন্ন করেনি, বরং জনতার কণ্ঠস্বর আরও স্পষ্টভাবে শুনতে শিখিয়েছে।

সময়ের ধারায় তারেক রহমান বদলেছেন। রাজনীতিবিদ থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন জনতার প্রতিনিধি। বক্তৃতার শব্দে নয়, বরং ধৈর্য, সহমর্মিতা আর প্রত্যাশার ভাষায় তিনি কথা বলেন। তার নেতৃত্বে মানুষ খুঁজে পান আশ্বাস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, আর ভবিষ্যতের প্রতি দিশা।

জনতার রাজনীতিতে যেখানে ক্ষমতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের অধিকার, আর নেতৃত্বের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে দায়িত্ব। এই পথচলা আবেগের, সংগ্রাম এবং আশার।

শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ঢাকায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ের উত্তাল সময়ের মধ্য দিয়ে। তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন।

কৈশোরে তারেক রহমান রাজনৈতিক পরিবেশ খুব কাছ থেকে দেখেন। এ সময় পিতার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ পরিচালনার পাশাপাশি নবগঠিত বিএনপিকে এগিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন। তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক ও জনসম্পৃক্ত কাজে প্রাথমিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পড়াশোনার সময় তিনি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হবস, লক, রুশো, ভলতেয়ার ও কার্ল মার্কসের মতো মহান দার্শনিকদের চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন, যা তার রাজনৈতিক দর্শনকে সমৃদ্ধ করে।

আশির দশকে স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে একজন তরুণ রাজনীতিক হিসেবে তারেক রহমানের ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কারণ সময়টি ছিল তার মা খালেদা জিয়ার সাতদলীয় জোটের ব্যানারে রাজপথে আপসহীন নেতৃত্ব দেওয়ার কাল। যা তারেক রহমানের চিন্তা ও মনন গঠনে ব্যাপক অবদান রাখে।

তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরশাসনের পতন ঘটলে ১৯৯১ সালে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়। এ সময় তারেক রহমান মায়ের সঙ্গে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় নির্বাচনি প্রচারে যান। এ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে এবং বেগম জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

পরে তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে তিনি গোপন ব্যালটের মাধ্যমে জেলা নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালু করেন। তিনি ২০০১ সালে রাজধানীতে একটি গবেষণা দফতর স্থাপন করেন। সেখানে স্থানীয় সরকার ও সুশাসন বিষয়ে গবেষণা হয়। এসব আধুনিক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দলীয় প্রধানের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তারেক রহমান কোনো সরকারি পদ বা সংসদ সদস্য হওয়ার মোহ দেখাননি। বরং তার পূর্ণ মনোযোগ ছিল সারা দেশে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপিকে শক্তিশালী করার দিকে। এই সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন। এই দায়িত্বে থেকে তিনি দেশব্যাপী তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলন আয়োজন করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পান।

এ সময় তিনি সাধারণ মানুষের পাঠানো ১৮ হাজারেরও বেশি চিঠির উত্তর দেন। এই জনসম্পৃক্ততার পথ ধরেই তিনি কৃষকদের ভর্তুকি, বয়স্ক ভাতা, পরিবেশ রক্ষা এবং সমাজে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে নারী শিক্ষার প্রসারে বৃত্তি চালুসহ নানা জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

তারেক রহমান ১৯৯৪ সালে চিকিৎসক জুবাইদা রহমানকে বিয়ে করেন। জুবাইদা রহমান সাবেক নৌবাহিনী প্রধান ও দুইবারের মন্ত্রী রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের মেয়ে। ডা. জুবাইদা রহমান একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বর্তমানে আইন পেশায় নিয়োজিত।

তারেক রহমান ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে হারান। কোকো মালয়েশিয়ায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। একদিকে ছোট ভাইকে হারানো এবং একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জনগণের গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার বিষয়টি তারেক রহমানকে আরও মানবিক ও সহানুভূতিশীল নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ করে।

তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ৭ মার্চ কোনো আগাম অভিযোগ বা নোটিস ছাড়াই তারেক রহমানকে আটক করে। ১৮ মাসের বন্দিজীবনে তিনি পুলিশ রিমান্ডে ভয়াবহ নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের শিকার হন। তিনি ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুক্তি পান। তার শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য এক সপ্তাহ পর বিদেশে পাঠানো হয়।

এই তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোই তার নৈতিক সাহস এবং দল ও জাতির প্রতি অঙ্গীকারকে আরও শক্তিশালী করেছে। তারেক রহমানের বিচক্ষণ ও দক্ষ রাজনৈতিক চিন্তাধারা কেবল জাতীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃত হয়েছে। দেশের রাজনীতিকদের প্রতিহিংসা ও সংঘাতের পথ পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে দেশকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।